ফুটবল বিশ্বকাপ :উচ্ছ্বাস-উত্তেজনার মহা উত্সব

আপডেট : ১১ জুন ২০১৪, ২১:১২
এই গ্রহের সর্বাধিক জনপ্রিয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বিশ্বকাপ ফুটবল, শুরু হইতেছে আজ মধ্যরাতের পর। এমন একটি দেশে এই বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা শুরু হইতে যাইতেছে, যাহাদের হূদয়ের সহিত ফুটবল যেন একাত্মা হইয়া গাঁথিয়া রহিয়াছে যুগ-যুগ ধরিয়া। ফুটবল বিশ্বকাপই একমাত্র প্রতিযোগিতা যাহাতে আমাদের প্রত্যক্ষ কোনো অংশগ্রহণ না থাকিলেও জনপ্রিয়তার দিক হইতেও সকল বিচারেই ইহা আমাদের হূদয়ের গভীরে আসীন। কয়েক দশক পূর্বে টেলিভিশনে বিশ্বকাপ ফুটবল ‘লাইভ’ দেখাইবার পর হইতে এই জনপ্রিয়তা সর্বগ্রাসী হইয়া উঠিয়াছে। তবে এই ‘সর্বগ্রাস’ ইতিবাচক অর্থেই। বিশ্বকাপ চলাকালীন এই এক মাস অপরাধের ঘটনাও কমিয়া আসিবে, আমাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে প্রিয় দেশের খেলাসমূহ তুমুল উত্তেজনায় প্রাণবন্ত করিয়া তুলিবে নিশুতি রাতের স্তব্ধতা। আমাদের জীবনে আনন্দ-বিনোদনের উপাত্ত ও ঘটনা বা ইভেন্ট এত স্বল্প যে, বিশ্বকাপের মতো সর্বব্যাপী ইভেন্ট চার বত্সর পর পর আমাদের দুয়ারে যেন নবতর উচ্ছ্বাসে পল্লবিত হয়। অন্য সব খেলার মতোই ফুটবলও হিসাবের খেলা। এইখানেও বিপক্ষের খেলোয়াড়দের শক্তি অনুযায়ী রণপরিকল্পনা করিতে হয় । নিখুঁত গেম প্ল্যান ছাড়া ফুটবলেও জয় মিলে না সহজে। মাঠের বাইরে দলের কোচরা সাজাইবেন নিজেদের আক্রমণ ও রক্ষণ কৌশল। এই সব মিলিয়া প্রতিটি দলের সমর্থকদের মাঝে চলিবে তুমুল আলোচনার ঝড়। তবে আলোর অপর পিঠে অন্ধকারও লুকাইয়া থাকে। ব্রাজিল আর ফুটবল ভিন্ন শরীরে অভিন্ন আত্মা হইলেও এই দেশের মানুষই কিনা গত এক বত্সর ধরিয়া ফুঁসিয়া উঠিল ফুটবল বিশ্বকাপ লইয়া! চলতি বিশ্বকাপ ফুটবলের অবকাঠামো নির্মাণে স্বাগতিক দেশ ব্রাজিল ব্যয় করিতেছে প্রায় পনেরোশো কোটি ডলার। ইহাছাড়াও ২০১৬ সালের অলিম্পিকের প্রস্তুতি-খরচ রহিয়াছে। অথচ দেশবাসীর উন্নয়ন হইয়া উঠিয়াছে প্রহসন-তুল্য। মূল্যবৃদ্ধি লাগামছাড়া, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের হাল করুণ, দুর্নীতিও প্রশাসনের সব স্তরেই জাঁকিয়া বসিয়াছে। এই সকল বিষয়ে নাকি এক বিন্দুও মনোযোগ নাই প্রেসিডেন্ট ডিলমা রাউসেফের। তাহাতে যাহা হইবার তাহাই হইয়াছে, অর্থনীতি ও যাপিত জীবনের দুর্যোগ দুর্ভোগ হইতে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় প্রথম হইতেই পথে নামিয়াছে ব্রাজিলের জনগণ। অর্থনীতির দুরবস্থা এমনই এক বালাই, যাহা ফুটবল অন্ত:প্রাণ জাতিকেও ফুটবলের মায়াজালে আটকাইয়া রাখিতে পারে না। তবে বিশ্বকাপকে পুঁজি করিয়া মেট্রো ধর্মঘট, কিংবা অন্য অর্থনৈতিক অস্থিরতা—ব্রাজিলের অবস্থা যেমনই হউক, চার বত্সর পর পর বিশ্বকাপের সময় ঘনাইয়া আসিলে আমরা ফুটবল অন্ত:প্রাণ জাতিতে পরিণত হই। সেই উন্মাদনা এমন পর্যায়ে যে, বাংলাদেশের আকাশে উড়িতে থাকে সমর্থকদের প্রিয় দেশের বাহারি রঙের কেতন। এই পতাকার ওড়াওড়ি আইনবিরুদ্ধ নাকি—তাহা ভাবিয়া দেখিবার বোধটুকুও বিসর্জন দেওয়া হয় বিশ্বকাপের হুজুগে। আমাদের অংশগ্রহণ না-থাকুক, মানসিকভাবে আমরা যেন নিপাট আনন্দের উদ্বেলিত তরীতে উঠিয়া পড়ি এই একটি মাসে। দেশ নয়, জাতীয়তাবাদ নয়, ধর্ম-বর্ণ-জাতি নয়, কোনো অসাধারণ নৈপুণ্যপ্রদর্শনকারী বিশেষ খেলোয়াড়ের জন্য তাহার দেশটির সমর্থক বা ভক্ত হইয়া যায় একজন দর্শক। সাদা-কালো-তামাটে-হলদেটে—সব রং ছাপিয়ে শুধু পায়ের জাদুই এইখানে একমাত্র শর্ত হইয়া ওঠে ভালোবাসার, ভালো লাগার। স্বাভাবিক ভাবেই বিশ্বকাপ ফুটবল, আমাদের অলস সময়ের এক মহাউত্সব। সেই উত্সব সুন্দর হউক, সার্থক হউক, আমাদের জীবনেও এই একটি মাস ভেসে যাক নিপাট আনন্দে-উচ্ছ্বাসে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন