[ ন গ র জী ব ন ]

ঢাকা :বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে

আপডেট : ০৮ জুন ২০১৪, ২১:১৯
বর্তমানে সারা দুনিয়ায় যতো শহর আছে তার মধ্যে বসবাসের জন্য সবচেয়ে অযোগ্য শহর হলো ঢাকা শহর। যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক এক তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন থেকে একথা জানা গেছে। একটি শহরের বাসযোগ্যতার পরিমাপের জন্য এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি (১) স্থিতিশীলতা, (২) স্বাস্থ্যসেবা, (৩) সংস্কৃতি ও পরিবেশ, (৪) শিক্ষা, (৫) অবকাঠামো— এই পাঁচটি বিষয়ের সুনির্দিষ্ট ৩০টি সূচক ব্যবহার করেছে। তথ্যভিত্তিক পরিমাপ করে তারা দেখেছে যে, বসবাসযোগ্যতার দিক থেকে বিশ্বের ১৪০টি দেশের মধ্যে ঢাকার অবস্থান হলো একেবারে তলানিতে—সর্বশেষে। সব সরকারের আমলেই ঢাকাকে ‘তিলোত্তমায়’ পরিণত করা হবে বলে অসংখ্যবার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যে, ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তোলার পথে ঢাকাবাসীরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন— সেগুলো দূর করা হবে। ঢাকাবাসীরা বারবার আশায় বুক বেঁধেছে। তারা স্বপ্ন দেখেছে— ঢাকা শহর তার সব অধিবাসীর জন্য একটি ন্যূনতম মানের বাসযোগ্য শহর হয়ে উঠবে। কিন্তু সে স্বপ্নের সামান্যটুকুও বাস্তবে পরিণত হয়নি। অবস্থার উন্নতির বদলে বরঞ্চ বসবাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হয়েছে। এখন অবস্থা আরো দ্রুত অবনত হচ্ছে। সাধারণ নগরবাসীর জন্য ঢাকা এখন বসবাসের প্রায় অযোগ্য শহর হয়ে উঠেছে। অথচ যারা রাষ্ট্র ও সমাজের মাথায় অবস্থান করছে, এ নিয়ে তাদের যেন কোনো মাথাব্যথাই নেই। তারা বিদেশে ঘর-বাড়ি, বিষয়-সম্পদ বানিয়ে নিয়েছে। খাদ্যদ্রব্যসহ নানা ধরনের জিনিসপত্র বিদেশ থেকে এনে তারা তাদের ‘আলিশান’ পৃথক ‘ভুবন’ সাজিয়ে নিয়েছে। ঢাকা শহরের প্রতি তাদের মনোভাব ও আচরণ একটি ‘পরিত্যক্ত’ শহরের প্রতি যেমন হয়ে থাকে, প্রায় তেমনতর হয়ে উঠেছে। ঢাকার নাগরিক জীবন এখন প্রায় অচল ও অসহনীয়। বাইরে থেকে শহরে ঢুকতে গিয়ে প্রথম শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার সময়েই সেটা টের পাওয়া যায়। বাতাসে দূষণের মাত্রা এতটাই যে, মনে হয় হঠাত্ দম আটকে আসা এক ভিন্ন জগতে প্রবেশ করলাম। মনে হয়, বাতাসের তাপমাত্রা যেন ঝট করে বেড়ে গেল। বাইরের স্নিগ্ধ প্রাণ জুড়ানো বাতাসের গন্ধটা বদলে কেমন যেন উত্কট হয়ে উঠল। নাক দিয়ে যে বাতাস ফুসফুসে গিয়ে ঢুকতে শুরু করলো, তা যেন চকিতে ভীষণ ভারি ভারি ঠেকতে লাগল। কানের পর্দায় হরেক রকম আওয়াজ এসে ভয়ঙ্কর মাত্রায় ক্রমাগত আঘাত করা শুরু করল। চোখ বন্ধ থাকলেও শুধুমাত্র এসব অনুভবের মধ্যদিয়েই একজন মানুষ বুঝে নিতে পারে যে, এখন ঢাকায় প্রবেশ করলাম। এটা কেবল যন্ত্রণার শুরু। পদে পদে সবকিছুর অসহনীয় অবস্থা নগরবাসীর অস্তিত্বকে বিদ্ধ করে চলেছে। এখনো চলছে ক্রমাগত বিদ্যুত্ সঙ্কট, লোডশেডিং। গ্যাস কখনো আছে, কখনো নেই অথবা প্রেসার কম। ওয়াসার পানির অবস্থাও সে রকমই। শুধু তাই নয়, পাইপ দিয়ে আসে দুর্গন্ধময় অপেয় পানির সাপ্লাই এবং মাঝে মাঝে লাল জলজ প্রাণীও আসে সে পানির সাথে। সামান্য বৃষ্টিতে বড় বড় রাস্তাগুলো চলে যায় পানির নিচে, ভেতরের অলি-গলি-বাড়ি-ঘর হয়ে পড়ে জলাবদ্ধ। ঘণ্টা-দিন ধরে মানুষকে হয়ে থাকতে হয় জলবন্দী। খাল, পুকুর সব ভরাট হয়ে গেছে, বৃষ্টির পানি বেরিয়ে যাওয়ার পথ নেই। স্যুয়ারেজ লাইন ময়লায় জ্যাম হয়ে আছে। বক্স-কালভার্ট-স্টর্ম স্যুয়ারেজ ইত্যাদি পলিথিন ব্যাগসহ আবর্জনায় ভরাট হওয়াতে অচল। এর মাঝেই শহরময় তৈরি হচ্ছে শত শত বহুতল ভবন, লাক্সারি ফ্ল্যাট। স্থাপিত হচ্ছে বেশুমার সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, কিন্ডারগার্টেন, কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ছাপাখানা, কারখানা, দাহ্য পদার্থসহ মালামালের গুদাম— কত কি! রাস্তাঘাটে আবর্জনার স্তূপ, বর্জ্য কোথায় ফেলা হবে তার কোনো দিশা নেই। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে এত বর্জ্য সরানো ও নিষ্কাশনের কোনো পরিকল্পনা নেই। নদী-নালা-লেক দখল হয়ে যাচ্ছে। দখল হয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ। অসহনীয় হয়ে উঠেছে নাগরিক জীবন। আজকাল ঢাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে যেটা বিশেষভাবে সর্বত্র আলোচিত তা হলো যানজট। শহরের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার বিষয়টি একটা বিভীষিকাময় ব্যাপার হয়ে উঠেছে। পথ অল্প হলেও সেটুকু যে হেঁটে যাবেন, তাতেও বিড়ম্বনার শেষ নেই। অধিকাংশ অলি-গলি-রাস্তায় কোনো ফুটপাত নেই। থাকলেও তার বড় অংশ হকারদের দখলে। পকেটমার, হাইজ্যাকার যেকোনো সময় ছিনিয়ে নিতে পারে মানিব্যাগ, হ্যান্ডব্যাগ, মোবাইল, ঘড়ি। খোলা ম্যানহোলে পড়ে যেতে হতে পারে হাসপাতালে। আর কিছুটা দূরে যেতে হলে ভরসা হলো রিকশা, সেই রিকশা পেতে গলদঘর্ম হতে হয়। রিকশা চলাচলও করতে দেয়া হয় না অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায়। দূরের যাত্রার অধিকাংশের ভরসা হলো বাস। কিন্তু সরকারি বাস সার্ভিস দুর্বল, বাসের সংখ্যাও কম। প্রাইভেট বাসও অপ্রতুল। পুরোনো ভাঙাচোরা এসব বাস চলে বেপরোয়াভাবে। থামে যেখানে-সেখানে, পরস্পরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্যাসেঞ্জার ওঠায়। আইন-কানুনের কোনো ধার ধারে না এরা। একটাই তাদের কাজ, মালিকের মুনাফা কতটা বাড়ানো যায়। বাদুড়-ঝোলা অবস্থায় উঠতে হয় বাসে। আর এর বাইরে, যাদের নিজস্ব গাড়ি আছে সেটাই তাদের বাহন। আবার সমস্যা হলো, গাড়ি চালিয়ে কোথাও গেলে সেখানে গাড়ি পার্ক করার আলাদা জায়গা কোথায়? তাই রাস্তায় জায়গা আটকিয়ে গাড়ি রাখা ছাড়া উপায় থাকে না। ঢাকা মহানগরের মোট বিস্তৃতির তুলনায় রাস্তার সংখ্যা অতি নগণ্য। বিশ্বের যেকোনো আধুনিক শহরে যানবাহন চলাচলের জন্য ২৫% এলাকা রাস্তা হিসাবে রাখাটাই নিয়ম। ঢাকায় এর পরিমাণ তার এক-তৃতীয়াংশের কম, ৭%-এর মতো। এটুকুর মাঝেও আবার রাস্তার অনেকটা জুড়েই থাকে পার্ক করা গাড়ি, থাকে নির্মাণ সামগ্রী, কিংবা অন্যান্য কোনো কারণে হয়ে থাকে অব্যবহারযোগ্য। ফলে চলাচলযোগ্য রাস্তার এই পরিমাণ হয়ে ওঠে আরো কম— আসলে মাত্র ৬%-এর মতো। গাড়ি-রিকশা চলাচলের জন্য একটি শহরের যেখানে ২৫% এলাকা থাকা উচিত সেখানে ঢাকায় এর প্রকৃত পরিমাণ মাত্র ৬%-এর মতো। ট্র্যাফিক জ্যাম হবে না কেন? ঢাকা মহানগরের রাস্তার পরিমাণ সামান্যই বাড়ছে, কিন্তু গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে সেই তুলনায় হু হু করে। ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ১৮০টি নতুন প্রাইভেট গাড়ি রাজপথে নামে। অর্থাত্ বছরে আনুমানিক ৬৫ হাজারেরও বেশি গাড়ি নতুন করে ট্র্যাফিক ফ্লোতে যোগ দিচ্ছে। পুরোনো গাড়ি হিসেবে যেসব গাড়ি রাস্তা থেকে উঠে যায় তার সংখ্যা সেই তুলনায় অনেক কম। এভাবেই যদি চলতে থাকে তাহলে সংখ্যায় ক্রমাগত বাড়তে থাকা এসব গাড়ি চলবেই বা কোথায়, সেগুলো রাখাই বা হবে কোথায়। অবশেষে শুরু করা হয়েছে রিকশামুক্ত রাস্তা প্রতিষ্ঠার অধ্যায়। বলা হলো যে, রিকশাই সব নষ্টের গোড়া, বড় বড় রাস্তায় রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করলেই যানজট নিরসন হবে। প্রধান প্রধান রাস্তাকে রিকশামুক্ত করা হলো। কিন্তু যানজট তাতে কমলো না বরং বাড়লো। অনেক খরচ করে ফ্লাইওভার করা হলো। তাতেও কাজ হচ্ছে না। এখন বলা হচ্ছে পাতাল রেলের কথা। বলা হচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কথা, মেট্রো রেলের কথা। হাজার হাজার কোটি টাকায় এসব নির্মাণের কথা বলা হচ্ছে অনেকদিন থেকেই। কিন্তু তাতে যানজট নিরসন সম্ভব হবে কি? রাস্তার জন্য যেখানে প্রয়োজন ২৫% জায়গা সেখানে আছে মাত্র ৬%-৭%। ঢাকার তামাম অলি-গলিসহ সবগুলো রাস্তার উপরে দোতলা রাস্তা নির্মাণ করা সম্ভব হলেও রাস্তার মোট আয়তন ১৫%-১৬%-এর বেশি হবে না। এসব দিয়ে যানজট দূর হবে কি? নাকি যানজট দূর করতে গিয়ে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হবে? নানাদিক দিয়ে অচল হয়ে পড়া ঢাকা আরো অচল হয়ে পড়বে? অচল ঢাকার আসল জট হলো তার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, তার ‘জন-জট’। ‘জন-জট’ থেকেই যানজটসহ অসহনীয় সব সমস্যার উত্পত্তি। আমাদের ছোটবেলায় (পঞ্চাশ-ষাটের দশকে) ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১০/১৫ লাখ। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৬৪ লাখ। মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ১০/১৫ গুণ। কিন্তু শহরের আয়তন বেড়েছে মাত্র ২/৩ কিংবা খুব বেশি হলে ৪ গুণ। অর্থাত্ বসবাসকারীর ঘনত্ব বেড়েছে ৩/৪ গুণ। এতো মানুষকে ধারণ করার ক্ষমতা ঢাকা মহানগরের নেই। ফলে বিদ্যুত্, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, যান চলাচল, পরিবেশ দূষণ ইত্যাদি সব সমস্যারই পাহাড় জমেছে। ঢাকা হয়ে পড়েছে বসবাসের অনুপযুক্ত, অচল। অচল ঢাকাকে সচল করতে হলে ‘জন-জটের’ সমস্যার গোড়ায় যেতে হবে। সমস্যার এই গোড়ার জায়গাটি মোটেই কোনো টেকনিক্যাল বিষয় নয় যা কিনা নিছক প্রযুক্তি, দক্ষতা, উন্নত ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি দিয়ে নিরসন করা যেতে পারে। এই সমস্যার মৌল উপাদান ও চরিত্র হলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক। রাষ্ট্রের বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় হাত দিতে না পারলে ঢাকার ‘জন-জট’ সমস্যার নিরসন হবে না, অচল ঢাকাও সচল হবে না। পঞ্চাশের দশকের তুলনায় সারা দেশে জনসংখ্যা বেড়েছে ৩ গুণ। অথচ ঢাকা নগরবাসীর সংখ্যা বেড়েছে ১০/১৫ গুণ। অর্থাত্ দেশের অন্যান্য স্থান থেকে (বিশেষত গ্রাম থেকে) ঢাকা শহরে উঠে এসেছে বিপুল সংখ্যক মানুষ। এক হিসেব থেকে দেখা গেছে যে, এখন প্রতিদিন ঢাকার জনসংখ্যা ১ হাজার ৪১৮ জন করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাত্ বছরে যুক্ত হচ্ছে ৫ লাখ ১৭ হাজার ৫শ’ মানুষ। গ্রাম ছেড়ে বিপুল সংখ্যায় মানুষের এই শহর অভিমুখী (প্রধানত রাজধানী ঢাকা অভিমুখী) মাইগ্রেশন এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের বাস্তবতাই ঢাকা অচল হয়ে পড়ার আসল উত্স। মানুষের নগর অভিমুখীন মাইগ্রেশনের প্রবণতার পেছনে প্রধান দু’টি কারণ রয়েছে। প্রথমটি হলো গ্রামীণ ও কৃষি অর্থনীতির ক্রমাগত স্থবিরতা ও অবক্ষয়। গ্রামাঞ্চলে চলছে স্থায়ী নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া। কৃষকের লোকসান বাড়ছে। কিছু কিনতে গেলে যে দাম তাকে দিতে হয়, বেচতে গেলে তার তুলনামূলক দাম সে পায় না। এই অনুপাত প্রতিনিয়ত আরো কমছে। বাজারে লেনদেনের শর্ত (terms of trade) ক্রমাগতই তার প্রতিকূলে যাচ্ছে। আগে এক বস্তা সার কিংবা এক জোড়া করে শাড়ি ও লুঙ্গি কিনতে যে পরিমাণ ফসল বিক্রি করতে হতো, এখন বাজারে সেই একই পরিমাণ ফসল বিক্রি করে সে মাত্র আধা বস্তা সার অথবা একটিমাত্র শাড়ি অথবা লুঙ্গি কিনতে পারে। পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির কলা-কৌশলে এভাবেই কৃষি থেকে উদ্বৃত্ত পাচার হয়ে প্রধানত শহরবাসী মুষ্টিমেয় বিত্তবান ও তাদের সহযোগী মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে জমা হচ্ছে। মাঝারি কৃষক জমি হারিয়ে গরিব হচ্ছে। গরিব কৃষক হয়ে পড়ছে ভূমিহীন ক্ষেতমজুর। সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল রেখে ক্ষেতমজুরদের জন্য গ্রামাঞ্চলে কাজের সুযোগ বাড়ছে না। এভাবে গ্রামাঞ্চলে দুঃস্থ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। গ্রামের এসব মানুষ উপযুক্ত আয়-উপার্জন ও কাজের সন্ধানে শহরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। গ্রামের তুলনায় শহরে সুযোগ-সুবিধা বেশি হওয়ার কারণেও তারা শহরমুখী হচ্ছে। বাড়ছে মানুষের নগর অভিমুখীনতা (urbanization)। নগর অভিমুখীনতার অপর কারণটি হলো রাজনৈতিক-সামাজিক। ঢাকা নগর হলো দেশের রাজধানী। প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা এই ঢাকাতেই প্রধানত কেন্দ্রীভূত। ব্যবসা-বাণিজ্য-অর্থনীতি-রাজনীতি-সংস্কৃতি— সবকিছু রাজধানীকেন্দ্রিক। প্রশাসন, রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনীয় বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়নি। বরঞ্চ সরকার হাঁটছে উল্টোপথে। উপজেলাসহ স্থানীয় সরকারের অধিকতর ক্ষমতায়নের বদলে কর্তৃত্ব কুক্ষিগত করা হয়েছে এমপিদের ও আমলাতন্ত্রের উপর। আধুনিক প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাগুলোও ঢাকাকেন্দ্রিক থেকে যাচ্ছে। ঢাকায় থাকতে পারাটা প্রায় সকলের কাছে একটা বিশেষ সুযোগ হিসাবে বিবেচিত হয়ে ‘ঢাকা-মোহে’ তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। খেটে খাওয়া মানুষের জন্যও ঢাকা হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার উপায় খুঁজে নেয়ার সবচেয়ে মোহাবিষ্ট স্থান। একই সাথে ঢাকা হয়ে উঠেছে অপরাধী তত্পরতার উর্বর লীলাভূমি। দেশের যাবতীয় ‘লুটপাটের’ হেডকোয়ার্টার হওয়ায়, সেই লুটপাটের কারবারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ঢাকা কেন্দ্রীয় ‘ক্রিমিনাল নেটওয়ার্ক’। গড়ে উঠেছে ফটকা কারবারের বিস্তৃত শাখা-প্রশাখা। তার উপচেপড়া উচ্ছিষ্ট ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকার মাটিতে, ভাসছে ঢাকার বাতাসে। যেসবের গন্ধে ঢাকার দিকে ছুটে আসছে একশ্রেণির মানুষ। মফস্বলে লুটপাটের সীমিত সুযোগের সবটুকু চেটেপুটে শেষ করার পর ঢাকার দিকে ধাবিত হচ্ছে ক্রিমিনালদের দল। অন্ধকারের শক্তি গ্রাস করছে ঢাকাকে। আন্তর্জাতিক ক্রাইম-সিন্ডিকেটের শক্তিও ঢাকাকে কেন্দ্র করে জমিয়ে তুলেছে তাদের নানা অবৈধ তত্পরতার আসর। ঢাকা হয়ে উঠছে এক ‘জন-অরণ্য’। একথা অবশ্য ঠিক যে, অরণ্যেরও একটা সৌন্দর্য থাকে। কিন্তু ঢাকা হয়ে উঠেছে কুিসত ও বিভীষিকাময়। বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে ঢাকা। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন