[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

পুরনো সমস্যার নবতর বিবেচনা

আপডেট : ১৪ জুন ২০১৪, ২১:৩১
ভারতের পনেরতম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির শপথ গ্রহণ নিঃসন্দেহে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দুটো কারণে এই ঘটনা গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত. দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত একমাত্র বৃহত্ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক গতিপ্রবাহে ভারত তাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সর্বোপরি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারত একটি বৃহত্ শক্তি হিসেবেও বিবেচিত। দ্বিতীয়ত. রাষ্ট্রীয়ভাবে ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বি.জে.পি) লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে জয় (২৮৬ আসন) এবং বি.জে.পি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স (এন.ডি.এ) চূড়ান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। বি.জে.পি শুরু থেকেই সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদিকে মনোনয়ন দেয়ার মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে। যাহোক নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির জয়লাভ একদিকে যেমন দক্ষিণ এশিয়া ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, তেমনি বাংলাদেশের জন্য ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আরও গুরুত্ব বহন করে। কারণ ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশ ভারতের উপর অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা মূলত তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ তিন দিকই ভারতের Tyranny of Geography দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়ার কারণে। আবার ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশও ভারতের কাছে গুরুত্ব বহন করে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে যোগাযোগ এবং ঐ অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী তত্পরতা রোধে বাংলাদেশের ভূমিকাও ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের সাথে সম্পর্ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সামপ্রতিক সময়ে একটি প্রতিযোগিতামূলক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ নীতির কারণে আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের কংগ্রেসের সম্পর্ক ভালো থাকে। যদিও এটি বলা যাবে না যে, কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশের স্বার্থের প্রশ্নে সবসময় উদারতা দেখিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি বি.জে.পি ক্ষমতায় থাকলে অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এর কারণ হতে পারে চাণক্য নীতি। যেখানে বলা হয়েছে, আমার শত্রুর শত্রু হচ্ছে আমার বন্ধু। ফলে এবারের লোকসভা নির্বাচনে বি.জে.পি জয়লাভ করায় বিএনপি খুশি। বিএনপি নরেন্দ্র মোদির জয়লাভের সংগে সংগে সরকারি দলের অভিনন্দন পাঠানোর পূর্বেই অভিনন্দন জানায়। বিএনপির এই অভিনন্দন বার্তা নতুন সরকারকে তার পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান থেকে আদৌ সরাবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বিগত ৪৩ বছর বর্তমান সরকারের আমলে ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে যে সুবিধা পেয়েছে তা থেকে নতুন সরকার পিছিয়ে যাবে এটা বিশ্বাস করা কঠিন। উত্তর-পূর্ব ভারত বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে নিজ ভূখণ্ড ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা দেয়া। বঙ্গোপসাগরে গ্যাসব্লক দেয়া, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার বিচার, বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ, নৌ-ট্রানজিট অনুমোদন, পরেশ বড়ুয়াকে হস্তান্তর ইত্যাকার সুবিধাসমূহ। যদিও ভারত বাংলাদেশকে ঋণ ও বিনিয়োগ সুবিধা বাড়িয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সাথে ভারতের অমীমাংসিত কয়েকটি সমস্যা রয়েছে যেগুলোর সাথে বাংলাদেশের জাতীয় সংহতি ও উন্নয়ন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই ইস্যুগুলো হচ্ছে Land Boundary Agreement 1974. এটি বাংলাদেশ পার্লামেন্টে অনুমোদন করলেও ভারত করেনি। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি। বাংলাদেশেও ভারতের স্বার্থ রয়েছে। যেমন: বিগত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের কাছে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সাথে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ট্রানজিট সুবিধা চাইছে। মোদি তার নির্বাচনী প্রচারে বাংলাদেশ থেকে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদেরকে সে দেশ থেকে তাড়ানোর বিষয়ে বার-বারই উল্লেখ করেছেন। বি.জে.