স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী স্টেডিয়ামটি উদ্বোধন করিয়াছেন গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি। সেই মাঠে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পুরুষ ও মহিলা দলের ৩০টি খেলাও অনুষ্ঠিত হইয়াছে। অথচ মাত্র চার মাস পূর্ণ হইবার আগেই ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক ভেন্যু হিসাবে সদ্য স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সেই সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়ামটির সীমানা দেওয়াল ধসিয়া পড়িয়াছে। আর যথারীতি তাহার খেসারত দিতে হইয়াছে নিরপরাধ জনগণকে— যাহাদের সহিত এই স্টেডিয়াম নির্মাণের নেপথ্যের যেই জটাজাল তাহার দূরতম সম্পর্কও নাই। বড়ো নির্মম, বড়োই মর্মস্পর্শী এই খেসারত। দেওয়াল চাপা পড়িয়া অকালে ঝরিয়া পড়িয়াছে সম্ভাবনাময় তিনটি তরুণ প্রাণ। বিবাহযোগ্যা একমাত্র কন্যা ও ষোলো বত্সর বয়সী একমাত্র পুত্রকে হারাইয়া চিরতরে নিঃস্ব হইয়া পড়িয়াছে একটি পরিবার। এখন কে লইবে ইহার দায়িত্ব? সিলেটের জেলা প্রশাসক জানাইয়াছেন যে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ হইতে ৩৫ হাজার টাকা দেওয়া হইয়াছে। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলি মেরামত করিয়া দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হইয়াছে চা-বাগান কর্তৃপক্ষকে। আর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) জানাইয়াছে যে, ধসিয়া পড়া দেওয়ালটি ২০০৬ সালে নির্মিত। ইহা ২০১৪ সালে আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ উপলক্ষে ন্যাশনাল স্পোর্টস কাউন্সিল কর্তৃক নির্মিত কাজের আওতাভুক্ত ছিল না। রূঢ় বাস্তবতা হইল, যতো ক্ষতিপূরণই দেওয়া হউক না কেন কিংবা যতো যুক্তিই দেখানো হউক না কেন—যেই ক্ষতি হইয়া গিয়াছে তাহা পূর্ণ হইবে না। সন্তান হারানো পরিবারগুলি ফিরিয়া পাইবে না তাহাদের প্রাণপ্রিয় সন্তানকে।
উদ্বেগের এইখানেই শেষ নহে। পুনরায় দেওয়াল ধসিয়া পড়ার আতঙ্কে বিনিদ্র রজনী যাপন করিতেছে স্টেডিয়ামের দেওয়াল-সংলগ্ন চাপারতলা বস্তির শত শত চা-শ্রমিক পরিবার। এই কলোনিতে কয়েক হাজার শ্রমিকের বসবাস। কলোনির ২৫-৩০ ফুট উপরে স্টেডিয়ামের দেওয়াল নির্মাণকালেই কলোনির বাসিন্দারা তাহাদের অন্যত্র সরাইয়া লওয়ার দাবি জানাইয়াছিলেন। কিন্তু কেহই তাহা গ্রাহ্য করেন নাই। যদি করিতেন তাহা হইলে তিনটি প্রাণ হয়তো অকালে ঝরিয়া পড়িত না। এখন উদ্বিগ্ন শ্রমিকরা আশঙ্কা করিতেছেন যে—যেইভাবে স্টেডিয়ামের বালি ও মাটি সরিয়া যাইতেছে তাহাতে সমগ্র স্টেডিয়ামটিই ধসিয়া পড়িতে পারে তাহাদের বসতির উপর। নির্মাণকাজে ত্রুটির অভিযোগও তুলিয়াছেন তাহারা। এই আশঙ্কা ও অভিযোগ উড়াইয়া দেওয়া কঠিন। কোনো না কোনো ত্রুটি না থাকিলে আন্তর্জাতিক মানের একটি স্টেডিয়ামের দেওয়াল ধসিয়া পড়িবে কেন? আর বিসিবি যেই যুক্তি দেখাইয়াছে তাহাও সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য বলিয়া মনে হয় না। ধসিয়া পড়া দেওয়ালটি যখনই নির্মিত হইয়া থাকুক—আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম হিসাবে মাঠটিকে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে কেন তাহা যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হইল না—সেই প্রশ্ন এড়াইয়া যাওয়া কঠিন। তবে ইহা যে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নহে—তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকারি কাজে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে যে অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার মহোত্সব চলিতেছে এই ঘটনাটি তাহারই প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
যথারীতি একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হইয়াছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিবের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিকে তিনদিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলিয়াছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। এই ধরনের কমিটির উপর ভুক্তভোগী জনগণ যে খুব বেশি আস্থাশীল তাহা বলা যাইবে না। তবু আমরা আশা করিব যে, কমিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করিতে সক্ষম হইবে এবং সেই অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গৃহীত হইবে যথাযথ ব্যবস্থা। সর্বোপরি, এমন দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাহাতে না ঘটে তাহা অবশ্যই নিশ্চিত করা হইবে।
