বাজেট: ২০১৪-১৫, সরকারের সক্ষমতা ও দক্ষতার চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ১০ জুন ২০১৪, ২১:৫২
দেশের ৪৩ তম জাতীয় বাজেট সংসদে পেশ করা হয়েছে গত ৫ই জুন বৃহস্পতিবার। পেশ করেছেন আওয়ামী লীগের বর্ষিয়ান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। আমাদের অর্থনৈতিক বর্ষকাল শুরু হয় পহেলা জুলাই এবং শেষ হয় ৩০শে জুন। অনেকে বলছেন, আমাদের বর্ষকাল নতুন করে শুরু করার সময় এসেছে। হয় জানুয়ারি থেকে হিসেব অথবা পহেলা বৈশাখ থেকে ৩০শে জ্যৈষ্ঠ। বর্ষকাল শুরু ও শেষ নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার। কারণ এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ রয়ে গেছে। গত প্রায় চার দশকের ধারাবাহিকতায় জুন মাসের প্রথম অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে বাজেট পেশ করা হয় সংসদে। গত ৪৩ বছরের সকল বাজেটগুলোর সবই জুন মাসের প্রথম ধাপে পেশ অথবা ঘোষণা এবং জুনের শেষ দিন পর্যন্ত আলোচনার সুযোগ রেখে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বাজেট প্রক্রিয়ায় বা পরামর্শকে আমলে নিয়ে সম্ভাব্য পরিবর্তন ও পরিবর্ধন শেষে বাজেট পাস করা হয়। পাসকৃত বাজেটের কার্যক্রম ও বাস্তবায়ন শুরু হয় পহেলা জুলাই থেকে। তবে যে পরিবর্তন আসে বা আনা হয় তা মূল বাজেট প্রস্তাব থেকে খুবই স্বল্প আকারে হয়। আর পরিবর্তনগুলো মূলত রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হয়। বাজেট নিয়ে আমরা নানা কথা বলছি। বিশেষ করে গত এক দশকে রেডিও, টেলিভিশন ও পত্রিকা ঢাকঢোল পিটিয়ে সাড়ম্বরে প্রকাশিত ও প্রচারিত হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষ বাজেট ও বাজেটের প্রতিক্রিয়া নিয়ে হতচকিত হয়ে পড়ছে। এর ফলে অনেকে মনে করেন, বাজেট নিয়ে অতি প্রচারণা ও অতি কথনের ফলে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাজেটের সঠিক মূল্যায়ন ও তাত্পর্য হয়ত হারাতে বসেছে। রাজনীতিবিদরাও অনেক সময় কি বলতে কি বলছেন তার সঠিক রেশ যেমন ধরে রাখা যাচ্ছে না, তেমনি সাধারণ ভোক্তাও বাজেট কর্মসূচিতে নিজেকে সম্ভবত সম্পৃক্ত করতে পারছেন না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে বুজুরকীর অভিযোগ যত তুলে ধরা হচ্ছে, অন্যকোন বিষয় ও শাস্ত্রের বিরুদ্ধে ততো অভিযোগ উঠছে না। অপরদিকে বাজেট নিয়ে রাজনীতিবিদ ও আমাদের দেশের আমলাতন্ত্রের মধ্যেও অনেক মতপার্থক্য দেখা যায়। ফলে অনেক অর্থনৈতিক কর্মসূচির প্রণয়নের সাথে জড়িত হয়েও অনেক আমলা সে কর্মসূচির দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করতে নারাজ। যদিও আমলা ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে এ ধরনের টানা-পড়েন বহুদিনের। বিশেষ করে আমলাতন্ত্রে দলীয় করণের প্রভাবে সমস্যা পূর্বাপেক্ষা জটিল হয়ে পড়ছে। এ নিয়ে একটি গল্প আছে, এক বৃটিশ আমলা তারই তৈরি অর্থনৈতিক কর্মসূচির সাথে তার মন্ত্রীর চিন্তা চেতনায় একমত পোষণ না করে ঘোষিত কর্মসূচি প্রশ্নে মন্ত্রীর নির্দেশিত দায়িত্ব পালন করেছিলেন স্বকীয় কায়দায়। গল্পে আছে মন্ত্রী তার সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাকে বললেন, বাজেটের আলোচিত সমস্যা ও এর সমাধান নিয়ে জনগণ খুশি হয় এমন একটি বক্তৃতা লিখে দিতে। সেই আমলা মন্ত্রী মহোদয়ের বক্তৃতাটি লিখে দিলেন এইভাবে :‘বাজেটে মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দা এবং রাজস্ব ঘাটতি— আজকের সবচেয়ে বড় সমস্যা। কিন্তু এ সমস্যা শুধুমাত্র উল্লেখ করাই যথেষ্ট নয়। আমি এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো আপনাদের সামনে শুধুমাত্র তুলে ধরাই যথেষ্ট বলে মনে করি না। এ সমস্যাগুলোর ব্যাপারে আমাদের করণীয় কি? তা ভাবতে হবে, এখানেই লিখিত বক্তব্যের পৃষ্ঠা শেষ। পাতা উল্টে মন্ত্রী দেখেন, লেখা রয়েছে, এবার আপনার নিজের চিন্তা-ভাবনা দিয়ে বক্তৃতা শেষ করুন’। আমাদের দেশে মন্ত্রী মহোদয়রা কিভাবে এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করেন তাই পাঠকের অজানা কিছু নেই। গল্পের এখানে সমাপ্তি টেনে আমি এই প্রতিবেদনে নতুন বছরের ২০১৪-১৫ প্রস্তাবিত বাজেটের বাস্তবায়নের দিক নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। (১) বাজেট উচ্চাভিলাষী : এই নিয়ে সমালোচকরা বলছেন আগামী অর্থ বছরের জন্য ২ লক্ষ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ একটি উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক কর্মসূচি যা সরকারের বাস্তবায়নের ক্ষমতা নেই। কারণ হিসেবে সমালোচকরা বলছেন, দেশের বর্তমানে অর্থনৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে এবং এতো বড় বাজেট বাস্তবায়নে সরকারি প্রশাসন যন্ত্রের সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি। অর্থমন্ত্রী এ, এম, এ মুহিত বলছেন : ‘হ্যাঁ বাজেট উচ্চাভিলাষী ঠিকই, তবে আমরা বিগতদিনের অভিজ্ঞতার আলোকেই এই বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষমতা অর্জন করেছি’। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে ঘোষিত কোন বাজেটই শতভাগ বাস্তবায়িত হয়নি এবং পৃথিবীর প্রায় সকল স্বল্পোন্নত দেশের বাজেট বাস্তবায়নের চিত্র প্রায় একই রকম। উন্নত দেশগুলোতে বাজেট প্রণয়ন কালে খাতওয়ারী বরাদ্দের আগে ঐ খাতের সক্ষমতার সঠিক অবস্থান এবং বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক চাহিদা এবং বিগত কয়েক বছরে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট খাতে বাজেট বরাদ্দের সফলতা ও ব্যর্থতার নিরিখে নতুন বছরের জন্য বাজেট বরাদ্দ নির্ধারিত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য আমাদের দেশে বাজেট প্রণয়নকালে সংশ্লিষ্ট খাতের সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা এবং বিগত দিনের এই মন্ত্রণালয়ের খাতওয়ারী বরাদ্দে সফলতা ও ব্যর্থতার সঠিক গবেষণা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ আদৌ হয় না বলেই আমরা জানি। আমাদের এখানে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি মূলত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব ও তদবিরে প্রকল্প গ্রহণ ও অর্থ বরাদ্দ হয়ে থাকে। তবে গৃহীত প্রকল্প অর্থনৈতিক কর্মসূচির অগ্রাধিকারের মধ্যেই রাখা হয়। এবং গৃহীত প্রকল্পের বাস্তবায়নের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতার সঠিক বিশ্লেষণ বা যাচাই করা হয় না বলেই জনমনে প্রণীত বাজেট অধীন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সন্দেহ থেকেই যায়। গত কয়েক বছর ধরে উন্নয়ন কর্মসূচিতে (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) প্রাথমিক বরাদ্দ ঘোষিত হলেও বছরের মাঝে বা শেষে বরাদ্দের ক্ষেত্রে কাটছাঁট এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি বাজেট কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্ষমতা জনমনে তাদের সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে বলে মনে হয়। আবার অনেকে মনে করেন, বাজেটে লক্ষ্যমাত্রায় উচ্চাভিলাষী হওয়া মন্দ নয়, কারণ লক্ষ্যমাত্রা বেশি ধরা থাকলে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা চাপের মধ্যে থাকে। অনেকে আবার একথাও বলেন যে, আমাদের দেশে বেশি প্রকল্পই সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই, মূল্যায়ন এবং কাঙ্ক্ষিত ভাবে অর্থ বরাদ্দ করা হয় না বলেই বেশি প্রকল্পই সুুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন হয় না। ফলে ১০০ টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩০০ টাকা লাগে। একই সাথে অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করা যায় না। প্রতি বছরের ন্যায় আমাদের দেশে বাজেট ঘোষণার পর পরই যে সকল বিষয়গুলো আলোচিত হয় এবারও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। সংসদে পেশকৃত বাজেটের সব চেয়ে আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে : (ক) ঘোষিত বাজেটের কারণে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে কিনা? (খ) বাজেটে নতুন বিনিয়োগ বাড়াতে বেসরকারিখাত কতটুকু উত্সাহিত হবে। (গ) বাজেট নয়া কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কতটুকু সহায়ক হবে। (ঘ) বাজেট দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে কতটুকু অবদান রাখতে পারবে? (ঙ) অবকাঠামো খাতে বাজেটের বরাদ্দ কতটুকু যুক্তিযুক্ত এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সাথে অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার মিল আছে কিনা? (চ) শেয়ার বাজার চাঙ্গা হবে ,না আবার নেতিয়ে পড়বে? (ছ) কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে কৃষিখাতের অগ্রাধিকার কতটুকু পেয়েছে? (জ) কর প্রদানের ক্ষেত্রে নতুন করে কোন বাড়তি অর্থ বা ঝামেলা পোহাতে হবে কিনা? (ঝ) বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার ব্যাঙ্কিং খাত থেকে অধিক ঋণ নিলে, বেসরকারি খাতে উদ্যোক্তরা তাদের কাঙ্ক্ষিত ব্যাঙ্ক ঋণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে কিনা? আমার এই প্রতিবেদনে উপরের সব বিষয় নিয়ে আলোচনা সম্ভব নয়। এই প্রতিবেদনে আমি বাজেটের সব চাইতে আলোচ্য ও স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কথা বলবো। আর বিষয়টি হলো: বাজেট এবং মূল্যস্ফীতি। বাকি বিষয়গুলো নিয়ে সুযোগ ও সুবিধে মত লেখার আশা রইল। বাজেট ও মূল্যস্ফীতি : বাজেট আর মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক দ্বিমুখী। অতীতের মূল্যস্ফীতি এবছরের বাজেট প্রস্তাবগুলোর তাত্পর্যকে প্রভাবিত করে, আবার এ বছরের বাজেট প্রভাবিত করবে ভবিষ্যতের মূল্যস্ফীতির হারকে। মূল্যস্ফীতির ঘাতঘোত নিয়ে আমরা অনেক কিছুই জানি না। আর এই বিতর্কিত বিষয় নিয়ে আমরা যে যেভাবে পারি নানা মন্তব্য করেই চলছি। তবে সতর্ক অনুমানের বাইরে আমাদের যাওয়া উচিত হবে না। প্রথমেই বলতে হয়, আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে যে কোন উন্নয়ন পরিকল্পনা জোরদার করলে মূল্যস্ফীতি হবেই। তাই এই উন্নয়ন পরিকল্পনা বিশেষ করে সরকারি খাতে অনুন্নয়ন খাতের ব্যয়, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ দিয়ে সমতা আনতে হবে এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধির হারের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের দৃঢ়পদক্ষেপ নিতে হবে। নয়া বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাঙ্ক ঋণের প্রসার মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করবে। বাজেটের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বর্ধিত বরাদ্দ মুদ্রাস্ফীতিকে সাহায্য করবে। এবং মুদ্রাস্ফীতির ফলে সরকারি কোষাগারে যে বর্ধিত অর্থ আসবে তা সরকারের রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রাকে পূরণে সাহায্য করবে। পেট্রোলিয়াম জাত পণ্যের মূল্যের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়বে। ফলে পণ্যের মূল্য বাড়বে। অপরদিকে এই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারলে সাধারণ ভোক্তা ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের জীবন বর্তমান অপেক্ষা দুর্বিষহ হবে। এই গোত্রের মানুষগুলো সরকারের অর্থনীতিমালার কারণে প্রবঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করবে। আর এই অভিঘাত রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রসারিত হতে পারে। কারণ বিশ্বের অনেক দেশেই লাগামহীন মূল্যস্ফীতি সে দেশের সরকারের জন্য বড় ধরনের শুধু চ্যালেঞ্জ নয় বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমাদের দেশে এ ধরনের সম্ভাবনা এ মুহূর্তে নেই, কারণ দেশে মূল্যস্ফীতি এখনও শতকরা ১০ ভাগের নিচে আছে। তবে বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রাখা উচিত। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান অপেক্ষা বেশি মূল্যস্ফীতি দেশের বৃহত্ জনগোষ্ঠী সাধারণ জীবন ব্যবস্থায় বিপর্যয় এনে দিতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি আমাদের সঞ্চয়কে আঘাত হানে, বেতন কাঠামো অনবরত সঙ্কুচিত হতে থাকে এবং বাড়ে আয় করের বোঝা। আর যিনি আয় করের আওতায় নেই তার পক্ষে কাটা হয় বর্ধিত পণ্যমূল্যে। তবে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, আয়কর, পরোক্ষ কর ও কর্পোরেট করের মধ্যে একটি সুষম ব্যবস্থা নিশ্চিত করে উপযুক্ত সংস্কারের দ্বারা রাজস্ব কার্যক্রমে যে প্রগতিশীলতা আনা যায় তা দেশের মুদ্রানীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বাজেট বর্তমান পদক্ষেপসমূহে বলা যায়, সারা বছরে আমাদের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির প্রবণতা শুধু বজায়ই থাকবে না,সম্ভবত আরও শক্তিশালী হতে পারে। লেখক: সাংবাদিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন