দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় যজ্ঞেশ্বর। ওদের বাবা গুরুদয়াল দে বরিশাল জেলা আদালতে চাকরি করতেন, কিন্তু মূল নিবাস ছিল ঢাকা জেলায়। বরিশাল ব্রজমোহন স্কুলের ছাত্র যজ্ঞেশ্বর ও তাঁর ছোট ভাই রমেশ। রমেশের লেখাপড়া হলেও যজ্ঞেশ্বরের লেখাপড়া হলো না। ছেলেটির পড়ার চেয়ে গানের প্রতি ঝোঁক অনেক বেশি। সারাক্ষণ গুনগুন করে গাইতেন কীর্তন। গানের গলাও খুব মিষ্টি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করে এক কীর্তন দলে যোগ দিলেন। তাঁর দরাজ গলার অপূর্ব মিষ্টি সুর দলের সুনাম বৃদ্ধি করেছিল। একবার তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হলেন এক বিজ্ঞ বৈষ্ণব রামানন্দ গোস্বামী। তিনি যজ্ঞেশ্বরকে ডেকে নাম জিজ্ঞেস করলেন। বৈষ্ণব বললেন, তোমার মতো একটি ছেলে শ্রীচৈতন্যকে গান শোনাত। শ্রীচেতন্য তন্ময় হয়ে শুনতেন। আজ থেকে আমি তোমার নাম দিলাম ‘ মুকুন্দ দাস’। এরপর থেকে যজ্ঞেশ্বর নিজেকে মুকুন্দ দাস বলেই পরিচয় দিতেন। সময়টা ছিল স্বদেশী আন্দোলনের যুগ। মুকুন্দ দাস কবি হলেও দেশের এ সময়ে দেশের কথা ভুলে থাকতে পারেন নি। তিনি স্বদেশী যাত্রা নামে একটি যাত্রা দলের পালার জন্য গান ও বক্তৃতা লিখতে শুরু করলেন। তাঁর সে গানে ও বক্তৃতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কত যুবক দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত হলো । মুকুন্দ দাস এভাবে গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে আগুন জ্বালাতে থাকেন। গানে গানে তিনি যুবকদের অধ্যবসায়ী, পরিশ্রমী ও স্বাবলম্বী হতে উত্সাহ যোগাতে থাকেন। মুকুন্দ দাসের কণ্ঠে ছিল এক সম্মোহনী শক্তি। ‘ মুকুন্দ দাসের গান হবে’ একথা শুনলেই হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসতো গানের সভায়।তিনি গাইতেন—
গাইব কি, শুনবে কে রে
আছে কি কারো কান ?
পাবো কিরে তেমন ছেলে
দেশের তরে দিবে প্রাণ ?
এভাবে গানের সুরে প্রাণের টানে দেশপ্রেমে আত্মনিবেদন করেছিলেন চারণ কবি মুকুন্দ দাস। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদান কোনো অংশেই কারো চেয়ে কম নয়। নিজে দেশকে ভালোবেসেছেন, সাথে সাথে হাজারো মানুষকে দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত করেছেন তিনি। তাঁর গান বাংলার কৃষক, তাঁতীসহ সাধারণ মানুষের অনেকের মাঝেই এখনো বেঁচে আছে। মুকুন্দ দাসের সবচেয়ে বড় অর্জন গানে ও বক্তৃতায় মানুষকে দেশের প্রতি কর্তব্যনিষ্ঠ করেছেন। আর সবটাই ছিল তাঁর প্রাণের তাগিদ। কোনো সুখ্যাতি কিংবা যশের মোহে তিনি গান গান নি।
