গত শুক্রবার খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মানিকছড়ির আমতলায় নির্মিত বেইলি ব্রিজটি ভাঙিয়া নদীতে পড়িয়া যায়। চট্টগ্রাম হইতে ছাড়িয়া আসা পাথর বোঝাই একটি ট্রাক ও ফটিকছড়ি হইতে ছাড়িয়া আসা একটি মাইক্রোবাস একই সময়ে ব্রিজটিতে উঠিয়া পড়িলে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় এই পর্যন্ত কেহ নিহত হইবার সংবাদ না পাওয়া গেলেও গুরুতরভাবে আহত হইয়াছেন ১৬ জন। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সম্পর্কিত ছবিতে ব্রিজের মাঝে পাথরবাহী সেই ট্রাকটি পড়িয়া থাকা এবং অ্যাপ্রোচে যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটি ঝুলিয়া থাকার দৃশ্যটি দেখিয়া যে কেহ বিচলিতবোধ করিবেন। আসলে এই ছবিটি বাংলাদেশের সকল ভগ্ন ও জরাজীর্ণ বেইলি ব্রিজের একটি প্রতীকী রূপ মাত্র। প্রকৃতপক্ষে বেইলি ব্রিজে দুর্ঘটনার কারণে হতাহতের ঘটনা প্রতি বত্সরই বাড়িতেছে। যেমন-নেত্রকোনা-দুর্গাপুর সড়কে জারিয়া কংস নদীর ওপর নির্মিত বেইলি ব্রিজটিতে গত ১৫ বত্সরে দুর্ঘটনার কারণে নিহত হইয়াছে কমপক্ষে ২৩০ জন। এরূপ দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় বেশ কিছুৃদিন সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকে। ফলে জনদুর্ভোগ বাড়িয়া যায় বহুমাত্রায়। কিন্তু এসব দুর্ভোগ আমলে নিয়া প্রায়শ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না।
একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে নির্মিত বেইলি ব্রিজ বত্সরের পর বত্সর ঝুঁকিপূর্ণ থাকিবে কিংবা তাহাতে বেআইনিভাবে অতিরিক্ত মাল বোঝাই গাড়ি চলাচল করিবে এবং কর্তৃপক্ষ তাহা দেখিয়াও না দেখিবার ভান করিবে, এই দায়িত্বহীনতা আর চলিতে পারে না। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সারাদেশে স্টিল ও টিম্বার ডেকের বেইলি ব্রিজ রহিয়াছে যথাক্রমে ১০০৫ ও ৮২টি। ইহাছাড়া স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের অধীনেও অনেক বেইলি ব্রিজ আছে। কিন্তু অনেক বেইলি ব্রিজের অবস্থাই শোচনীয়। বেইলি ব্রিজগুলি নির্মাণই করা হয় অস্থায়ীভাবে। স্থানান্তরযোগ্য অস্থায়ী ব্রিজের মেয়াদ উত্তীর্ণ হইবার আগেই সেই স্থানে পাকা স্থায়ী ব্রিজ নির্মিত হইবে—এমনটি স্বাভাবিক। তাহা একান্ত সম্ভবপর না হইলেও সাধারণত চার-পাঁচ বত্সর পর পর ইহার সংস্কার করা অত্যাবশ্যকীয়। কিন্তু বেশিরভাগ ব্রিজের বয়স ২৫-৩০ বত্সর পার হইয়া গেলেও সংস্কার করা হয় না। তদুপরি রহিয়াছে দুর্বৃত্তদের দ্বারা ব্রিজের পাত ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ খুলিয়া নেওয়ার উত্পাত। অন্যদিকে ওভারলোডেড যানবাহন চলাচল করিবার ফলে ব্রিজগুলি শীঘ্রই ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া ওঠে। নিয়ম অনুযায়ী বেইলি ব্রিজের ওপর দিয়া পাঁচ টনের বেশি মালামাল বহন করা যায় না। তাহাসত্ত্বেও, অনেক সময় ২০ টন মালামাল নিয়া যানবাহন চলাচল করে। প্রশাসনের নাকের ডগায় চলে এই অনিয়ম। বলাবাহুল্য, এই খামখেয়ালিপনার নির্মম শিকার হইতেছে সাধারণ মানুষ।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে বেইলি ব্রিজের উন্নতি সাধিত হয়। ইহার মডেল তৈরি করেন ডোনাল্ড বেইলি ও তাহার নামেই এই ধরনের ব্রিজের নামকরণ হয়। সাধারণত বেইলি ব্রিজ নির্মাণ করা হয় যুদ্ধকালীন বা বিশেষ পরিস্থিতিতে। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি যেভাবে বিকশিত হইতেছে এবং নূতন নূতন সম্ভাবনা তৈরি হইয়াছে, তাহাতে এই দেশে বেইলি ব্রিজের প্রাসঙ্গিকতা আর অবশিষ্ট নাই। এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থার স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাকা সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা রাখিয়া পিলারের উপর বেইলি ব্রিজ স্থাপন করা হয়। এমতাবস্থায় অগ্রাধিকার নির্ধারণপূর্বক বেইলি ব্রিজের স্থলে স্থায়ী ও মজবুত ব্রিজ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।
