সুশাসন নিশ্চিত না হলে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে

আপডেট : ১৪ জুন ২০১৪, ২১:৩১
২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরের বাজেটে অবশেষে ২,৫০,৫০৬ কোটি টাকার ব্যয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। সন্দেহ নেই, উচ্চাভিলাষী হলেও তাতে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় একটি বৃহত্ বাজেট পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু এ প্রাক্কলিত ব্যয় অর্থায়ন করতে যেয়ে সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৭,৫৫২ কোটি যার মধ্যে ৪৩,২৭৭ কোটি আসবে আভ্যন্তরীণ উত্স অর্থাত্ ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে, অবশিষ্ট ২৪,২৭৫ কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে। আভ্যন্তরীণ উত্স থেকে আহরিত রাজস্বের প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট পরিমাণে হচ্ছে না বলেই এ বাজেট ঘাটতির পরিমাণ প্রতি বছরই বাড়ছে এবং এর অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘাটতি বাজেট খারাপ নয়, তবে ব্যাংক ঋণ এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রির অর্থে অর্থায়ন করলে যে সুদ পরিশোধ করতে হয় তা দিয়ে দেশের বহু উন্নয়ন,অনুন্নয়ন ব্যয় মিটানো যেতো। তাই ব্যাংক ঋণ এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রির অর্থের ওপর নির্ভর না করে কর, বিশেষ করে প্রত্যক্ষ করের আহরণ বাড়ানো উচিত। সেজন্য করের জাল বৃদ্ধি করে করদাতার সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। বাজেট অর্থ-বছরে দু’লাখ নতুন করদাতাকে করের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। দু’লাখ সংখ্যাটি কর প্রদান করেন না এমন টিনধারীর (আনুমানিক ১০ লাখ) সংখ্যার তুলনায় কম। অন্যদিকে ব্যাংক ঋণ এবং সঞ্চয়পত্রের চেয়ে বৈদেশিক ঋণের সুদের হার অনেক কম এবং বৈদেশিক ঋণের জন্য হাত পাততে হয় না, ইচ্ছা প্রকাশই যথেষ্ট। সুতরাং, দেশের স্বার্থে, জনগণের কল্যাণে যতটুকু সম্ভব বৈদেশিক ঋণ নেয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ৪৩,২৭৭ হাজার কোটি টাকার অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর গড়ে আনুমানিক ১২% হারে বছরে সুদ দাঁড়ায় ৫,১৯৩ কোটি টাকা, আর এ টাকা বৈদেশিক ঋণ হিসাবে নিলে বছরে সুদ আসতো গড়ে অনুমানিক ২.৫% হারে মাত্র ১,০৮১ কোটি টাকা। বাজেটে ২৪,২৭৫ কোটি টাকার যে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান প্রাক্কলন করা হয়েছে এ রকম বড় অংকের টাকা নিকট অতীতে পাওয়া যায়নি, সে প্রেক্ষিতে আভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ আরও বেড়ে যেতে পারে। তবে পদ্মা সেতুর জন্য বৈদেশিক ঋণের চেষ্টা করলে এবং পেলে আভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ কমে যাবে। বাজেটে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে প্রাক্কলিত বরাদ্দ ও বিতরণ ব্যবস্থা যথেষ্ট বলে মনে হয় না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ে আর্থিক সহায়তার বিতরণ পদ্ধতি দুর্নীতিমুক্ত করার প্রয়োজন ছিল। সরকারের আভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ সরকারের খরচ বৃদ্ধি পাবে, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা ব্যাংকিং সেক্টর থেকে কম ঋণ পাবে, ফলে বিনিয়োগ কম হবে, কর্মসংস্থান কমবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন নোট ছাপালে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতি বাজেট অতিক্রম করবে। এই মূল্যস্ফীতি দরিদ্র মানুষকে ক্যান্সারের মত আরও গরীবে পরিণত করে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ (প্রায় ২৬,০০০ কোটি) সরাসরি সুবিধাভোগীর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে বলে দারিদ্র্য হ্রাস পায়। যেমন ভিক্ষাবৃত্তির অবসান, মাতৃত্বকালীন ভাতা, বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা, বিধবা/স্বামী-পরিত্যক্ত ভাতা, হিজরা, এতিম শিশুদের জন্য বরাদ্দ, একটি বাড়ি এ্কটি খামার, অতি দরিদ্রদের কর্মসংস্থান, ভিজিডি, ভিজিএফ, কাবিখা ইত্যাদি। ভাতা ছাড়াও শেষোক্ত কর্মসূচিগুলো হতদরিদ্রদের সক্ষমতা বাড়ায়। বর্তমানে দেশে বয়স্ক ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৬৫ লাখ হলেও বয়স্ক ভাতার সুবিধাভোগী প্রায় ২৫ লাখ। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টিকর খাদ্য ইত্যাদি কারণে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় ২০৫১ সাল নাগাদ ৬০ বছরের অধিক বয়স্ক জনসংখ্যা ৩ কোটিতে দাঁড়াতে পারে। সুতরাং, এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা উচিত ছিল। দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্যে এসব বরাদ্দ প্রশংসনীয়, কিন্তু প্রকৃত সুবিধাভোগীদের হাতে নগদ অর্থ পৌঁছার পূর্বেই দুর্নীতির কবলে পড়ে একাংশ বেহাত হয়ে যায়। এসব নগদ সহায়তা বিতরণের দক্ষ ব্যবস্থাপনার জন্য বাজেটে প্রস্তাব ও বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন ছিল। এ ক্ষেত্রে সুবিধাভোগীদের পূর্ব তালিকা তৈরি করে স্থানীয় প্রশাসন এবং কোন এনজিও দ্বারা প্রত্যায়ন করে ব্যাংক হিসাব খোলার পর বিতরণ করলে হয়তো দুর্নীতি পরিহার করা যেতো। বেপরোয়া দুর্নীতির জন্য হতদরিদ্ররা বঞ্চিত হয়, বরাদ্দকৃত অর্থের এক বিরাট অংশ চলে যায় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পকেটে। সুতরাং, বাজেটে যতই বরাদ্দ বাড়ানো হোক না কেন, দুর্নীতি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার প্রস্তাব থাকতে হবে, নতুবা দারিদ্র্য দূর হবে না। দারিদ্র্য বৃদ্ধির আরও একটি বড় কারণ প্রতি বছর নদী ভাঙ্গনে ভিটামাটি, জমি হারানো নিঃস্ব প্রায় ১০ লাখ জনগোষ্ঠী। এরা সর্বস্ব হারিয়ে উদবাস্তু হয়ে যায়। তাছাড়া দেশের সর্বমোট ক্ষতি দাঁড়ায় প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা। এ ক্ষতি পোষানো কঠিন, তাই প্রতিকারই সর্বোত্তম পন্থা। নদী ভাঙ্গন ঠেকাতে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে স্থায়ী বাঁধ স্থাপন প্রয়োজন। বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ নেই। দারিদ্র্য বিমোচনে এবারের বাজেটে ৫,০০০ টাকার কম বেসরকারি বেতনধারীদের জন্য ৫৮ বছর বয়সে পেনশন প্রদানের প্রস্তাব করার কথা ছিল, সেটি বাজেটে আছে বলে মনে হয় না। বাজেটে সাধারণ নাগরিকদের কর মুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো উচিত ছিল । তাতে ধনী-দরিদ্র সবাই উপকৃত হলেও মধ্য ও নিম্ন-বিত্তদের সংখ্যা অধিক বলে তারাই বেশি উপকৃত হতো। তাতে সম্পদের সুষম বন্টন বাড়তো ও দারিদ্র্য হ্রাস পেতো। মূল্যস্ফীতি দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। মূল্যস্ফীতি হতদরিদ্রের জন্য ক্যান্সারস্বরূপ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে ঘাটতি বাজেট কাম্য নয়, ব্যাংকিং সিষ্টেম থেকে সরকারের সীমাহীন ঋণ নেয়া কাম্য নয়। এ ঋণের উপর সুদ একটি বাড়তি খরচ। তাছাড়া ব্যবসায়ী, শিল্পোদোক্তারা ঋণ থেকে বঞ্চিত হবে। তাতে বিনিয়োগ কম হবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে। এ দেশে এখনও কৃষি প্রধান দেশ। বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি কর্মক্ষম এবং তাদের উপর নির্ভরশীল ৯ কোটি লোক সরাসরি কৃষি কাজে নিয়োজিত। এখনও আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারিনি, এবারও ২৮ কোটি ডলারের চাল আমদানি করা হয়েছে। মসলা, ডাল, পিঁয়াজ, রসুন, আদাসহ ফল-ফলাদি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এখনও কৃষিতে আধুনিক পদ্ধতি, হাইব্রিড বীজ, সারা বছর উত্পন্ন হয় এমন পণ্য, ন্যায্য দামে সার, কীটনাশক এবং সেচ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানি করতে যেয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ে। সীমিত কৃষি জমির পরিমাণ প্রতি বছর ১% কমে যাচ্ছে যা ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত। এজন্য দেশে হাইব্রিড ফসল, খরা ও বন্যাসহিষ্ণু ধান, বছরব্যাপী ফলন দেয় এমন সবজি, ফল ও মসলার আবাদ প্রচলন করতে হবে। এজন্য বাজেটে ভর্তুকি ও গবেষণার জন্য বরাদ্দ বাড়ানো উচিত ছিল। সরকার সেচের জন্য ডিজেলে যে ভর্তুকি দেয় তা প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছতে পারে না। সেচ পাম্পের মালিক কৃষকের কাছ থেকে উচ্চহারে দাম নেয় যা কৃষকের লোকসান বাড়িয়ে দেয়। সারের ভর্তুকিও কৃষকের হাতে পৌঁছে না। ইতোপূর্বে আমি একাধিকবার সুপারিশ করেছিলাম সার ও সেচের ভর্তুকি হিসেবে। পুরো খরচটাই সরকার বহন করুক অর্থাত্ সার ও সেচ বিনামূল্যে কৃষকরা পাক, তাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দুর্নীতি ও দারিদ্র্য দূর হতো, কৃষিতে প্রবৃদ্ধি বাড়তো, তাতে জাতীয় প্রবৃদ্ধিও বাড়তো, বাজেটে সে রকম প্রস্তাব নেই। ব্যক্তি, পরিবার, জাতীয় অর্থনীতি, সর্বক্ষেত্রেই সঞ্চয় থাকলেও সেই সঞ্চয় বিনিয়োগ না হলে কোন আর্থিক উন্নতি বা প্রবৃদ্ধি হয় না। ব্যাংকের এক লাখ কোটি টাকার অলস তারল্য, শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীরা, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা, সবাই অর্থ নিয়ে অপেক্ষা করছে বিনিয়োগের পরিবেশের জন্য। অবকাঠামো, শিল্প-বাণিজ্যে বিনিয়োগ সুশাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে। সরকারকে সেই স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দিতে হয়। বাজেটে সে রকম প্রস্তাবনা আছে বলে মনে হয় না। [লেখক: এফসিএ ও কথাশিল্পী ]