শহরের অতি দরিদ্রদের জীবিকা

আপডেট : ০৪ জুন ২০১৪, ২১:৪২
ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণশীল শহরগুলোর একটি। ঢাকায় ৩৫০০-৪০০০ বস্তি রয়েছে এবং শহরের বস্তিগুলোতে প্রায় ৩.৫ কোটি লোক বসবাস করছে। ২০১৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে গিয়ে ৬.৮ কোটিতে দাঁড়াবে বলে অনুমান করা হয়। শহরের জনসংখ্যার প্রায় ৪০% বস্তিতে বসবাস করছে এবং তারা যাতে ভালভাবে জীবনযাপন করতে পারে সেদিকে মনোযোগ দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদী ভাঙ্গন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে দরিদ্র মানুষেরা শহরাঞ্চলে স্থানান্তরিত হচ্ছে। তারাও আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির মধ্যদিয়ে জিডিপিতে অবদান রাখছে। শহরের দারিদ্র্য সরকার, দাতা সংস্থা ও এনজিও থেকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। ফলে, দরিদ্রের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। শহরের বস্তির মানুষগুলো অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়। কিছু নিচে আলোচনা করা হলো। উচ্ছেদ : বেশিরভাগ বস্তিই সরকারি জমিতে তৈরি। তাই উচ্ছেদের একটি নিত্য হুমকি রয়েছে। যদিও ইউএনডিপিসহ কিছু উন্নয়ন সংস্থা পুনর্বাসন নিশ্চিত করার পূর্বে যেকোন ধরনের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে, ২০১০ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে এবং ২০১১ সালের মে মাসে আমরা তিনটি বড় উচ্ছেদ দেখেছি; দু’টি সাটটোলা বস্তি ও টিএন্ডটি (কুড়িলের অংশ) এবং অন্যটি বসিলা রোড হতে বুদ্ধিজীবী বেড়িবাঁধ। হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী উচ্ছেদের পূর্বে সরকারকে অবশ্যই পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে; কিন্তু এটি অনুসরণ করা হচ্ছে না। যেসব বস্তিবাসীর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তাদের জন্য জমি ভোগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা একটি সমাধান হতে পারে। ২০০৪-২০০৫ সালের ‘জনসংখ্যা রিপোর্ট: বাংলাদেশের পরিবেশ’-এ এটি বলা হয়েছিল যে বস্তিতে রুমের গড় ভাড়া (প্রতি বর্গফুট) ঢাকার অধিকাংশ উচ্চমানসম্পন্ন আবাসিক দালানের তুলনায় বেশি। স্বাস্থ্য, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা :বস্তিতে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করতে ওয়াসার কোন পরিকল্পনা নেই। ‘জনসংখ্যা রিপোর্ট ২০০৪-২০০৫ঃ বাংলাদেশের পরিবেশ’ অনুযায়ী বস্তিতে বসবাসকারী মানুষকে ঢাকা ওয়াসা কর্তৃক সরবরাহকৃত পানির তুলনায় ৮০ গুণ বেশি দাম দিতে হয়। গরীব মানুষের স্বাস্থ্য হলো প্রধান মানব সম্পদ যা ঠিক রাখা প্রয়োজন, অন্যথায় কোন সাহায্য বা প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হবে না। সরকার দেশে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যসেবার প্রধান সরবরাহকারী। এটি বস্তিতে অপর্যাপ্তভাবে পরিচালিত হয়। কিন্তু দরিদ্রদের জন্য স্বাস্থ্য ও পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত খরচসহ বিভিন্ন রকম অসুস্থতা ও রোগের সাথে সম্পর্কিত যা তাদের চলমান দারিদ্র্য চক্র ও অনিশ্চয়তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নিয়ামক। সুতরাং জাতীয় নগর অঞ্চল নীতিতে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যসেবার অধিকার আবশ্যক হওয়া উচিত। নিরাপত্তা বেষ্টনি :ভিজিডি, ভিজিএফ, বয়স্কভাতা এবং ১০০ দিনের কর্মপ্রকল্প গ্রামের দরিদ্রদের জন্য সহজপ্রাপ্য হলেও বস্তিতে বসবাসকারী অতি দরিদ্রদের জন্য সহজলভ্য নয়। আমাদের উচিত তাদের জন্য নিরাপত্তা বেষ্টনি নিশ্চিত করা। যদিও সরকার তার বাজেটে নিরাপত্তা বেষ্টনি প্রকল্পে ৭.