ইরাকের নূতন পরিস্থিতি

আপডেট : ১৪ জুন ২০১৪, ২১:৩২
ইউক্রেন সংকটের পর এখন ইরাক সংকটই বিশ্ববাসীকে আকর্ষণ করিয়া চলিয়াছে। ইরাকের সর্বশেষ খবর হইল, ইসলামি জঙ্গিদের হাতে ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শহর পতনের পর অস্থিতিশীল ও ঘোলাটে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়া কুর্দি বিদ্রোহীরা উত্তরাঞ্চলীয় তেলসমৃদ্ধ শহর কিরকুকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হস্তে নিয়া নিয়াছে। এখন স্বায়ত্তশাসন ভোগ করা কুর্দিরা দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন কুর্দিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করিবে কিনা সেই জল্পনা-কল্পনা চলিতেছে। ইহার আগে আল কায়েদার শাখা আইএসআইএল বা ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ট-এর জঙ্গি বা যোদ্ধারা ফালুজা, রামাদি, দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল এবং সর্বশেষে প্রয়াত ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের জন্মশহর তিকরিত ও তেলসমৃদ্ধ বিখ্যাত শহর বাজি দখল করিয়া নেয়। ইহার ফলে প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকির সরকার কার্যত অসহায়, দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িয়াছে। অধিকৃত শহরগুলিতে সরকারি বাহিনী যেভাবে উর্দি খুলিয়া পলায়ন করিয়াছে, তাহাতে এই শহরগুলি সহসা পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব বৈকি। মালিকি পার্লামেন্টে জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে সমর্থন আদায় না করিতে পারিয়া এখন জঙ্গি অধ্যুষিত ও দখলকৃত অঞ্চলে মার্কিন ড্রোন হামলার অপেক্ষায় আছেন। ততদিনে খোদ রাজধানী বাগদাদের পতন হইয়া যায় কিনা তাহাই উদ্বেগের বিষয়। ২০০৩ সালে ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনীর হামলায় সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাক আর কখনও এতটা বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে নাই। গত এক দশক ধরিয়াই ইরাক একটি জ্বলন্ত অগ্নিগিরি যেন। ২০১১ সালে ইরাক হইতে মার্কিন বাহিনী বিদায় নিবার পর সেখানে শিয়াজোট নিয়ন্ত্রাধীন একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু দুর্বল সরকারের কারণে শেষ হয় নাই বোমা হামলা। সর্বোপরি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা সুদূরপরাহত হইয়া পড়ে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হইল, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাঁবেদার শাসকদের শেষ পরিণতি দেখিয়াও এখনকার বিদ্রোহী বা শাসক গোষ্ঠীর টনক নড়িতেছে না। ২০০৩ সালে পশ্চিমা বহুজাতিক বাহিনীর আক্রমণের পর ইরাকের দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের পতন হয়। সাদ্দাম হোসেন কাহার তাঁবেদারি করার কারণে এতদিন টিকিয়া ছিলেন এবং কাহার উস্কানিতে কুয়েত ও ইরানের সহিত যুদ্ধে জড়াইয়া পড়েন, সেই ইতিহাসও কাহারও অজানা নহে। কিন্তু এতকিছু করার পরও প্রভুৃরা তাহাকে ক্ষমা করেন নাই। তাহার পতনের পর তাহাকে একটি গুহা হইতে পাকড়াও করা হয় এবং একপ্রকার প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে মুসলমানদের পবিত্র দিন ঈদের মাত্র একদিন আগে ফাঁসি কাষ্টে ঝুলানো হয়। আমরা লিবিয়ায় চার দশকের স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির নির্মম পরিণতি লক্ষ্য করিয়াছি। এমন পরাক্রমশালী শাসককেও একটি ব্রিজের নিচ হইতে ধরিয়া আনিয়া নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। আরব বসন্তের হাত ধরিয়া তিউনিশিয়া ও মিসরের লৌহ মানব জয়নাল আবেদিন ও হোসনি মোবারকের পতন হয়। তাহাদের পরিণতি সাদ্দাম হোসেন ও গাদ্দাফির মত নির্মম না হইলেও কম বেদনাদায়ক নহে। যাহারা তাঁবেদার, স্বৈরশাসক ও অত্যাচারী, প্রকৃতির নিয়মেই একদিন তাহাদের পতন ঘনাইয়া আসে। যাহারা তাহাদের তৈরি করেন এবং দুধ-কলা দিয়া বড় করিয়া তোলেন, প্রয়োজন ফুরাইয়া গেলে তাহাদের ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিতে তাহাদের হাত মোটেও কাঁপে না। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া প্রভৃতি যুদ্ধবিধ্বস্ত বা কলহে লিপ্ত দেশে বর্তমান শাসক বা বিদ্রোহীরা যাহারা জনগণকে পাশ কাটাইয়া অন্যের ওপর ভরসা করিয়া ক্ষমতায় আছেন বা যাওয়ার জন্য চেষ্টা করিতেছেন, তাহাদের পরিণতিও একদিন শুভ হইবে বলিয়া মনে হয় না। যুদ্ধ বা সন্ত্রাসের মাধ্যমে কখনও কোনো শান্তি আসিতে পারে না। ইহাই ইতিহাসের সত্য।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন