প্রজ্ঞা, পরিমিতিবোধ ও মিষ্টভাষী গণতন্ত্র

আপডেট : ০৭ জুন ২০১৪, ২১:৪৭
মা বলতেন, বাজারের মিষ্টি সবাইকে তুষ্ট করতে পারে না। কেউ খায় কেউ খায় না। কিন্তু কথার মিষ্টতা সবাই চায়। আমাদের শিল্প সাহিত্য জীবন দর্শন শাস্ত্রে এই বিষয়ের ওপর বারংবার গুরুত্ব ও জোর দেয়া হয়েছে। মিতভাষী, মিষ্টভাষী মানুষ ধর্মেও স্বীকৃত। বাল্যশিক্ষায় বাঙালিকে সতর্ক করেছিলেন স্বয়ং বিদ্যাসাগর। খল ও কটু বাক্য বলাদের কেউ তেমন পছন্দ করে না। বিশেষত রমণী হলে তো কথাই নেই। যে কারণে শাস্ত্রে তাদের প্রিয়ংবদা বলা হয়েছে। প্রিয় কথায় জগত্ জয় করার জন্য প্রেরণা দেয়া রমণী আজ বিশ্বজয়ী, তাদের হাতে আমাদের ভাগ্য, ক্ষমতা, সমাজ রাষ্ট্র, জনগণের দায়িত্ব। এই উত্থান বিস্ময়ের। এই ধারাবাহিকতা গৌরবের। সতের বছর একটি পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও উদার রাজনীতির দেশে বাস করছি। যেখানে রাজনীতি কখনোই সর্বগ্রাসী নয়। ইচ্ছা অনিচ্ছায় ক্ষমতাসীনরা জনগণের সেবক। বিরোধী দল নিয়মের ছকে বাঁধা। অতি কথন বা প্রগলভতা চলে না। চলে না খেয়াল-খুশির খেলা। তর্জনী উঁচিয়ে শাসানো, জ্বালাও, পোড়াও অচলের দেশেও কিন্তু নারী প্রধানমন্ত্রী বেশি সময় টেকেননি। আমাদের মত গরীব উন্নয়নশীল দেশ উন্নত অস্ট্রেলিয়ার অনেক আগেই নারী শাসনে প্রবেশ করেছে। দেশের প্রাক্তন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের নেতাও নারী। নারীত্বের এই জয়জয়কার বা নেতৃত্ব অনেকেই ক্ষণিকের বলে ভাবতেন। অনেক বিজ্ঞ বিশ্লেষক মতামত দিয়েছিলেন টিকবে না। জোড়া দেয়ার জন্য বা জোড়াতালির জন্যে আগতদের প্রয়োজন ফুরোলেই নারী নেতৃত্বের অবসান হবে। হয়নি। মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা বা অন্যান্য জুজুর চোখে আঙুল দিয়ে তাদের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে আজো সে ধারা প্রবহমান। অথচ অস্ট্রেলিয়ার নারী নেতৃত্ব - জুলিয়া গিলার্ড বেশি দিন টিকতে পারেননি। দলের অন্তর্কোন্দলে মধ্যবর্তী নির্বাচন দেয়ার মত জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে বিদায় নিতে হয়েছিল। সে এক কঠিন সময়। নিজেদের ভেতর ঝগড়া-বিবাদ আর নেতৃত্বের কোন্দল। আমাদের সাথে পার্থক্য এই, কেউ কটু ভাষা হতে পারেনি। শাণিত যৌক্তিক আর গণতান্ত্রিক আক্রমণে একে অপরের চোখে জল আনলেও ভাষা শালীনতা হারায়নি। এই ব্যবহার বা আচরণ আমরা পাশের দেশ ভারতেও দেখি! সে দেশে তো একশ পার্সেন্ট মানুষ শিক্ষিত নয়। অজ্ঞান, পাপ আর জাতপাতের বোঝায় হিমশিম খাওয়া সে দেশে ধর্মীয় ঝাণ্ডাধারী দল ক্ষমতায়। অথচ তারাও ভাষা ব্যবহারে পরিমিত। বাংলাদেশের রাজনীতি এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে সুশীলরাও তা মানেন না। প্রায়ই টকশো বা অন্যান্য আলাপচারিতায় তার আঁচ দেখতে পাই। এমনও হয়, টকশো’র মাঝখানেই রেগে দাঁড়িয়ে যায় কেউ কেউ। ফোন খুলে নেয়, কান থেকে ধারণযন্ত্র খুলে মারমুখো হয়ে বেরিয়ে যেতেও দ্বিধা করে না। সবকিছুর কারণ ও উত্স একটাই ক্রোধ। বাংলাদেশের মত শ্যামল সবুজ, ঘনবসতির দেশে মায়ার সমাজে কখনো এত ক্রোধ ছিল না। বিদেশের মানুষগুলো অন্য ধাতুতে গড়া কিছু নয়। তারাও রক্ত-মাংসের প্রাণী। তাদের রাগ ক্ষোভ বেদনা উচ্ছ্বাস আমাদের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। বরং তারা অনেক বেশি সংগঠিত আর চতুর। তাদের ভালোবাসার প্রকাশ যদি হয় ইউরোপ, ঘৃণা বা জেদের প্রকাশ সিরিয়া ও আফগানিস্তানের মত দেশ। অথচ তারা উচ্চবিত্ত নয়। নিজেদের ভেতর রেষারেষি বা প্রতিযোগিতা থাকলেও তা অন্যের সামনে নগ্নভাবে তুলে ধরে না। এদের ভালো দিকগুলো নেয়ার তাগিদ দেখি না। খালি উন্মাদনা, উত্তেজনা আর রগরগে দিকগুলোই যেন আরাধ্য। নিতে নিতে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছি আমরা, ঢাকার মত নেশা, মাদক, খুন বা অরাজক পরিস্থিতি কল্পনা করাও দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে। অথচ এগুলোর রক্ষাকবচ আমাদের অজানা কিছু নয়। কোমলমতি শিশু-কিশোরদের নিয়ে এক সময় বাণিজ্য ছিল না। ছিল সংগঠনভিত্তিক বেড়ে ওঠা। কচি-কাঁচার আসর ও দাদাভাই ছিলেন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া অবধি পরিচিত। ছিল খেলাঘর, মুকুলের মাহফিল, চাঁদের হাট ইত্যাদি। এখন শুনি আওয়ামী শিশু লীগ, জাতীয়তাবাদী কিশোর দল, জাতীয় পার্টিরও আছে বোধকরি। এগুলো সুস্থতার লক্ষণ নয়। আজ রাজনীতি আমাদের শিশু-কিশোর এমন কি যুব শক্তিরও প্রেরণার কিছু নয়। যে মন্দ ভাষায় কথা বলে। দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বিদেশে অবস্থানরত যুবকও আজ আর শালীনতার ধার ধারে না। গণতান্ত্রিক সভ্য দেশ ও সমাজে বসবাসের পরও কেউ যখন জনক বা জাতির মহীরুহ বিষয়ে অভব্য ভাষায় কথা বলে বুঝতে হবে, পচন ধরে গেছে, সে পচন এখন পুরো শরীরে। দেশের মাথাও উগ্র হয়ে উঠছে সে কারণে, অথচ এই উপমহাদেশে চরম বৈরিতায়ও নেতাদের সহিষ্ণুতা দেখেছি আমরা। পাক-ভারত যুদ্ধের শান্তি চুক্তি সম্পাদনকালে হঠাত্ প্রাণ হারানো শাস্ত্রীর লাশ কাঁধে নিয়েছিলেন আইয়ুব খান। কথিত আছে, তিনি পায়ের দিকটি বেছে নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে পরাজিত পাকিস্তান যখন ভারতের সাথে সিমলা চুক্তি করতে গিয়েছিল ভুট্টো বেনজীরকে সাথে নিতে ভোলেননি, উদ্দেশ্য ইন্দিরা দর্শন ও তাঁর কাছ থেকে সবক নেয়া। আমাদের বঙ্গবন্ধুও কোনদিন ভাসানী সবুর খান বা মনি সিংহদের বিষয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। আজ যখন বাংলাদেশ এগুচ্ছে তার শরীরে উন্নয়নের ছোঁয়া, আলো ঝলমল নগর, বন্দর, অন্ধকার মুছে মাথা উঁচু করে নিজের অস্তিত্ব জানাচ্ছে, তখন এই উগ্রতা বাকযুদ্ধ আর পারস্পরিক দ্বেষ কিছুতেই মঙ্গলের প্রতীক হতে পারে না। অস্থিরতা ও গণতন্ত্র এক সাথে চলে না। বাকযুদ্ধ ও শান্তি তারাও একসাথে বসবাস করে না। শালীনতা আর সৌজন্যে বহিরাঙ্গিক ঐক্য না থাকলে আমরা চিরকাল দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকব, তাই মুক্তির পথ আজ জরুরি (সিডনী থেকে)

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন