ফরমালিনকে কেন্দ্র করিয়া গত কয়েকদিন ধরিয়া দেশে কথার তুবড়ি ছুটিতে দেখা যাইতেছে। ফরমালিন গোটা দেশে বেশ কিছুকাল যাবত্ সংবাদপত্র এবং সভা-সেমিনারে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হইয়াছে। বাংলাদেশের গোটা জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য আজ হুমকির সম্মুখীন বলিয়া প্রায়শই বিশেষজ্ঞরা যে অভিমত ব্যক্ত করেন উহারও মূলে রহিয়াছে এই ফরমালিন বিষয়ক জটিলতা। ফরমালিন রাসায়নিক হিসাবে মন্দ কি ভাল—উহাতো নির্ণীত হয় কী উদ্দেশ্যে এবং কিসের উপর উহা প্রয়োগ করা হইতেছে, তাহার উপর। কোনো দ্রব্যের পচন রোধের জন্য ফরমালিনের ব্যবহার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যদি কিনা ঐ দ্রব্যের উপযোগিতা বা প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হইয়া থাকে। তাহাছাড়া, কৃত্রিম উপায়ে এই পচন রোধের প্রক্রিয়ার মধ্যে এমনিতে কোনো অন্যায় বা অপরাধ থাকিতে পারে না। এখন যদি মানবদেহ কিংবা পরিবেশের জন্য ইহা মারাত্মক ক্ষতিকর বলিয়া প্রতিভাত হয়, তাহা হইলে উহার ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারির প্রয়োজন পড়ে বৈকী! যদি মৃত দেহ কোন কারণে কিছুকাল বা অনেককাল যাবত্ সংরক্ষণ করার প্রয়োজন পড়ে তাহা হইলেও ফরমালিন অত্যাবশ্যক হইয়া দেখা দেয়। ফল-ফলারি, তরি-তরকারি বা সবজিসহ বিভিন্ন খাদ্যকে দীর্ঘকাল তাজা রাখিতেও চাই ফরমালিন। অবিশ্যি, এই জাতীয় দ্রব্যে ফরমালিনের ব্যবহার প্রকারান্তরে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ ঘটায়। উন্নত দেশেও খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণে প্রিজারভেটিভের ব্যবহার খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। মোদ্দাকথা, ফরমালিনের প্রয়োজন ও ব্যবহার বস্তু বা দ্রব্যভেদে আবশ্যক হইয়া দাঁড়ায় আর ইহাই স্বাভাবিক; কিন্তু যে সকল জিনিসকে কৃত্রিম উপায়ে তাজা রাখা দরকার হয় সেগুলি যে সবসময় ভাল ফল দেয় একথা নিশ্চয়ই জোর দিয়া বলা যায় না।
বিশ্বায়নের এই যুগে শুধু খাদ্যদ্রব্য কেন, সব কিছুকেই যেন ফরমালিন জাতীয় কিছু দ্বারা তাজা রাখা অত্যাবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে। তবে এ কথা মানিতেই হইবে যে, যাহা প্রাকৃতিক, যাহা অতি স্বাভাবিক ধারায় উত্সারিত এবং যাহার আবেদন ও আবাহন নিয়ত উহার জন্য ফরমালিনের কোনোই আবশ্যকতা নাই। একটি সমাজে এমন কিছু নীতি আদর্শ ও মূল্যবোধের সাক্ষাত্ মেলে যাহা শাশ্বত। আর ঐ জাতীয় মূল্যবোধ বা আদর্শের বলেই সমাজ-সভ্যতা আগাইয়া যায়। যাহা কৃত্রিম তাহাকেই কৃত্রিম উপায়ে বাঁচাইয়া রাখার চেষ্টা-চরিত্র বর্তমান যুগে প্রকটভাবে দৃশ্যমান। মানুষের ইতিহাসের এবং সভ্যতার সকল পর্বেই ফরমালিন জাতীয় রাসায়নিক বা অপরাপর উপাদান দ্বারা কিছু বিষয়কে তাজা রাখিবার প্রয়াস-প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। এখানে অবশ্য ফরমালিন রূপক অর্থে ব্যবহূত হইতেছে। ‘আদর্শ-মূল্যবোধ-বিশ্বাস’ এইগুলিকে ফরমালিনমুক্ত রাখার কোনো চেষ্টা-চরিত্র বা প্রয়াস-প্রচেষ্টার প্রয়োজনই নাই। উহারা স্বয়ম্ভু। আর বাদ বাকি যাহা আমরা দেখি উহাদের অধিকাংশই কৃত্রিমতার বেড়াজালে নিমজ্জিত থাকে, ফলে বাহির হইতে উহাদেরকে তাজা সতেজ-সবুজ দেখাইলেও আসলে কিন্তু উহা মাকাল ফল ছাড়া কিছুই নহে।
প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে রাজনৈতিক দল প্রসঙ্গে এই ফরমালিনের বিষয়টি উত্থাপন করিয়াছেন। যাহা কিছু ভাল, যাহা কিছু স্বাভাবিক এবং কল্যাণধর্মী তাহা অবিনশ্বর এবং এইগুলিই সমাজ সভ্যতার নিয়ামক ও চালিকা শক্তি। যাহারা এই সবের চর্চা-পরিচর্যা করেন তাহাদের ফরমালিন লইয়া কোনো দুর্ভাবনার কারণ থাকার কথা নহে। কী সংসারে, কী রাজনৈতিক দলে, কী সমাজ সংসারে— সর্বত্রই ফরমালিন মার্কা কায়-কারবারের জয় জয়কার! নীতি আদর্শ সেবা ত্যাগ তিতিক্ষা বিশ্বাস এইসব সত্ গুণাবলীকে বিসর্জন দিয়া সমাজ-রাজনীতি কিছুই সঠিকভাবে চলিতে পারে না। যাহা চলে তাহা ঐ ফরমালিন জাতীয় কৃত্রিম উপাদানের মোড়কে আরও একপ্রকার ফাঁকি ও প্রতারণাপূর্ণ ব্যবস্থা। ইহা শেষতক নিশ্চয়ই কোনো কল্যাণ ডাকিয়া আনে না।
