আর মাত্র দু’দিন পর ব্রাজিলে শুরু হতে যাচ্ছে একুশতম ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা। সারা বিশ্বের ফুটবল অনুরাগীরা গভীর আগ্রহে চেয়ে আছে এই দিনটির দিকে। এদেশে আমরাও তার ব্যতিক্রম নই বরং প্রতিযোগিতায় আমাদের অংশগ্রহণ না থাকলেও ফুটবলের প্রতি গভীর ভালোবাসা আগামী এক মাস আমাদের অধিকাংশকে যে বুঁদ করে রাখবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিয়মানুসারে প্রতিটি খেলায় পক্ষ-বিপক্ষ থাকে, তাদের মাঝে প্রবল মানসিক প্রতিযোগিতা কাজ করে। তবে বিশ্বকাপ ফুটবলে তার প্রাবল্য অস্বীকার করার উপায় নেই; বলা যায় তা একাধারে তুলনাহীন ও আকাশছোঁয়া। কিন্তু এমন এক খেলার সর্বব্যাপী উত্তাপ সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার বাস্তবতা মেনে নিয়েও এবিষয়ে কিছু প্রশ্ন না তুলে পারা যায় না।
বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক হলেও বাস্তব সত্য যে, ইতোপূর্বেও আমরা দেখেছি এমন খেলায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন শক্তিশালী বিদেশি দলের এদেশীয় সমর্থকদের পছন্দের দলের জাতীয় পতাকা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র উত্তোলন করা হয় যা এগিয়ে যাওয়া খেলার মেজাজের সাথে তাল মিলিয়ে দীর্ঘকাল ধরে প্রায় সর্বত্র উড়তে থাকে। লক্ষণীয়, বিশ্বমানের ধ্রুপদী খেলাকে কেন্দ্র করে এমন নির্মল আনন্দউদ্বেল তত্পরতার এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা ইতোমধ্যে এখানে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। কিন্তু একটু সতর্ক হয়ে নিজেদের দিকে তাকালে এই আনন্দ বহিঃপ্রকাশের ধারাকে নির্দ্বিধায় মেনে নেয়া যায় না। লক্ষ্য করুন, জাতীয় পতাকা সাধারণ এক টুকরা কাপড় নয় তা সে যে দেশেরই হোক না কেন। বিশ্বসভায় তার একটি স্বতন্ত্র সত্তা, পরিচিতি ও মর্যাদা রয়েছে এবং সভ্য সমাজের রীতি অনুসারে ঐ দেশসহ অপর যেকোন দেশ বা তার নাগরিক কর্তৃক তা যথাযোগ্য সম্মানিত অবস্থানে ধারণ করা তাদের পারস্পরিক দায়িত্বের অংশ। আমাদের জাতীয় পতাকার মর্যাদা রক্ষা, যথাযথ ব্যবহার ও তার রক্ষণাবেক্ষণ যেমন এদেশের প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব তেমনি এদেশের মাটিতে বিদেশি যেকোন রাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও প্রদর্শনের কিছু সংবিধিবদ্ধ ও নৈতিক ভিত্তি রয়েছে যা লংঘন করে কোন ভিনদেশি জাতীয় পতাকা ব্যবহার বা প্রদর্শন করা দেশীয় আইন ও নীতিবিরুদ্ধ কাজ। জাতীয় পতাকা একটি দেশের মালিকানা ও নিজস্ব প্রতীক নির্দেশ করে। যেখানে তা প্রদর্শিত হয় বা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, তা ঐ দেশের ভৌগলিক ও কূটনৈতিক সীমানার অধীন তথা ঐ রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে গণ্য হয় যেখানে সংশ্লিষ্ট দেশের সংবিধানসহ সমুদয় আইনের প্রয়োগ চলে এবং ঐ দেশ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারের কর্তৃত্ব সেখানে প্রতিষ্ঠিত আছে মর্মে সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত বলে গণ্য করা হয়।
মোদ্দাকথা, একটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয়, ভৌগলিক ও কূটনৈতিক সীমানার উপর অধিকার ও আধিপত্য তথা স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতীক হলো তার জাতীয় পতাকা। তাই ক্ষেত্রবিশেষে বিষয়টি মেনে নেয়া কষ্টকর হলেও স্বীকার করতেই হবে আইনসিদ্ধ ও স্বীকৃত ক্ষেত্র ব্যতীত এদেশের মাটিতে কোন বিদেশি জাতীয় পতাকা, তা সে যে উদ্দেশ্যেই হোক না কেন, উত্তোলন ও প্রদর্শন করা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার বিরুদ্ধ এবং তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। উল্লেখ্য, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২ অনুসারে বিশেষ কিছু কূটনৈতিক ক্ষেত্র ব্যতিরেকে সরকারের সুনির্দিষ্ট অনুমতি ব্যতীত বাংলাদেশের কোথাও কোন ভবন বা গাড়িতে বিদেশি রাষ্ট্রের পতাকা উত্তোলন করা যায় না [বিধি-৯(৪)]।
স্বীকার করতেই হয়, বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সময় ভিনদেশি বিভিন্ন প্রতিযোগী দলের প্রতি আনুগত্য ও সমর্থন প্রকাশের প্রচলিত অভ্যাসের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এদেশে বিদেশি জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের ক্রমবর্ধিত ধারা বাধাহীনভাবে চলে আসছে। এক্ষেত্রে সার্বিক সচেতনতার অভাব ও প্রশাসনিক নির্লিপ্ততার কথা উল্লেখ্য। পাশাপাশি বিপুল জনপ্রিয় এমন একটি বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ততার জন্য আমরা একে একটি সাধারণ বিষয় হিসেবে এতোদিন সানন্দে গ্রহণ করে এসেছি। যাহোক, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের কথা না-হয় বাদই দিলাম, কিন্তু এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে দেশের আইন ভঙ্গ না করে বিপুল জনপ্রিয় এই খেলাকে কেন্দ্র করে দেশের মাটিতে বিদেশি জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও প্রদর্শন যে কোনক্রমেই সম্ভব নয়, সে বিষয়ে আমরা কতটা সচেতন? অতীতে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা দেখেও না দেখে ছিলাম; কিন্তু আর নয়! এ’বিষয়ে একটা বিহিত হওয়া দরকার, সরকারের বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া দরকার। এবং তা এখনই, যাতে অতীতে যাই হয়ে থাক-না কেন, এখন থেকে এ’বিষয়ে আমাদের জাতির সচেতনতা ও বিবেক জাগ্রত করার মহান দায়িত্ব নিয়ে সরকার, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় প্রচারমাধ্যম সকলে মিলে একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন সৃষ্টি করুক, সেটাই কাম্য।
[ লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও মুক্তিযোদ্ধা
[email protected]]
