সপ্তবর্ষ ব্যাপী সহিংস বিরোধিতার আপাত সমাপ্তি ঘটাইয়া ফিলিস্তিনে ঐকমত্যের সরকার গঠন করিয়াছে ফাতাহ ও হামাস। হাজারো সন্দেহ ও অনৈক্যের বেড়াজাল ডিঙ্গাইয়া একেবারে শেষ মুহূর্তে গঠিত এই সরকার লইয়া ফিলিস্তিনীদের মধ্যে স্বভাবতই ব্যাপক উত্সাহের সঞ্চার হইয়াছে। সাধারণ ফিলিস্তিনীদের অনেকেই ভাবিতে শুরু করিয়াছেন যে, দীর্ঘদিন ধরিয়া বলিতে গেলে কোণঠাসা হইয়া থাকা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার বিষয়টি এইবার নূতন করিয়া গতি পাইবে। তবে তাহাদের আশাবাদ বাস্তবে পর্যবসিত হইবার দিকে ধাবিত বিষয়টি যে কেবল ফাতাহ ও হামাসের সদিচ্ছার উপরে নির্ভর করিবে না তাহা বলাই বাহুল্য। দীর্ঘদিনের অবস্থাদৃষ্টে ইহা স্পষ্ট যে, প্রধান প্রতিপক্ষ ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ফাতাহ-হামাসের ঐক্যকে কি মাত্রাতে গ্রহণ করে তাহার উপরেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হইবার বিষয়টি বহুলাংশে নির্ভর করিবে।
সঙ্কট অবশ্য ঐকমত্যের সরকারের যাত্রা শুরুর পূর্বেই শুরু হইয়া গিয়াছে। ইসরায়েল জানাইয়া দিয়াছে যে, হামাস-অন্তর্ভুক্ত নূতন সরকারের সহিত তাহারা কোন ধরনের শান্তি-আলোচনায় বসিবে না। উল্লেখ্য, গত এপ্রিল মাসে ফাতাহ-হামাস ঐক্যের সম্ভাবনা দেখা দেয়ামাত্রই শান্তি আলোচনা হইতে সরিয়া যায় ইসরায়েল। এক্ষণে নূতন সরকারে হামাসের অন্তর্ভুক্তিতে তাহার প্রতিক্রিয়া হইয়াছে ভয়াবহ। পশ্চিমা দেশগুলির মধ্যেও এই নূতন রাজনৈতিক উন্নয়ন লইয়া সতর্ক মনোভাব লক্ষ্য করা যাইতেছে। প্রধান-শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ হইতেও ফিলিস্তিন সরকারের হামাসের অন্তর্ভুক্তির দিকে তীক্ষ নজর রাখিবার কথা বলা হইতেছে। উল্লেখ্য, ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্ব হামাসকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসাবে বিবেচনা করে। এমনকি এই সংগঠনটির সহিত যেকোন ধরনের সংস্রব তাহারা পরিহার করে। ইসরায়েল আরও জানাইয়া দিয়াছে যে, এখন হইতে গাজা-কেন্দ্রিক যেকোন ইসরায়েল-বিরোধী হামলা ও তত্পরতাকে ফিলিস্তিনী কর্তৃপক্ষের কার্য হিসাবে ধরিয়া লইয়া ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়াছে। এমন এক পরিস্থিতিতে ফাতাহ-হামাস সরকার কেমন করিয়া অগ্রসর হয় তাহা দেখিবার বিষয় হইবে বটে।
সমস্যা রহিয়াছে হামাসের দিক হইতেও। প্রেসিডেন্ট মাহামুদ আব্বাস জানাইয়া দিয়াছেন যে, নূতন সরকার ইতোমধ্যে অর্জিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার ধারাগুলি মান্য করিবে। ইহার অর্থ হইতেছে ফিলিস্তিন সরকার ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করিবে এবং লক্ষ্য অর্জনে সহিংসতার পথ পরিহার করিবে। কিন্তু প্রশ্ন হইতেছে এমত একটি ঘোষণার সহিত হামাস নিজেকে কেমন করিয়া মানাইয়া লইবে? আর হামাস যদি মানাইয়া লইতে ব্যর্থ হয় তাহা হইলে ফাতাহ কেমন করিয়া হামাসের সহিত তাল মিলাইবে? উল্লেখ্য, হামাস ইসরায়েলের অস্তিত্ব অস্বীকার করে এবং ফিলিস্তিনের লক্ষ্য অর্জনে বল-প্রয়োগের নীতির অনুসারী। হামাস যদি সরকারের যোগদানের পরেও এই দুই অবস্থানে অটল থাকে তাহা হইলে ফাতাহ মানাইয়া লইবে কি করিয়া? আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শান্তি-প্রক্রিয়ার তদবির করিবে কেমন করিয়া? এত জটিলতার মধ্যেও আশার কিছু বীজ উপ্ত হইয়া আছে। আশা করা যাইতেছে যে, নূতন গঠিত সরকারের বরাতে ফিলিস্তিনে দীর্ঘ-বিলম্বিত সাধারণ নির্বাচন এবং রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত হইতে শুরু করিয়াছে। আগামী বত্সরের কোন এক সময়ে এই দুই নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কোন কোন বিশ্লেষক আশাবাদও ব্যক্ত করিতেছেন। এমন যদি কিছু হয় তাহা হইলে ফিলিস্তিনীদের রাজনৈতিক ভাগ্য প্রসন্ন হইতে শুরু করিয়াছে বলিয়া ধরিয়া লইতে অসুবিধা হইবে না।
