রাজধানীর পল্লবীর কালশীতে আটকাইয়া পড়া পাকিস্তানি বিহারী ক্যাম্পে গত শনিবার প্রত্যুষে একই পরিবারের ৯ জনকে পুড়াইয়া হত্যা করা হইয়াছে। নিহতদের মধ্যে ১২ থেকে ১৪ বত্সরের শিশু রহিয়াছে তিনজন। ঘরের বাহিরে থাকা পরিবারের আরেক সদস্য মারা যান তালাবদ্ধ জ্বলন্ত ঘর হইতে আপনজনদের উদ্ধার করিতে গিয়া। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিবরণী হইতে জানা যায়, পবিত্র শবে বরাতের রাতে বাজি ফুটানোকে কেন্দ্র করিয়া সৃষ্ট বিবাদের ধারাবাহিকতায় সকাল সাতটায় বিহারী ক্যাম্পের কয়েকটি ঘরের কপাটে তালা ঝুলাইয়া কেরোসিন ঢালিয়া আগুন ধরাইয়া দেওয়া হয়। হামলা চালানো হয় আগুন নিভাইতে আসা বিহারীদের ওপরও। এহেন নারকীয় বর্বরতার সংবাদে আমরা স্তম্ভিত, বেদনার্ত ও বিচলিত। মানুষ মানুষের প্রতি এতটা নির্দয় হইতে পারে, তাহা ভাবিতেও গা শিহরিত হইয়া ওঠে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক কেন এই নিষ্ঠুরতা! পাশবিকতার এ কোন্ উল্লাস! কেবলই আতশবাজিকে কেন্দ্র করিয়া এতবড় মর্মান্তিক বিপর্যয় ঘটিয়া গেল, এমনটি বিশ্বাস করা বাস্তবিকই কঠিন।
পত্রিকায় প্রকাশিত স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং এলাকার তথ্যাভিজ্ঞমহলের বক্তব্য হইতে জানা যায় যে, বিদ্যুত্ লইয়া বিহারী ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী রাজু বস্তির লোকজনের বিরোধ চলিয়া আসিতেছিল অনেকদিন ধরিয়া। বিহারী ক্যাম্প হইতে পাশের বস্তির মানুষ বিদ্যুতের সংযোগ নিতে চাহেন। কিন্তু বিহারিগণ তাহা দিতে সম্মত নহেন। বিষয়টি লইয়া দেন-দরবার ও বিসম্বাদের ঘটনাও ঘটিয়াছে। থানায় নাকি মামলাও হইয়াছে। বিভিন্নসূত্রে জানা যায়, মাসখানেক আগে পর্যন্ত এই ক্যাম্প হইতে পাশের বস্তিতে বিদ্যুত্ নেওয়া হইত। পরে সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করিয়া দেওয়া হইলে পাশের বস্তির মানুষ সড়ক অবরোধের মত কর্মসূচিও পালন করিয়াছেন। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় নাই। পক্ষান্তরে ওয়েলফেয়ার বিহারী মিশনের সভাপতির বরাত দিয়া পত্রিকান্তরে বলা হয় যে, মহলবিশেষ বিহারী ক্যাম্প উচ্ছেদ করিয়া হাউজিং করিতে চাহেন। এই কারণেও হামলাটি চালানো হইয়া থাকিতে পারে। শেষোক্ত সম্ভাবনার বিষয়টিকেও উড়াইয়া দিবার পক্ষপাতি নহেন অভিজ্ঞমহলের অনেকেই।
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই জমির দাম হু হু করিয়া বাড়িয়া চলিয়াছে। আর, ঢাকায় জমি তো নয়; একেকটি সোনার টুকরা যেন। দাম গগনস্পর্শ করিয়াছে অনেক আগেই। দাম বাড়িবার সাথে সাথে জমিজমা দখল করিয়া লইবার প্রতিযোগিতাও তীব্র হইয়াছে। যাহারা দখল করে তাহাদের ছল ও কৌশলের অভাব নাই। জমির মূল্য যত বাড়িয়া চলিয়াছে ততই কমিতেছে যেন মানুষের জীবনের দাম! এই নগরে বস্তিতে আগুন লাগিবার ঘটনা অতীতে আরও বহু ঘটিয়াছে। আগুনে পুড়িয়া মরিয়াছেন দরিদ্র মানুষ। বস্তির জমি দখলে নেওয়ার জন্যই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সংঘটিত করা হয় বলিয়া আকারে প্রকারে আলোচনা-সমালোচনা হয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সব অভিযোগ-অনুযোগ থিতাইয়া যায়। প্রতিকার হয় না।
কালশীর বিহারী ক্যাম্পের মর্মান্তিক ঘটনার পশ্চাতের প্রকৃত কারণ কী তাহা আমরা জানি না। সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করিয়াছে। আশা করি অনুপুঙ্ক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই ঘটনার কারণ খুঁজিয়া বাহির করা হইবে। দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করিয়া আইনের আওতায় আনা হইবে। জনগণের সরকার এই ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করিবে, ইহাই আমাদের প্রত্যাশা।