পির পলিসিতে আবার এ ধরনের অনুপ্রবেশকারীদেরকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়। বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী মুসলিম আর অন্যদিকে নির্যাতিত হিন্দু। মুসলিমদেরকে দলটির ভাষ্যমতে বাংলাদেশে ফিরে যেতে হবে। হিন্দুরা ভারতে থেকে যাবে। তাদেরকে গ্রহণ করা হবে। বিশ্লেষকদের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী ইস্যুটি ভোটারদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য একটি প্রচার কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ভারত কখনই সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ এই বিষয়টি বাংলাদেশের সাথে তুলে ধরেনি। শুধুমাত্র ভোটের রাজনীতিতেই এই বিষয়টি একটি ইস্যু হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। তবে ভোটারদের সামনে প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ রেখে ভারতে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে বি.জে.পি কঠোর নীতি অবলম্বন করবে, এটি ধারণা করা যায়। কখনও কখনও তারা বাংলাদেশ সীমান্তে Push in-এরও চেষ্টা করবেন। তাই বাংলাদেশ সরকারের উচিত সীমান্তে প্রহরা ও শক্তি বৃদ্ধি করা। ধারণা করা হচ্ছে, তিস্তা চুক্তি এবং সীমান্ত চুক্তির বিষয়ে বি.জে.পি বাংলাদেশের প্রতি নমনীয় হতে পারে। সীমান্ত চুক্তির বিষয়ে বলা যায় এ বিষয়ে বি.জে.পি সতর্ক পদক্ষেপ এগোবে। কারণ, তৃণমূল পর্যায়ে এই চুক্তি বাস্তবায়নের সাথে ভোটের রাজনীতি জড়িয়ে আছে। বি.জে.পি. এর প্রথম বছরে এমন কোন ইস্যু তৈরি করবে না যার জন্য দলটির রাজনৈতিক ইমেজ ক্ষুণ্ন হতে পারে। তিস্তা চুক্তির বিষয়টি বি.জে.পির জন্য মমতাকে বাগে আনার জন্য একটি দরকষাকষির বিষয় হলেও, বি.জে.পি পুরো বিষয়টিকে জাতীয় স্বার্থেই বিবেচনা করবে। ফলে এ বিষয়েও খুব সহসাই ভারতের সাথে বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এটা আশা করা যাচ্ছে না। তাই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একদিকে হতাশার চিত্রই দেখতে পাচ্ছি, অন্যদিকে আশাবাদের জায়গায়ও আছে। বি.জে.পি যেহেতু সুশাসন এবং উন্নয়নের শ্লোগান নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং দলটি ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছে, বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। বি.জে.পির ব্যবসাবান্ধব নীতি কাজে লাগিয়ে ভারতের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ বাণিজ্য বৈষম্য দূর করতে পারে। বর্তমান সরকারের জন্য এটি নীতিগত প্রথম অগ্রাধিকার হতে পারে। দ্বিতীয়ত. অগ্রাধিকারের তালিকায় অবশ্যই সীমান্ত ও তিস্তা চুক্তির বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। এ বিষয়ে সরকার Track II কূটনীতি অব্যাহত রাখতে পারে। প্রথমত. কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারের সাথে আলোচনা অব্যাহত রাখতে পারে এবং দ্বিতীয়ত. অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ককে আরও গভীরতর করা যেতে পারে। দু’দেশের বুদ্ধিজীবী এবং সাংবাদিকদের মধ্যে মত বিনিময় উত্তরোত্তর বাড়ানো দরকার এবং এক্ষেত্রে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশ-বিরোধী জনমতকে নমনীয় করার বিষয়ে দু’দেশের সুশীল সমাজের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তৃতীয়ত. অগ্রাধিকারের তালিকায় সরকারের উচিত হবে সীমান্তে উত্তেজনা প্রশমনে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর সাথে যেখানে বি.জে.পির রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে (যেমন:আসাম), সে রাজ্যগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়নকে জরুরি হিসেবে বিবেচনা করা। চতুর্থত. বাংলাদেশ সরকারের উচিত সীমান্ত এলাকার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা। তা না হলে নিরীহ দরিদ্র মানুষগুলো সীমান্তে নানা অপরাধে জড়াবে এবং বি.এস.এফ-এর গুলিতে মারা যাবে। বি.এস.এফ কর্তৃক নিরীহ বাংলাদেশিকে হত্যা একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যতই আমরা ভারতকে গালাগাল দেই, ভারত তা শুনবে না। তাই সীমান্ত এলাকায় উন্নয়নের সুবিধা ছড়িয়ে দেয়াই হবে সম্ভবত একটি বাস্তবসম্মত সমাধান। তার মানে এই নয় যে, দেশপ্রেমিক জনগণ ভারতের যেকোন অন্যায় মুখ বুঁজে মেনে নেবে। সবশেষে বলতে চাই দীর্ঘ ৪৩ বছর পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে। যে ভিত্তির মূলে রয়েছে আস্থা। ভারতের গণমাধ্যম, সুশীল সমাজে বাংলাদেশের শুভাকাঙ্ক্ষী পূর্বের তুলনায় বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত বিরোধিতাও ক্রমান্বয়ে একটি সহনীয় জায়গায় এসেছে। এই অবস্থানটি অব্যাহত রাখা একদিকে যেমন ভারতের জন্য প্রয়োজন, অন্যদিকে বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশেরও এই অবস্থা থেকে পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই। তবে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। এর দেশপ্রেমিক জনগণ কখনই সীমান্তে নিরীহ মানুষকে হত্যা, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়ে ভারতে অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ অবশ্যই অব্যাহত রাখবে। লেখক : সহযোগী অধ্যাপক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন