স্মরণ

ড. মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ

আপডেট : ০৫ জুন ২০১৪, ২১:৪৪
বন্ধুবর ড. রহমাতুল্লাহ গত ২৮ মে বুধবার ইন্তিকাল করেন (ইন্নালিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাইহে রাজেউন)। দীর্ঘকাল অসুস্থ এবং আমেরিকায় treatment-এ আছে বলে জানতাম। সেদিন জনাব বারী সাহেব (Retd. Commissioner Ctg Div.) জানান, হালিম গতকাল তোমার বন্ধু রহমাতুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেছে—শুনে অত্যন্ত মর্মাহত হই। আমার ধারণা সে বিদেশেই আছে—কিন্তু যখন জানতে পারলাম সে ঢাকাতেই ছিল তখন মনোপীড়ায় ভুগছি। ড. রহমাতুল্লাহ সিপিডি-এর সিনিয়র ফেলো, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য, ব্যাংকককে অবস্থিত জাতিসংঘ-এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এতদ্ব্যতীত এশিয়ান হাইওয়ে ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে তার অতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং-এ Ph.D ডিগ্রিধারী। মনে পড়ে পঞ্চাশ দশকের কথাঃ আমরা চার বন্ধু তাজুল (উফা মিয়া), রহমাতুল্লাহ (এরশাদ), মোস্তফা (সুফি) ও আমি একই মহল্লায় একই স্কুলে একত্রে পড়াশুনা করেছি, বড় হয়েছি। নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও আন্তরিকতার কোন অভাব ছিল না। সেদিনের স্মৃতি মনে পড়ে, যেদিন মেট্রিক (বর্তমান এসএসসি) পরীক্ষার ফল বের হয়। গ্রিন এ্যারো নামক ট্রেনে খবরের কাগজ আসবে এবং এরই জন্য ব্রাহ্মণবাড়ীয়া স্টেশনে আমরা চারজন উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছি—সবার মনেই দুরু দুরু ভাব। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল আমরা সবাই দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছি—তবে রহমত উল্লাহর উপর আমাদের প্রত্যাশা ছিল বেশি যা পরবর্তীতে সে অত্যন্ত সাফল্যজনকভাবে প্রদর্শন করেছে, শুধু তাই নয় একজন সার্থক ও সুদক্ষ ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে দেশে-বিদেশে সুখ্যাতি অর্জন করেছে। উচ্চ শিক্ষার তাগিদে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি, তবে যোগাযোগ ও হূদ্যতা আজও অক্ষুণ্ন আছে। বিশ্ব ইস্তেমায় এসে ‘তাজুলের’ আকস্মিক অকাল মৃত্যু আমাদের ব্যথিত করেছে। দোস্ত (এ বলেই সে আমায় সম্বোধন করত) রহমত উল্লাহর মৃত্যু ঠিক অকালীন নয়, তবে দীর্ঘদিন রোগ ভোগ করেছে। তাকে নিয়ে দেশ-বিদেশে অনেক স্মৃতি বিজড়িত। সদা হাস্যমুখ সহজ-সরল নিরহংকার। বন্ধু বাত্সল্যে উদ্বেলিত। কালে-ভদ্রে দেখা হলে স্থান-কাল-পরিবেশ মর্যাদা ভুলে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়তো। আমি তখন এমসি কলেজ, সিলেট-এর অধ্যাপক। এককালের সহকর্মী জনাব শওকত সাহেবের সাথে দেখা করতে প্ল্যানিং কমিশনে গিয়েছি। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার রহমত উল্লাহ সাহেবকে কি আপনি চিনেন? তিনি তো বর্তমানে এখানে প্ল্যানিং চিফ। যোগাযোগ করিয়ে দিলে রহমত উল্লাহ বলেন, টুক্কু! তুমি কোথায়, লোক পাঠাচ্ছি এখনই চলে এস। গেলাম। আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরলো, তারপর দুই সুহূদ বন্ধুর একান্তে অ-নে-ক কথা। ফিরে আসার সময় ড্রাইভারকে বলল, উনাকে পৌঁছিয়ে দিয়ে আস এবং আমাকে বলল, বিকাল চারটে গাড়ি যাবে—সারাবেলা ঘুরে ফিরে আটটায় আমার এখানে চলে আসবে। তার আন্তরিকতা, হূদ্যতা ও আতিথেয়তায় আমি ও আমার স্ত্রী উভয়েই মুগ্ধ, অভিভূত। ১৯৯৯-এর অক্টোবরে আমরা ঢাকায় চলে আসি। রহমত উল্লাহ তখন বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত একজন ব্যস্ত মানুষ। সাক্ষাত্ না হলেও ‘টক শোতে’ প্রায়শ: তাকে দেখি, যোগাযোগ করি। এরই মধ্যে হঠাত্ একদিন সে ফোনে বলে, স্কুল জীবনের সতীর্থদের নিয়ে একটা get together করছি, সুফিকে নিয়ে চলে এসো। দেখা হলো অনেক পুরানো বন্ধুদের সাথে। সেখানে উপস্থিত ছিল: জনাব সফি সামী (সাবেক উপদেষ্টা তত্ত্বাবধায়ক সরকার), জনাব তোফায়েল সামী (প্রখ্যাত সুরকার), বন্ধুবর ব্যবসায়ী হাবিবুল্লাহ, বন্ধু সলিল, নজরুল (প্রয়াত) এবং আনু ভাইসহ (প্রয়াত) আরো অনেকে। সেদিনের সেই মধুময় স্মৃতি আজও আমার চোখে ভাস্বর। বিদায় মুহূর্তে রহমত উল্লাহকে চুপি চুপি বলি, ব্যাপকভাবে get together করা হয়তো আমার পক্ষে সম্ভব হবে না, তবে তুমি ও সুফি এদিন (তারিখ মনে নেই) চলে এস। সেদিন আমরা আচার-আচরণে চপল-চঞ্চল বিদ্যালয়ের বালক হয়ে গিয়েছিলাম। রাত দশটায় বিপত্নীক বন্ধুর বাসা থেকে রহমাতুল্লাহ সস্ত্রীক চলে গেল, এরপর ফোনে যোগাযোগ হলেও আর সাক্ষাত্ হয়নি। পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে তার আত্মার প্রশান্তি কামনা করি। লেখক :সাবেক অধ্যক্ষ এমসি কলেজ, সিলেট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন