আমরা বেসরকারি ঠিকই, কিন্তু বেদরকারি কি শিক্ষক সমাজে? সংখ্যার আধিক্যে আমরাই তো শিখরে আছি, শিক্ষার্থীদের আনুপাতিক হারও আমাদেরই বেশি,তবে কেন এই বিমাতা-সুলভ আচরণ কেবলমাত্র আমাদের সাথেই করা হয় বারংবার? সখের বশে ক’জনেই আজ চাকরি করে,পেটের দায়ই তো বড় দায়,মাস গেলে যে কটা টাকা বেতন হিসেবে পাওয়া যায় তাই দিয়েই তো সংসারের খরচ চালাতে হয়, ছেলেমেয়ে লালন-পালন, লেখাপড়া, এসবই তো খরচের খতিয়ান। নিজেদের সাধ-আহলাদ তো কবেই জলাঞ্জলি দিয়েছি। কিন্তু মাসের অর্ধেক হয়ে গেলেও যদি বেতন না পাওয়া যায়, তবে আমাদের মত বেসরকারি শিক্ষদের কি কি দৈন্য-দশা ঘটতে থাকে, তার কি কোন ধারণা আছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের?
ব্যাংকগুলো দিন দিন সুবিধার উপর সুবিধাদি পেয়ে ভরপুর হয়ে উঠছে। সরকারি চাকুরেরাও বেতন-বোনাস-মহার্ঘ্য ভাতায় ফুরফুর করছে,আবার উপরিও আছে কারও কারও। এমনকি প্রাইমারির প্রধান শিক্ষক পর্যন্ত গেজেটেড হয়ে গেলেন,আর আমরা যে তিমিরে ছিলাম, সে তিমিরেই রয়ে গেলাম। কেন হেন দুর্দশা শুধু আমাদেরই হচ্ছে? আমরা মাসের ২০ তারিখের আগে বেতন পাচ্ছি না, আমাদের পদোন্নতি হচ্ছে না অনুপাতের গ্যাঁড়াকলে, আমাদের অবসরের টাকা পেতে ২/৩ বছর লেগে যাচ্ছে, অনেক দুর্ভাগা হয়তো টাকা না পেয়েই ধরাধাম ত্যাগ করে। এগুলোর কোনটি কি শিক্ষাবান্ধব কর্মসূচি না শিক্ষক-বান্ধব? আর এ দণ্ডের জন্য আমরাই বা কেন নির্বাচিত হলাম?
যদি কেউ বেসরকারি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের মান-মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলে,কটাক্ষপাত করে, সে দায় কি আমাদের উপরই বর্তায়? শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক রাহু-যুক্ত করেছে কারা? যে দুষ্টচক্রে শিক্ষা জগতে বেশ কিছু অনিয়ম ঢুকে পড়েছে এবং সেই সাথে শিক্ষার গুণগত মান ক্ষুণ্ন হয়েছে, এখনও হচ্ছে।আমরা জানি সে কথা, মানিও, কিন্তু এতে আমাদের শিক্ষক মহলের কি করার বা বলার আছে? আর বললেই বা শুনছে কে? আমরা শিক্ষক সমাজ বহু আগে থেকেই বলে আসছি,বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন করা হোক, এজন্য পৃথক পিএসসি গঠন করা হোক, এরকম কিছু একটা করা হবে বলেও শুনেছিলাম,কিন্তু আজ পর্যন্ত তার কোন আলামত দেখিনি।
ফলে চোরাগলি ও কানাগলি পথে অশিক্ষক ঢুকে পড়েছে শিক্ষক মহলে, নৈতিকতার স্খলন ঘটছে, শিক্ষা-কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, প্রকৃত শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে, কিন্তু এ দায় তো আমাদের একার নয়। তবে কোন্ অপরাধে আমাদের সাথে এহেন বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে? আজ আমার ঘরে টাকা নেই, অথচ বিস্তর দায়িত্ব সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু কোথায় টাকা পাব? মাসের শেষে শ্রমের মূল্য তো আমি পাব না, পাব পরের মাসও ফুরিয়ে যাবে যাবে যখন তখন্। তাহলে আমি কি করে চলব? চুরি করব? ডাকাতি করব? সেকাজও তো আমার দ্বারা হবে না।
অতএব পথ একটাই খোলা আছে সামনে, আর তা হলো অন্যের কাছে হাত পাতা,তবে ভিক্ষুকের মত নয়, মোটা সুদে টাকা আনা। অর্থাত্ হাতে যখন বেতনের টাকাটা আসবে, তার বড় একটা অংশই চলে যাবে মহজনদের কাছে। যাদের অঢেল আছে। আর আমরা বেসরকারি শিক্ষকেরা এভাবেই ধুঁকে ধুঁকে জীবন কাটাব।
লেখক :প্রভাষক,প্রাণিবিদ্যা বিভাগ
বাউফল কলেজ, বাউফল, পটুযাখালী
[email protected]
