থাইল্যান্ডে টানা ছয় মাসের রাজনৈতিক সংকটের পর গত ২০ মে সামরিক আইন জারির ঘোষণা দিয়াছে সেনাবাহিনী। থাইল্যান্ডের ১৯১৪ সালের একটি আইনি ধারানুযায়ী দেশটি কোনো বিপর্যয়ের সম্মুখীন হইলে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করিতে পারে। সেই আইনের ফাঁকে অতঃপর ২২ মে সেনাবাহিনী দেশের ক্ষমতা দখলের ঘোষণা দেয়। তাহার পরের দিনই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রাসমেত বহু রাজনীতিককে আটক করা হয়। ইতিমধ্যে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী সেনাপ্রধান জেনারেল প্রায়ুথ শান-ওশা দেশ পরিচালনায় রাজার সমর্থন পাইয়াছেন। সমালোচকরা অবশ্য বলিতেছেন, রাজার ইচ্ছানুযায়ীই এই অভ্যুত্থান ঘটিয়াছে, সুতরাং তাহার সমর্থন প্রদানের অর্থ যেন নিজেকেই নিজে অনুমোদন দেওয়া।
সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের দেশের নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ এইবার কী হইবে? ১৭৮২ সাল হইতে ১৯৩২ সাল অবধি থাইল্যান্ডে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাহার পর দেশটিতে প্রতিষ্ঠিত হয় সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। দেশটির সাংবিধানিক রাজতন্ত্র, সামরিক জান্তার স্বৈরতন্ত্র এবং নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র—এই তিন ধারার টানাপোড়েনে গণতন্ত্রের শিকড়ের কর্তন ঘটিতেছে বারংবার। ফলত, গণতন্ত্র সেইখানে মহীরুহ রূপ পরিগ্রহের পরিবর্তে বনসাই হইয়া রহিয়াছে। তাহাছাড়া দেশটির শহুরে ধনিক শ্রেণি এবং পল্লী অঞ্চলের দরিদ্র শ্রেণির মধ্যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য রহিয়াছে আসমান-জমিন। আর এইসব রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার সুযোগ লইয়া বারংবার ক্ষমতা দখলে লইয়াছে থাইল্যান্ডের রাজকীয় সশস্ত্র বাহিনী। ৮২ বত্সর পূর্বে থাইল্যান্ডে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিলেও এখন অবধি ১২ বার সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়াছে। অভিযোগ রহিয়াছে, ১৮ বার সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা ঘটিলেও যখনই রাজা কোনো অভ্যুত্থানে সায় দিয়াছেন তখনই তাহা নিশ্চিত সাফল্য পাইয়াছে। শেষবার ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইংলাকের বড় ভাই থাকসিন সিনাওয়াত্রা ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজা ভূমিবলকে অসম্মানের জন্য পদচ্যুত হইয়াছিলেন। ২০১১ সালের সাধারণ নির্বাচনে থাকসিনের বোন ইংলাক ক্ষমতাসীন হইলেও মেয়াদ পূর্তির পূর্বেই গত ২ ফেব্রুয়ারি তিনি নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। কিন্তু বিরোধী দল সেই নির্বাচন বর্জনহেতু দেখা দেয় নূতন সঙ্কট। বিরোধীদের দাবি ছিল রাজনৈতিক সংস্কার না করিয়া নূতন নির্বাচন করা চলিবে না। ইতোমধ্যে, থাইল্যান্ডে গত ছয় মাসে রাজনৈতিক অচলাবস্থার প্রেক্ষিতে আন্দোলন-সংঘর্ষে নিহত হইয়াছে ২৮ জন, আহত হইয়াছে শত শত বিক্ষোভকারী। সব মিলিয়া থাই সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের এই সুযোগ গ্রহণ করিতে আর বিলম্ব করে নাই।
তবে রাজতন্ত্রের প্রতি দেশটির নূতন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও চোখে পড়ার মতো। অশীতিপর রাজা ভূমিবল এখনও সেইখানে সম্মানের ও শ্রদ্ধার আসনে আসীন থাকিলেও তাঁহার মৃত্যু-পরবর্তীকালে দেশটির রাজতন্ত্রের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি যে আরও নেতিবাচক হইবে, তাহার আলামত থাইল্যান্ডের নূতন প্রজন্ম ইতোমধ্যেই দেখাইতে শুরু করিয়াছে। কেননা, রাজ পরিবারের প্রতিনিধিদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করা ও তাহার অপব্যবহার ভালো চোখে দেখে না নূতন প্রজন্ম। অভ্যুত্থানের পর সামরিক জান্তা পাঁচজনের অধিক ব্যক্তির একসঙ্গে চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিয়াছে বটে। কিন্তু নূতন প্রজন্মের প্রতিনিধিরা আবিষ্কার করিয়া লইয়াছে বিক্ষোভ প্রদর্শনের নূতন উপায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটার ফেসবুকের মাধ্যমে তাহারা স্থান ও কাল নির্ধারণ করিয়া একেকজন একেক জায়গা হইতে নিজেদের মতো করিয়া আন্দোলনস্থলের আশপাশে আসিতেছে। তাহার পর অবস্থা বুঝিয়া ঝটপট কয়েক শত মানুষ একত্র হইয়া বিক্ষোভ করিয়া মুহূর্তে নিজেরাই ছত্রভঙ্গ হইয়া যাইতেছে। সেইসব ছবি টুইটার ফেসবুকে আপলোড করিয়া এই ধরনের ফ্ল্যাশ মবের জনপ্রিয়তা আরও বাড়াইয়া দিতেছে। এই নূতন আন্দোলনকে কীভাবে রুখিবে জান্তা সরকার? রাজতন্ত্র নিশ্চয়ই এক সময় পৃথিবী হইতে বিলীন হইয়া যাইবে পুরাপুরি। ক্ষমতার প্রতি নির্লিপ্ত ও নির্লোভ থাকিলে রাজতন্ত্রের প্রতীকী রূপ কোথাও টিকিয়া থাকিতেও পারে। সেই শুভবোধ বর্তমানে বিদ্যমান রাজতন্ত্রসমূহের মধ্যে যত তাড়াতাড়ি আসিবে ততই তাহাদের রূপকাশ্রয়ী রূপ কালের ব্যবধানে টিকিয়া থাকিবার সম্ভাবনা থাকিবে। ইহাই নূতন দিনের বাস্তবতা।
