দর্শন

‘ওকামের ক্ষুর’ ও আমাদের ক্ষুন্নিবৃত্তি

আপডেট : ০৮ জুন ২০১৪, ২১:১৯
প্রয়োজন কথাটা আপেক্ষিক। প্রাত্যহিক জীবনে আমাদের প্রয়োজনের কোন সীমা থাকে না। কিন্তু জীবনের একান্ত প্রয়োজনের মাত্রা আমরা ইচ্ছা করলে সীমিত করতে পারি, যদি আমরা আমাদের ক্ষুন্নিবৃত্তি (appetite)-কে অর্থাত্ আমাদের কামনা-বাসনা তথা ভোগলিপ্সাকে যৌক্তিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। এই নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের বৌদ্ধিক চেতনা ও নৈতিকতার দ্বারা ক্ষুরধার যুক্তির মাধ্যমে অযাচিত প্রয়োজন ও মাত্রাতিরিক্ত কামনা-বাসনাকে কর্তন করা দরকার। আর এই কর্তনের একটি মূল সূত্র নির্ধারণ করেছিলেন ত্রয়োদশ শতাব্দিতে আবির্ভূত একজন ইংরেজ দার্শনিক উইলিয়াম অব ওকাম। তিনি একটি পদ্ধতিতত্ত্ব প্রদান করেছিলেন যা তাঁর নামানুসারে ‘ওকামের খুর’ (Occam’s razor) বলে পরিচিত। ওকামের ক্ষুর হচ্ছে একটি বিশেষ পদ্ধতিতত্ত্ব যা দর্শন, বিজ্ঞানসহ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় প্রয়োগযোগ্য। এই পদ্ধতি হচ্ছে একটি মিতচার নীতি বা অপ্রয়োজনীয় বিষয় কর্তন নীতি। কোন বিষয়কে ব্যাখ্যা করার জন্য প্রয়োজনের বেশি স্বীকৃত ধারণা বা নির্ধারক সত্তা গ্রহণ করতে নেই। একে নিম্নোক্ত সূত্রে প্রকাশ করা হয়। “Entities should not be multiplied beyond necessity”— এই সূত্রটি ওকামের মৌলিক কোন সূত্র নয়। স্কলাস্টিক দার্শনিকদের মধ্যে অনেকেই এই সূত্রের ব্যবহার করেছেন। তবে ওকামের মাধ্যমে এর ব্যবহার একটি চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছায়। ক্ষুর হচ্ছে এমন একটি ধারালো অস্ত্র যা দিয়ে অতি সূক্ষ্মভাবে কোন কিছু কর্তন করা যায়। ওকাম এমন একটি গবেষণা পদ্ধতি বা জ্ঞানচর্চার পদ্ধতি অনুমোদন করেন যাতে সুনির্দিষ্ট বিষয়কে চর্চার ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক অনেক বিষয় বা বাড়তি অনেকে বিষয় কর্তন করে পর্যাপ্ত যুক্তি প্রমাণ সংরক্ষণ করা যায়। ওকাম এই পদ্ধতির পক্ষে ওকালতি করতে গিয়ে দেখান যে, প্রায়োগিকভাবেও এই পদ্ধতি উন্নত। কেননা এটা একটি কার্যকর পদ্ধতি যা জ্ঞানচর্চাকে সহজতর করে। এটি আমাদের চিন্তার ও শ্রমের অপব্যয় থেকে মুক্ত রাখে। এজন্য ওকামের এই পদ্ধতিকে চিন্তার মিতব্যয়িতার নীতিও বলা হয়ে থাকে। ওকামের মতে, কোন বিষয়ের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কেবল অপ্রয়োজনীয় বিষয় বাদ দিলেই চলবে না, ব্যাখ্যার ভাষা এবং পদ্ধতিও যথাসম্ভব সহজতর হতে হবে। বিংশ শতাব্দির পূর্বে ওকামের পদ্ধতি একটি আধিবিদ্যক নীতি হিসেবেই ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলো। তখন মনে করা হতো যে, প্রকৃতির মতো সরলতা অর্জন হচ্ছে এই পদ্ধতির মূল নীতি। প্রকৃতি (nature) সহজ-সরল। প্রকৃতিতে কোন জটিলতা নেই। তাই প্রকৃতি সম্পর্কিত যে কোন গবেষণাও সহজ-সরল হওয়া দরকার। সমকালীন যুগে ওকামের ক্ষুর পদ্ধতি একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতি বা পদ্ধতিতত্ত্ব হিসেবেই অধিক পরিচিত ও ব্যবহূত হয়। ‘ওকামের ক্ষুর’ নীতিটি দ্বারা পরবর্তী চিন্তাবিদদের অনেকেই প্রভাবিত হয়েছেন। কেউ কেউ তাঁর এই নীতি বা সূত্রকে একটু অন্যরকমভাবে উপস্থাপন করতে সচেষ্ট হয়েছেন। যেমন: লিওনার্দো দ্যা ভিনিচ সূত্রটি এভাবে প্রকাশ করেন: “কোন বিষয়ের সহজ-সরল ব্যাখ্যাই হচ্ছে তার বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যা।” বার্ট্রার্ন্ড রাসেল তাঁর Logical Atomism গ্রন্থে ওকামের সূত্রটিকে এভাবে তুলে ধরেছেন:“যেখানে সম্ভব অজানা বস্তু বা বিষয়ের স্থানে জানা সত্তা সম্বলিত সংগঠন বসান।” ‘ওকামের ক্ষুর’ পদ্ধতিতাত্ত্বিক তথা একাডেমিক গবেষণার ক্ষেত্রে অনেকে অনেকভাবে ব্যবহার করেছেন, কিংবা ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে ওকাম নিজে যতটা না তাত্ত্বিক বা একাডেমিক ক্ষেত্রে তাঁর এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, তার চাইতে এই পদ্ধতিকে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে বেশি ব্যবহার করেছিলেন। এই পদ্ধতির মাধ্যমে তিনি কামনা-বাসনা, লোভ-লালসা কর্তন করে জীবন-যাপনের প্রয়োজনকে সীমিত করে আনেন। তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন-যাপনের পথ বেছে নেন। তিনি দেখাতে চেষ্টা করেন যে, জীবনের প্রয়োজনের মাত্রা বাড়ালে জীবনে অযথা জটিলতা বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে নৈতিক চেতনা ও যুক্তির দ্বারা অপ্রয়োজনীয় বা মাত্রাতিরিক্ত কামনা-বাসনা তথা ক্ষুন্নিবৃত্তি কর্তন করতে পারলেই পার্থিব জীবনকে সুখময় করা যেতে পারে। লেখক:দর্শনের শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চেয়ারম্যান, অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রাকটিক্যাল এথিক্স [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন