বিশ্বকাপ জ্বর:দেশের আকাশে বিদেশের পতাকা

আপডেট : ১২ জুন ২০১৪, ২১:১৭
পতাকা একটি চিহ্ন। যে চিহ্ন পরিচয় বহন করে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থের। বাতাসে উড়ালে ‘পত পত’ শব্দ হয় বলেই এর নাম ‘পতাকা’ কিনা তা বলা মুশকিল, তবে পতাকার অপর নাম কেতন। বিজয়ীরা যে পতাকা উড়ান তা বিজয়কেতন। তরুণকে উদ্দেশ করে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন: ‘মরুবিজয়ের কেতন উড়াও শূন্যে হে প্রবল প্রাণ’। মরুবিজয় নয়, বাংলাদেশের তারুণ্য এখন ভিনদেশী পতাকা উড়াচ্ছে ঘরে-বাইরে। উপলক্ষ? বিশ্বকাপ ফুটবল! পতাকা উড়ানোর অর্থ পছন্দের দলের প্রতি সমর্থন। কিন্তু সমর্থন কেবলই সাদামাটা থাকলো না বাংলাদেশে। রীতিমতো উন্মাদনায় পরিণত হলে যা হয়, তারই চূড়ান্ত রূপ দেখছি চারপাশে। ‘ব্রাজিলের জন্য ভাঙ্গাবাসীর তিন হাজার ফুটের লম্বা ভালোবাসা’ সংবাদ শিরোনাম কিংবা ‘বিশ্বকাপ উন্মাদনা, শত ফিট পতাকা নিয়ে শোডাউন’ অথবা ‘চাটমোহরে বিশ্বকাপ উন্মাদনা’র পাশাপাশি দেখতে হয় ‘পতাকা লাগাতে গিয়ে যুবকের মৃত্যু’ শিরোনামও। এই বাক্যগুলো বিশ্বকাপ মৌসুমে পাঠকের কাছে চোখ সওয়া সংবাদ শিরোনাম। ফুটবলকে কেন্দ্র করে বাঙালির আবেগের বহিঃপ্রকাশ নতুন কোন ঘটনা নয়। বহুযুগ ধরে প্রিয় দলের জার্সি, পতাকা আর দেশের নাম নিয়ে অম্ল-মধুর দারুণ সব ঘটনা-দুর্ঘটনার সাক্ষী বাংলাদেশ। বিশ্বকাপের মতো বিশ্ব আসর জমানো আয়োজন খুব কম। অলিম্পিক আর ক্রিকেট বাদে বলতে গেলে আছে কেবল ফুটবলের আসর। খেলার নিয়ম-রীতি আর খেলার উপকরণ সহজ লভ্যতায় ফুটবলের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। পছন্দের দল হিসেবে কোন দেশের প্রতি সমর্থকদের মনের মণি কোঠায় থাকে আবেগ মেশানো ভালোবাসা। শীতল শান্তির লালিত বাণী নিয়ে সৃষ্ট এক একটি বিশ্ব-পতাকা বাংলাদেশে নিয়ে আসে প্রতিযোগিতার উষ্ণতা। কে কত ফুট, কে কত বড় পতাকা ঝুলাতে বা লটকাতে পারি তারই প্রতিযোগিতা। সামাজিক আচরণ হিসেবে প্রবণতাগুলোকে হুজুগ আর গণ-উন্মাদনা বলে। তবুও, এই হুজুগের কিছু ইতিবাচক যে একেবারেই নেই তা অবশ্য ঠিক নয়। ইরাক আক্রমণের মুখে সারাবিশ্বের দেশে-দেশে শান্তিকামী জনতা ইরাকি পতাকা নিয়ে সংহতি মিছিল করেছিলো। বাংলাদেশেও সাধ্য অনুযায়ী বিশ্বশান্তির মিছিল হয়েছিল। সেই পতাকা মিছিল হয়তো ক্ষুদ্র বাংলাদেশে তেমন কোন তাত্পর্য বয়ে আনে না। হয়তো যুদ্ধবাজের আঁচড়ও ফেলে না। কিংবা নিপীড়িত ইরাকিদের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নগদ সাহায্যের যোগানও দেয় না। তবে লাভ কী? লাভ দীর্ঘমেয়াদী! যুদ্ধবিরোধী মিছিলে কদম ফেলা মানুষগুলো নিজেরাই একটি দায়বোধের মধ্যে পড়ে যান। যুদ্ধের বিরুদ্ধে ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে হাজির হয় এইসব পতাকাবাহী শান্তি মিছিল। বিশ্ব ফুটবল আসরের মৌসুমে চোখের সামনে যখন ভিনদেশী পতাকা উড়তে দেখি, তখন একটি দেশের খেলার কৌশলের পাশাপাশি সেই দেশটির ইতিহাসও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নিজ দেশের ফুটবল দল খেলছে না বিশ্ব আসরে; তাতে কী? বিশ্ব ফুটবলের দুই প্রতাপশালী দল ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা পতাকায় বিভক্ত গোটা বাঙালি জাতি। যেন ‘পুঁজি’ বনাম ‘সমাজবাদ’- দুই মেরু বিশ্বের ঠাণ্ডা লড়াই। কিংবা দেশের দুই পরস্পর বিপরীত দুই রাজনৈতিক শক্তি-সমাবেশ। তবুও এই মৌসুমে বাংলাদেশের মাটিতে উড়ন্ত পতাকাগুলোর দিকে তাকিয়ে কোন অবোধ শিশু কিংবা প্রশ্নতাড়িত কিশোর হয়তো তার বাবাকে জিজ্ঞেস করবে, বাবা ব্রাজিলের পতাকার মাঝখানে ওটা কী? ‘আমার মা সব জানে’ বাচ্চারা হয়তো মাকে জিজ্ঞেস করবে- মা, জার্মানির পতাকার এমন রঙ কেন? তখন মা-বাবার দায়িত্ব সন্তানের প্রশ্নকে পাশ কাটানো নয়। বরং পতাকার উসিলায় একটি জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয়, সেই দেশের উপনিবেশবিরোধী লড়াই, সেই দেশের বীরত্বগাঁথা তথা জ্ঞান-মেধা-প্রজ্ঞা-নেতৃত্বের কাহিনী যতটুকু সম্ভব সন্তানের সামনে তুলে ধরা। নয়তো একটি দেশের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হয় না। খেলার আগে যে পতাকা দোলানো হলো, খেলায় প্রত্যাশিত গোল না করায় সেই একই পতাকাকে অস্থিরচিত্তের কোন মানুষের পক্ষে অপমান করতে মুহূর্তমাত্র বিলম্ব হয় না। বিশ্বকাপের মৌসুমেই টের পাওয়া যায় ভিনদেশী পতাকায় মোড়ানো লাল-সবুজের এই বাংলদেশ। এদিকে কে কোন দলকে সমর্থন দিচ্ছে তার ভয়াবহ উচ্চমাত্রার জ্বরে ভুগছে দেশ। সুদূর দ্রাঘিমায় বসে যে দলের চিহ্ন বাসার ছাদে, পড়ার টেবিলে কিংবা রাস্তার অলি-গলি-তস্যগলি-চিপাগলিতে আমরা ঝুলাচ্ছি, তার সম্পর্কে পরিপূর্ণ কাহিনী জানলে সেই দেশটির প্রতি শ্রদ্ধা বাড়বে বৈ কমবে না। স্বাধীনতা মানে কেবল দোলানোর মতো জাতীয় পতাকা নয়, বরং তা যথাযথ উপস্থাপন ও ধারণ করার চেতনা। পতাকার মর্যাদা রক্ষায় কবি গেয়েছেন, ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি’। হাজার ফুট দীর্ঘ পতাকা উড়ানোই কেবল শেষ কথা নয়, পতাকার রঙে ঘর-চাদর-ভবন-পোশাক রঙিন করাই কেবল ভালোবাসা নয়। দারিদ্র্যপীড়িত ঘানা যখন সমৃদ্ধ আমেরিকার বিরুদ্ধে পায়ে পায়ে ফুটবল খেলবে, সেই খেলা কেবলই খেলা নয়, তা লড়াই এবং মর্যাদার লড়াই। হয়তো এমন একদিন আসবে, বিশ্বকাপ ক্রিকেট আর ফুটবল উন্মাদনায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ছেয়ে যাবে ঘানা, আফ্রিকা, বসনিয়ার মত দূর দ্রাঘিমার আকাশ! কবিগুরু বলেছেন, ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি। তোমার সেবার মহান দুঃখ সহিবারে দাও ভকতি’। পতাকা বইবার ভার বলতে এখানে ‘দায়িত্ব’কে বোঝানো হয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের যে দেশ বিশ্ব-ফুটবলে গৌরবের আসনে জায়গা পেয়েছে সেই দেশের পক্ষে মানসিক সমর্থন কি কেবলই খেলাচ্ছলে হারিয়ে যাবে? যে ভ্রাতৃপ্রতীম দেশের পতাকা আমি দেশের মাটিতে উড়ালাম, সেই দেশের প্রতি সেবার মহান ব্রত কিংবা প্রিয় দলের দুঃখ সইবার ভক্তি আছে তো? প্রিয় দল হারলে পতাকাটিকে যেন না ছিঁড়ি! পতাকা উড়ালাম সবাই, পতাকার মর্যাদা নিশ্চিত করছি তো? পতাকা ব্যবসা নয়, পতাকা সচেতনতা বাড়ুক এই মৌসুমে। লেখক:শিক্ষক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়