৩% বরাদ্দ করেছে, সেখানে শহরের দরিদ্রদের জন্য কিছু নেই। শহরের বস্তিবাসী ঢাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছে যেহেতু তার উত্পাদন, সেবা ও অন্যান্য ক্ষেত্রসমূহ প্রয়োজনীয় শ্রম সরবরাহ করছে। তাই তাদেরকে অর্থনীতির মূলসে াতে নিয়ে আসা এবং দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে প্রয়োজনীয় সাহায্য প্রদান জরুরি। বিকল্প কর্ম সুবিধা ও সামর্থ্য তৈরি :সিটি করপোরেশন নতুন রিকশা ও রিকশা ভ্যানের লাইসেন্স প্রদান বাতিল করেছে। অনেক অতিদরিদ্র পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয় তৈরি কর্মগুলোর একটি হল রিকশা ও রিকশা ভ্যান চালানো। কিছু বয়স্ক ও অক্ষম মানুষও রিকশা, রিকশা ভ্যান ও নৌকা ভাড়া দিয়ে উপার্জন করছে। লাইসেন্স দিতে সিটি করপোরেশনকে রাজি করাতে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারি, বিশেষত বস্তির দরিদ্র মানুষদের জন্য। ভাতা সুবিধা ছাড়াও ব্যক্তিগত সামর্থ্যের, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও আগ্রহ নির্ভর আয় তৈরির কাজে এই নীতিটি সহায়তা করা উচিত। বয়স্ক, অক্ষম এবং বিধবা অতিদরিদ্রের জন্য বিকল্প কর্ম সুবিধাসমূহ ও সামর্থ্য তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। সমবায়সমূহ :দরিদ্র মানুষের কোন সংগঠন নেই। কিন্তু তাদের নিজস্ব সংগঠন থাকা জরুরি যেখানে তারা তাদের বক্তব্য উত্থাপন এবং অধিকার দাবি করতে পারবে। নীতির সাহায্যে সমবায়গুলো দরিদ্র মানুষের জন্য ইতিবাচকভাবে স্থায়িত্বকে প্রভাবিত করতে পারে। এককালীন সম্পদ সরবরাহ তাদের দারিদ্র্য সমস্যার সমাধান করতে পারবে না; এজন্য তাদের নিজেদের নিবন্ধিত সমবায়সমূহের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সাথে দৃঢ় সংযোগ থাকা দরকার, আর্থিক/ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার এবং মূল্য শ্রেণী, বাণিজ্য ও বাজার সংযোগের জ্ঞান থাকতে হবে। সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব : বেসরকারি খাত দরিদ্র মানুষের কর্ম ও প্রচেষ্টার ব্যাপারে সহানুভূতিশীল নয়। তাই তাদের সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে দরিদ্রদের সাহায্য করার যে আগ্রহ তা আরও বেশি সমর্থন পাওয়া দরকার এবং তাদের সাথে শক্তিশালী সংযোগ স্থাপন প্রয়োজন। এজন্য অংশীদার, অন্যান্য মালিক ও সেবাদানকারীদের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় জরুরি। বস্তির মানুষদের জন্য নিচের জিনিসগুলো দরকার : ১. পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়; ২. ভিজিডি, ভিজিএফ, ১০০ দিনের কর্মের মত নিরাপত্তা বেষ্টনি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তি এবং গ্রামীণ এলাকা, শহরের দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষের জন্য ভাতা প্রদান ; ৩. বস্তিতে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে সমন্বয় সাধন; ৪. পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা ; ৫. জমির মালিকানার ব্যবস্থা যাতে তাদের উচ্ছেদের ভীতিতে না থাকতে হয়; শহরাঞ্চলের জন্য সঠিক নীতি প্রণয়ন জরুরি, কিন্তু এটি এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে যাতে বস্তিবাসীদের অংশগ্রহণ, সচেতনতা, মালিকানা নিশ্চিত হয়। কোন নীতিকে টেকসই এবং সফল করতে এই তিনটি দিক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দারিদ্র্য বিমোচনের অনেক বিষয়ের সাথে নীতির সংযোগ থাকতে হবে, যেমন গর্ভবতী ও নবজাতক মায়ের জন্য, অক্ষম মানুষের জন্য সম্পদ হস্তান্তর, স্বাস্থ্য, পয়ঃনিষ্কাশন ও নগর সাহায্যের উন্নয়নকে তুলে ধরা। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এই নীতির সমর্থনে নিশ্চিত করা দরকার। সরকার ও এনজিও কার্যক্রমের মধ্যে অধিক সমন্বয় প্রয়োজন এবং শহরের বস্তিবাসীদের সাহায্য করতে এই নীতি অনুযায়ী কর্মপ্রক্রিয়া হাতে নিতে হবে। লেখক: দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে)-সিঁড়ি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন