মেডিক্যাল বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ইহা সাধারণ বর্জ্যের চাইতে অধিক ক্ষতিকর। এই বর্জ্য উন্মুক্ত স্থান বা সাধারণ ডাস্টবিনে ফেলা যায় না। ইহার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য ’চিকিত্সা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা ২০০৮’ রহিয়াছে। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশ প্রদান সত্ত্বেও সেই বিধিমালা বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান প্রতিপালন করিতেছে না বলিয়া অভিযোগ পাওয়া যাইতেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নাই। নাই এই সংক্রান্ত আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। বর্তমানে রাজধানী ঢাকার হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলির আশেপাশে রাখা ঢাকা সিটি করপোরেশনের ডাস্টবিনগুলিতেই চিকিত্সা বর্জ্য ফেলা হইতেছে। অথচ চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, জীবাণুবাহী মেডিক্যাল বর্জ্য রাখার জন্য গুরুত্ব ও প্রকৃতি অনুযায়ী পৃথক পৃথক পাত্র ব্যবহার করা প্রয়োজন। কিন্তু সব বর্জ্য একই পাত্রে রাখায় তাহা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকির কারণ হইয়া উঠিতেছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল ও সচেতন হইতে হইবে।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের সূত্রমতে, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৫০ টন চিকিত্সা বর্জ্য উত্পন্ন হয়। ইহার মধ্যে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মাত্র চার টন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়াছে। অবশিষ্ট প্রায় ৪৬ টন বর্জ্য রাস্তায় উন্মুক্ত সাধারণ ডাস্টবিন, নালা, নর্দমা ও নদীতে গিয়া জমা হইতেছে। এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এসব বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এসব চিকিত্সাবর্জ্যের মধ্যে রহিয়াছে- ব্যবহূত সুচ, সিরিঞ্জ, রক্ত ও পুঁজযুক্ত তুলা, গজ, ব্যান্ডেজ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অংশবিশেষ, টিউমার, ঔষধের শিশি, রক্তের ব্যাগ, ঔষধ, রাসায়নিক দ্রব্য ইত্যাদি। এসব বর্জ্য যেখানে সেখানে ফেলা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু আমাদের দেশে এ ব্যাপারে কোন তোয়াক্কা করা হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব বর্জ্য গৃহস্থালি বর্জ্যের চাইতেও বেশি দূষণীয় ও ক্ষতিকর। বিশেষত সিরিঞ্জ ও স্যালাইনের ব্যাগ হেপাটাইটিস বি ও সিসহ বেশকিছু রোগের জীবাণু ছড়ায়। এ সংক্রান্ত তরল পদার্থ নর্দমায় ফেলিয়া রাখাও বাঞ্ছনীয় নহে। কেননা ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে টাইফয়েড ও আমাশয়ের মতো পানিবাহিত রোগের জীবাণু বহুদিন বাঁচিয়া থাকে। বর্জ্যের বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ হইতে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, চর্মরোগ এমনকি ক্যান্সার পর্যন্ত হইতে পারে। কোন কোন বর্জ্যের কারণে যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া এমনকি এইডসের ন্যায় মরণব্যাধিরও ঝুঁকি বাড়ে। তাই মেডিক্যাল বর্জ্যের ব্যাপারে অবহেলা প্রদর্শনের কোন অবকাশ নাই।
বাংলাদেশে বিভিন্ন শিল্প উদ্যোগে বর্জ্য শোধনাগার গড়িয়া তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হইতেছে। পরিবেশ রক্ষার জন্য ইটিপি স্থাপনকে বাধ্যতামূলক করা হইতেছে। অনুরূপভাবে বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিজেদের উত্পন্ন বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ ও ধ্বংসসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে ইহাই একান্ত কাম্য। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঢাকা শহরে সরকারি-বেসরকারি ও অনুমোদিত-অননুমোদিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় এক হাজার সাতশত। এসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থাকা আবশ্যক। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্বে রহিয়াছে। তবে এ ব্যাপারে বেসরকারি উদ্যোগও বাড়াইতে হইবে। একইভাবে শুধু রাজধানী ঢাকা শহরই নহে, অন্যান্য মহানগর ও শহরেও মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তুলিতে হইবে।
