গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও নদী ভাঙ্গন

আপডেট : ০২ জুন ২০১৪, ২২:০৯
প্রমত্তা সন্ধ্যার অব্যাহত ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হইতে বসিয়াছে পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলার পাঁচটি খাদ্য গুদাম। ইতোমধ্যে সীমানা প্রাচীর ভাঙিয়া পড়িয়াছে। খাদ্য গুদামের সামনের জেটিও হারাইয়া গিয়াছে। নিত্য যেইভাবে সন্ধ্যা নদীর পাড় ভাঙিয়া চলিয়াছে তাহাতে আশঙ্কা হয় শীঘ্রই উহা দক্ষিণাঞ্চলের পুরাতন খাদ্য গুদামগুলি গ্রাস করিয়া লইবে। গত শনিবার এই রিপোর্ট ছাপা হইয়াছে দৈনিক ইত্তেফাকে। আমাদের এই ব-দ্বীপে নদীভাঙ্গন নূতন কোনো ঘটনা নহে। ইহা এই দেশের সাংবাত্সরিক সমস্যা। যেখানে নদী; ছোট কিংবা বড় সেখানেই ভাঙ্গন। নদী সিকস্তির শিকার কত পরিবার, কত জনমানুষ উন্মূল হইয়া গিয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই। বিলীন হইয়া গিয়াছে বহু পল্লী-জনপদ। বর্ষায় নদীর পাড় ভাঙে। পানি নামিয়া যাইবার সময়েও ভাঙ্গন অনিবার্য হইয়া দেখা দেয়। কখনও কখনও শান্ত নদীও পাড় ভাঙিয়া চলে অবিরাম। এই দেশের বেশিরভাগ এলাকার মাটি বেলে কিংবা দোআঁশ—স্বভাবতই নরম, সামান্য ঢেউয়ে ভাঙিয়া পড়ে সহজেই। ইহার ওপর আছে কোনো কোনো স্থানে নদীর কঠিন বাঁক। সেইসব বাঁকে প্রবলবেগে স্রোত আসিয়া ধাক্কা দিতে থাকিলে পাড়ের কি সাধ্য অস্তিত্ব রক্ষা করে। এই বাস্তবতায় সারাদেশে স্থায়ীভাবে নদীভাঙ্গন রোধ করা মোটেও সহজসাধ্য কাজ নয়। তথাপিও বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে ভাঙ্গন রোধের প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। এইখাতে এ যাবত্ কি বিপুল অর্থ-সম্পদ ব্যয়িত হইয়াছে তাহার হিসাব চটজলদি বাহির করা বাস্তবিকই দুরূহ। কিন্তু ভাঙ্গন প্রতিরোধী সেইসব ব্যবস্থার ফল স্থায়ী হইয়াছে এমন দৃষ্টান্ত খুব বেশি নাই। সবখানে সব নদীর সকল ভাঙ্গন স্থায়ীভাবে রোধ করা যাইবে না, সেই সামর্থ্যও আমাদের নাই। ইহা এক রূঢ় বাস্তবতা। কিন্তু বিভিন্ন শহর, ব্যবসায় কেন্দ্র, সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়ক, ফেরিঘাট, রেল স্টেশন, বাস টার্মিনাল ইত্যাদির সুরক্ষা নিশ্চিত করা একান্ত কর্তব্য। বাস্তবোচিত পরিকল্পনা লইয়া কাজ করিলে ইহা অসম্ভবও নহে। যেইসব স্থানে নদীর পাড় ঘেঁষিয়া সড়ক-মহাসড়ক গিয়াছে, সেইসব ক্ষেত্রে ভাঙ্গনের কবল হইতে যোগাযোগ অবকাঠামো রক্ষা করিবার নিমিত্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। সড়ক বা মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ যোগাযোগ বিপর্যস্ত হইলে ব্যবসা-বাণিজ্যের যেমন ক্ষতি হয়, তেমনই সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাইতে হয় জনসাধারণকে। কাউখালীর কিংবা অন্য যেকোনো এলাকার খাদ্যগুদামের কী গুরুত্ব সহজেই অনুধাবনযোগ্য। ইহার সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। গুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হইলে বা বিলীন হইয়া গেলে স্থানীয়ভাবে সরকারি ধান চাউল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ বাধাগ্রস্ত হইতে পারে। প্রসঙ্গত বলা বাঞ্ছনীয় যে, কাউখালির খাদ্য গুদামগুলি নির্মিত হইয়াছে গত শতকের ষাটের দশকে। গুদাম নির্মাণের পাশাপাশি এইখানে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থাও করা হয়। সময়ের ব্যবধানে গুদাম ও কোয়ার্টারগুলি জরাজীর্ণ হইয়া পড়িয়াছে। সেইগুলি সংস্কার প্রয়োজন। গোদের উপর বিষফোড়ার মত হানা দিয়াছে ভাঙ্গন উন্মুখ সন্ধ্যা নদী। এই নদীর দুইপাড়ই এখন ভাঙ্গনের কবলে। খাদ্য বিভাগের এই স্থাপনাগুলি সংস্কার করার আগে নদী শাসন করা একান্ত কর্তব্য। কাজেই সন্ধ্যা নদীর গ্রাস হইতে গুদাম এলাকা এবং নদীর তীরবর্তী ভাঙ্গনকবলিত জনপদ রক্ষার্থে আশু ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইবে—ইহাই আমাদের প্রত্যাশা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন