আজ মহিমান্বিত মোবারক রাত পবিত্র শবে বরাত। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশসহ বিভিন্ন দেশের মুসলমানেরা এই দিবসটিকে শবে বরাত বা ভাগ্য রজনী বা মুক্তির রাত হিসাবে পালন করিয়া থাকেন। পবিত্র কুরআনের সূরা দুখানে এই প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে, ইন্না আনঝালনাহু ফি লাইলাতিম মুবারাকাতিন ইন্না কুন্না মুনিজরিন, ফিহা ইউফরাকু কুল্লু আমরিন হাকিম অর্থাত্ আমি (কুরআন) নাজিল করিয়াছি মর্যাদাপূর্ণ রজনীতে, অবশ্যই আমি হইতেছি (জাহান্নাম হইতে) সতর্ককারী। তাহার (্এই রজনীর) মধ্যে প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের ফায়সালা (স্থিরিকৃত) হয়। প্রখ্যাত তাফসির বিশারদগণ বিশেষ করিয়া তাফসিরে কাবীর, তাফসিরে সিরাজুম মুনীর, তাফসিরে কাশশাফ, তাফসিরে রহুল বয়ানসহ বিভিন্ন গ্রন্থে উদ্ধৃত রহিয়াছে যে, গোটা কুরআন শরীফ লাইলাতুল ক্বদরে লাওহে মাহফুজে নাজিল হইয়াছিল। আর শবে বরাতে লাওহে মাহফুজ হইতে প্রথম আসমানের ইবাদতখানা ‘বায়তুল ইজ্জত’-এ অবতীর্ণ হইয়াছিল। সেই কারণে কুরআনে শবে বরাতকে ‘লাইলাতিম মুবারকাতিন’ বা পবিত্র রাত্রি বলা হইয়াছে।
হযরত মুহাম্মদ (স.) রমজানের পূর্বে শাবান মাসকে অধিক গুরুত্ব দিতেন। শুধু তাহাই নহে, রজব মাস হইতে রমজানের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেন। প্রতি ওয়াক্ত নামাজান্তে প্রার্থনায় বলিতেন, ‘‘আল্লাহুম্মা বারিকলানা ফি রজাবা ওয়া শাবানা, ওয়া বাল্লিগনা ইলা শাহরি রমাজানা” অর্থাত্ হে আল্লাহ, রজব ও শাবানে আমাদেরকে বরকত দিন এবং রমজান পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিন। হযরত আয়শা (রা.) বর্ণনা করিয়াছেন, ‘আমি রসূল (স.)-কে রমজান ছাড়া শাবান মাসের মত এতো অধিক রোজা পালন করতে কখনো দেখি নাই। এই সকল দৃষ্টান্ত হইতে প্রতীয়মান হয় যে, অধিক ইবাদত বন্দেগীতে অতিবাহিত করিয়া সুমহান মাস রমজানের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে হইবে।
আশ্চর্যের বিষয় হইল, উপমহাদেশের মানুষ যাহাকে শবে বরাত নামে চিনিয়া থাকে, হাদিসে তাহাকে ‘নিসফে মিন শাবান’ বা মধ্য শাবানের রজনী বলা হইয়াছে। আল্লামা মোহাম্মদ মাদানী সংকলিত হাদিসে কুদসি গ্রন্থের ১৩৭ নং হাদিসে বলা হইয়াছে যে, যখন মধ্য শাবানের রাত্র চলিয়া আসে, তখন তোমরা সেই রাত্রে ইবাদত করিবে এবং দিনের বেলা সিয়াম বা সংযমব্রত পালন করিবে। কারণ এই রাত্রিতে রব্বুল আলামীন সূর্যাস্তের পর পরই দুনিয়ার আসমানে নামিয়া আসেন। আর বলিতে থাকেন, কোনো পাপিষ্ট আছে কি? আমার কাছে ক্ষমা চাহিবে, আমি তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিব। কোনো রোগগ্রস্ত আছে কি? আমার কাছে নিরাময়তা চাহিবে, আমি তাহাকে রোগমুক্ত করিব। কোন ঋণগ্রস্ত আছে কি? আমার কাছে ঋণ মুক্তি চাহিবে, আমি তাহাকে ঋণ হইতে মুক্ত করিব। এইভাবে বিভিন্ন বিষয়ে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আহ্বান করিতে থাকেন। যাহারা তাঁহার আহ্বানে সাড়া দিয়া ‘তওবাতুন নাসুহা’ বা বিশুদ্ধ তওবা করিয়া যাচ্ঞা পেশ করিবেন, তাহারা অবশ্যই নিষ্পাপ নিষ্কলুষ হইতে পারিবেন।
হযরত আয়শা (রা.) বলিয়াছেন, এক রাত্রে আমি নবীজিকে (স.) বিছানায় না পাইয়া খুঁজিতে বাহির হইলাম। অবশেষে আমি তাহাকে জান্নাতুল বাকীতে কবর জিয়ারতরত অবস্থায় পাইলাম। তিনি সেইখানে আকাশপানে মাথা উত্তোলন করিয়া দোয়া করিতেছিলেন। রসূল (স.) আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আয়শা, আজ মধ্য শাবানের রাত্রি। আল্লাহতায়ালা এই রাত্রিতে বনু কল্ব গোত্রের বকরির পশমেরও অধিক পরিমাণ লোকদের জাহান্নামের আগুন হইতে মুক্ত করিয়া থাকেন। কিন্তু তাহাদেরকে নয়, যাহারা শিরক করিয়াছে, মানুষ হত্যা করিয়াছে, পিতা-মাতার অবাধ্য হইয়াছে, জাদুকর, গণক, মদ্যপায়ী, জুয়াড়ি ও ব্যভিচারী (মেশকাত)।
এই পুণ্যময় রজনীতে মুসলমানেরা নফল ইবাদত বন্দেগী, কুরআন তেলাওয়াত, জিকির আজকার, মিলাদ-মাহফিল, কবর জিয়ারত ইত্যাদি আমলের মাধ্যমে অতিবাহিত করিবেন। কিন্তু আনন্দ উল্লাস, হৈ-হুল্লোড়, হাসি-তামাশা, গল্প-গুজব ও আতশবাজি হইতে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকিতে হইবে। আমরা আজকের এই বরকতপূর্ণ রজনীতে কামনা করিতেছি বিশ্বমানবের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি।
