আলোকপাত

মাশরুম প্রকল্প প্রসঙ্গে কিছু কথা

আপডেট : ১২ জুন ২০১৪, ২১:১৫
নানান আলোচনা-সমালোচনার মুখে সরকার মাশরুম প্রকল্পটি বন্ধ করে দিতে পারেন, এরকম একটি আশংকার কথা শোনা যাচ্ছিল। এমতাবস্থায় প্রকল্পের দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক কর্মচারিগণ প্রতি মুহূর্তে আশঙ্কায় সময় কাটাতে থাকলো। আমি একজন মাশরুম ভোক্তা এবং সচেতন নাগরিক হিসাবে জানি এদেশে মাশরুম এখনি বন্ধ করার সময় আসেনি-কারণ আমাদের দেশে মাশরুম চাষ এখনো শুরুই হয়নি। মাশরুম নিয়ে যা হয়েছে তা নিতান্তই লোক দেখানো। এই লোক দেখানো কাজের লোকের চেয়ে অকাজের লোক বেশি জড়িত থেকেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে মাশরুম প্রকল্পের ব্যর্থতার কারণ সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণমূলক একাধিক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এসব লেখার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি—‘বিশ্বসেরা বাটন মাশরুমের জন্য প্রথম উপাদান এর কম্পোষ্ট। জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র এখনো কম্পোষ্ট করতে পারেনি। কোন কোন বছর যা কিছু মাশরুম হয়েছে তা নিতান্তই কাকতালীয়। কম্পোষ্ট করতে গিয়ে এ প্রতিষ্ঠান কোন দেশকে অনুকরণ করেনি। অনুকরণ করলে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মাশরুম হতো।’ শত শত জাতের মাশরুমের চাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণে আপাত ব্যর্থ জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন কেন্দ্রের সম্পর্কে আমার এক প্রিয় ব্যক্তিকে একদা খুব মুগ্ধ হতে দেখি। মুগ্ধতার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি খুব পুলকিত হয়ে বললেন, ‘মাশরুম সেন্টারের ডরমিটরীতে ভাল থাকা-খাওয়ার আয়োজন আছে। আমার খুব ভাল লেগেছে।’ আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনি কি সম্প্রতি প্রকাশিত মাশরুম জার্নালটি পাঠ করেছেন? তিনি বললেন, ‘না সেটি তো পড়া হয়নি।’ ইংরেজীতে একটি কথা আছে, ‘ইফ ইউ ওয়ান্টস টু গো সাম ওয়ান্স হার্ট, প্লিজ গো থ্রো দ্য স্টমাক।’ হ্যাঁ সম্মানিত পাঠক, আপ্যায়নের ভালো সুযোগ আছে আমাদের জাতীয় মাশরুম সেন্টারে। সাদামাটা আপ্যায়ন নয়, একেবারে যাকে বলে জামাই আদর। জাতীয় মাশরুম সম্প্রসারণ কেন্দ্র নয়, মাশরুম চাষিরা মজা করে বলে, ‘এ হলো জাতীয় হাত ধোয়ানো-পা ধোয়ানো সেন্টার।’ শুধু এই কাজটি সফলভাবে করে মাশরুম প্রকল্পের কর্মকর্তারা বিশেষজ্ঞ প্রকল্পবাজ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। এরা জেনে গেছেন কীভাবে প্রকল্পের বরাদ্দ এনে একই জায়গায় সারাজীবন থাকা যায়। এরা জেনে গেছেন, কোন দেবতা কোন ফুলে তুষ্ট। এগুলোও বিশেষ অর্জন বটে! অথচ, প্রতিদিন আমাদের জাতীয় মাশরুম সেন্টার হাজার-হাজার মাশরুম বীজ (স্পন) তৈরি করছে আর সেগুলোর বেশিরভাগই ক্ষতিকর ছত্রাক দিয়ে আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এসব লাখ-লাখ নষ্ট স্পন প্যাকেট রাতের অন্ধকারে মাশরুম সেন্টারের নিকটবর্তী সরকারি জলাশয়ে ফেলে সেটিকে ভরাট করে ফেলা হয়েছে, অথচ পুকুরটিতে এক সময় ভাল দেশীয় মাছ চাষ হতো। মাশরুমের এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মাশরুম স্পন উত্পাদনের সুবিধার্থেই মাশরুম সংশ্লিষ্ট এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি চেয়েছিলেন জাতীয় মাশরুম প্রতিষ্ঠানে মাশরুমের রোগজীবাণুর সনাক্তকরণ এবং দমন বিষয়ে গবেষণা শুরু করা হোক। সম্প্রতি আমি আমাদের জাতীয় মাশরুমের জার্নাল পাঠ করে মর্মাহত হয়েছি। একটি জার্নালে দশটি গবেষণাপত্র ছাপা হয়েছে যার নয়টিতে লেখক হিসেবে একই ব্যক্তির নাম রয়েছে। সৈয়দ মুজতবা আলী অনেক বড় মাপের লেখক, বাঙালির বই কেনার বৈরাগ্যতার কারণে লিখেছিলেন-‘আমি নিজেই বই লিখি, নিজেই প্রকাশ করি আবার নিজেই বাজার থেকে উহা ক্রয় করে পাঠ করি।’ আমার প্রশ্ন হচ্ছে-সৈয়দ মুজতবা আলীর ঠাট্টা রসিকতাকে উপজীব্য রেখে কেউ কেউ জাতীয় প্রতিষ্ঠানে যে ভাঁড়ামি করছে সেটি কি আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা মন্ত্রণালয় দেখছে না! সরকারি অর্থ ব্যয় করে এমন অনর্থ কেন রচিত হচ্ছে সেটি আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। মন্ত্রণালয় একবার শুধু তাকিয়েছিলো, কিন্তু দেখেনি। আমরা জানি তাকিয়ে থাকার নাম দেখা নয়। মাশরুম সংশ্লিষ্ট আম-জনতার অভিযোগ কর্তৃপক্ষের কানে পৌঁছায় না, আর পৌঁছালেই বা কি এখনতো আর তাদের জনগণ লাগে না। আমরা তাদের নিয়ে কি বললাম আর না বললাম তাতে তাদের কিছু যায়-আসে না। লেখক : একজন মাশরুম ভোক্তা ই-মেইলঃ [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন