কিছু কিছু রোগ বা ইনফেকশনের সৃষ্টি হয় মাইক্রবস বা অণুজীব বা জীবাণু দ্বারা (ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস, প্রটোজোয়া, ভাইরাস)। সেই রোগ বা ইনফেকশনগুলো হচ্ছে যেমন নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও টিউবারকোলসিস বা যক্ষ্মা। এক সেঞ্চুরি আগেও এই রোগগুলো কোনো সাধারণ রোগ ছিল না, ছিল বরং ভয়ানক আতঙ্কিত ও অপ্রতিরোধ্য। এগুলো আমাদের এনসেসটার বা পূর্বপুরুষদের অমূল্য জীবনকে নিমিষেই কেড়ে নিত। কারণ এই অসুস্থতাগুলোর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকরী প্রতিষেধক তখনো আবিষ্কৃত হয়নি। আরো জেনে অবাক হতে হয় যে, ১৯০০ সালের দিকে আমেরিকাতেও সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যেত মাইক্রোবাইল ডিজিজের মাধ্যমে অর্থাত্ নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে (ন্যাচার ম্যাগাজিন, ২৯শে মে, ২০১৪)। শত বছর আগে এই রোগগুলো সাড়া পৃথিবী জুড়েই ছিল আতঙ্কের এবং জীবনঘাতী। এখন তা আর ভয়ানক বা মহামারী কিছু নয়। খুব সাধারণ রোগ এগুলো এখন। কারণ এন্টিবায়োটিক ও অন্যান্য আধুনিক মেডিসিন আবিষ্কারের ফলে মাইক্রোবাইল ডিজিজগুলোকে মহামারী পর্যায় থেকে নামিয়ে একেবারে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা সম্ভবপর হয়েছে। অথচ শত বছর বা এক সেঞ্চুরি পরে এসে আমরা নতুন নতুন রোগের বিরুদ্ধে জীবন বাঁচানোর জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছি। যেমন এখন আমেরিকাতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় হার্টডিজিজ ও ক্যান্সারে (ন্যাচার ম্যাগাজিন, ২৯ মে, ২০১৪)। ক্যান্সারগুলো যেমন- ব্রেসট, সারভিক্যাল, কোলোরেকটাল (কোলন), প্রোস্টেট, লাং, প্যানক্রিয়াটিক ইত্যাদি। বিজ্ঞানীরা গবেষণার মাধ্যমে অনেক ক্যান্সারকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে পারলেও কিছু কিছু ক্যান্সার রয়েছে যা অপ্রতিরোধ্য ও জীবনঘাতী। যেমন প্যানক্রিয়াটিক, লাং বা ফুসফুসের ক্যান্সার। আবার অনেক ক্যান্সার আছে যেগুলো কীভাবে শরীরের মধ্যে নিজের অজান্তে বাসা বাঁধে তার Mechanistic Pathway সম্পর্কে এখনো অনকোলজিস্টদের কাছে অজানা। তবে অনেক ক্যান্সার সৃষ্টির কারণ, লক্ষণ ও প্রিভেনশন সম্পর্কে এখন অনকোলজিস্টদের সুস্পষ্ট ধারণা রয়েছে। পরিবেশ দূষণ, কারসিনোজেনিক কেমিক্যালস, জেনেটিক মিউটেশন ইত্যাদি নানাবিধ কারণ যেমন ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য অনেকাংশেই দায়ী, তেমনি ডায়াবেটিস, অবেসিটি, খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম না করা, ধূমপান ইত্যাদি শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টির ঝুঁকিও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। যেমন দূষিত বায়ু লাং ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য অনেকাংশেই দায়ী। কারণ দূষিত বায়ুর মধ্যে থাকে অনেক কারসিনোজেন (যেসব বস্তু ক্যান্সার সৃষ্টি করে)। সিগারেটের ধোঁয়া বায়ুকে দূষিত করে। সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে থাকে বিভিন্ন মাত্রায় অনেক ধরনের কার্সিনোজেন যেমন লেড, নাইট্রোসোনিকোটিন, এক্রাইলোনাইট্রাইল, এসিটালডি-হাইড, ১, ৩-বিউটাডাইন, আর্সেনিক, হাইড্রোজিন, আইসোপ্রিন, ফরমালডিহাইড ইত্যাদি (ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ এন্ড হিউম্যান সার্ভিসেস)। তাই পরিবেশ দূষণ তথা কার্সিনোজেন বা ক্যান্সারের হাত থেকে রক্ষা পেতে ধূমপান করা থেকে বিরত থাকার জন্য ডাক্তাররা ধূমপায়ীদেরকে বিনীতভাবে পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
আমরা অনেকেই জানি যে, ফরমালডিহাইড হচ্ছে একটি মারাত্মক কার্সিনোজেন। ২০১১ সালে আমেরিকার ন্যাশনাল টক্সিকোলোজি প্রোগ্রাম ফরমালডিহাইডকে একটি নির্দিষ্ট হিউম্যান কার্সিনোজেন হিসাবে সনাক্ত করেছেন। আর ফরমালিন হচ্ছে সেই ফরমালডিহাইডেরই জলীয় দ্রবণ। অথচ এই কারসিনোজেনিক মেটারিয়াল ফরমালিন আমাদের দেশে যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহূত হচ্ছে। ফরমালিনের ক্ষতিকারক দিকগুলো জেনেই হউক বা না জেনেই হউক ব্যবসায়ীরা তা খাদ্য সামগ্রীর সঙ্গে হরহামেশা মেশাচ্ছেন এবং তা বাজারগুলোতে অহরহ বিক্রিও করছেন। অথচ মিশ্রণকারী ও ভোক্তাগণ উভয়পক্ষই আসলে শারীরিকভাবে চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। ফরমালিনের প্রভাব তাত্ক্ষণিকভাবে বোঝা যাবে না। শরীরের ক্ষতি বোঝা যাবে আপনি কত মাত্রায় কতদিন বা কত বছর ধরে ফরমালিন বা ফরমালডিহাইডের দ্বারা এক্সপোজড হচ্ছেন। সুতরাং এক্সপোজার লেভেল এবং সময় ব্যবহারকারী ও ভোক্তার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের ব্যবধান এবং ফরমালডিহাইডের বিভিন্ন এক্সপোজার লেভেলের উপর ভিত্তি করে ফুসফুসের ক্যান্সার, অরাল ক্যান্সার, Nasopharyngeal ক্যান্সার, ব্রেন ক্যান্সার এমনকি লিউকমিয়াও (ব্লাড ক্যান্সার) হতে পারে। তাই ফরমালিন ব্যবহার বা মিশ্রণকারীদেরকে সতর্কীকরণ করা বা তাদেরকে কঠোর আইনের আওতায় আনা যেমন সরকারি দায়িত্ব, তেমনি এর বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করাও আমাদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে বর্তায়।
ফরমালিন ছাড়াও আরো অন্যান্য কেমিক্যালস দ্রুত ফল পাকানোসহ নানাবিধ উদ্দেশ্যে খাদ্য সামগ্রীতে মিশানো হচ্ছে। এসব খেয়ে দিন দিন নানাবিধ রোগে অসুস্থ হয়ে পড়ছে মানুষ।
ক্যান্সার যে একটি ব্যক্তির জীবনকেই শুধু অকালে কেড়ে নেয় তা নয়। ঐ পরিবারের সকলকে কাঁদায় ও নিঃস্বও করে দেয়। ক্যান্সারের চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই এর খরচ মেটানো (সার্জারি ও কেমোথেরাপি) অনেক পরিবারের সাধ্যের বাহিরে রয়ে যায়। যে কারণে ঐ আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুও ঘনিয়ে আসে কাছে। আমার নিজের জন্য এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক যে, আমার নিকট আত্মীয়দের মধ্যে চারজন গত একবছরের মধ্যে বিভিন্ন ক্যান্সারে দেশে মারা গেছেন যাদের পরম স্নেহ ও ভালবাসার স্পর্শ আমার শরীরের সঙ্গে এখনো লেগে আছে। তাদের অনেকেই কেমোথেরাপি নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে, বগুড়া এবং রংপুরের ক্লিনিকে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। যাদের সকলের সঙ্গেই আমার ২০১০ সালে দেশে দেখা হয়েছিল। এবার জুলাই মাসে আবার দেশে যাবো কিন্তু তাদেরকে আমি আর দেখতে পাবো না। তাদের অকৃতিম স্নেহ ও ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হব। খুব কষ্টের।
আসুন আমরা সকলে ধূমপান মুক্ত থাকি। ফরমালিনযুক্ত খাবার পরিহার করি। ফরমালিনমুক্ত খাবার বাজারে সরবরাহ করার অভ্যাস গড়ে তুলি। নিজেকে প্রথমে ক্যান্সারের হাত থেকে রক্ষা করি। তারপর ক্যান্সার ফ্রি পৃথিবী গড়তে একে অপরকে সহায়তা করি।
লেখক :ওহাইও স্টেটে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত
[email protected]
