সত্যায়ন কাহিনী

আপডেট : ১৫ জুন ২০১৪, ২১:৩৫
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষক আমার শিক্ষাজীবনের সকল সনদপত্র সত্যায়িত করে দিয়েছেন, সেই শিক্ষক চারিত্রিক স্খলনজনিত কারণে আজ স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত। মজার বিষয় হলেও সত্য, আমার এলাকার যে চেয়ারম্যান আমার চারিত্রিক সনদপত্র দিয়েছেন দুর্নীতির দায়ে তিনি এখন জেলে। অথচ যে কাগজপত্র আমি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জমা দিয়েছি সেখানে এসব চাকরিচ্যুত কিংবা জেলে থাকা চেয়ারম্যানদের সিলমোহর তাদের সত্যায়ন ক্ষমতাকে ব্যঙ্গ করছে। চাকরি প্রার্থী এই আমি, কিংবা আমরা এখানো আমাদের সত্য সনদগুলো ‘অসত্য’ দিয়ে সত্যায়িত এবং আমাদের চরিত্রের সনদে দুশ্চরিত্রদের সিল এঁটে নিয়ে চলেছি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সত্যায়ন বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা এই লেখার লক্ষ্য। প্রত্যেক সরকারি কিংবা বেসরকারি চাকরি, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, পাসপোর্ট, বৃত্তি কিংবা কাগজপত্র দাখিল করার সমস্ত জায়গাতেই কাগজপত্র প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা কর্তৃক সত্যায়িত করা বিড়ম্বনার অপর একটি নাম। একজন চিকিত্সকের কাছে কাগজপত্র সত্যায়িত করতে গেলে তিনি চিত্কার করে উঠবেন-‘সারাদিন আপনাদের কাগজপত্র সত্যায়িত করবো না কি মানুষের চিকিত্সা করবো’। সরকারি অফিসে কাগজ সত্যায়িত করতে গেলে আপনি অফিসারের কক্ষেই ঢুকতে পারবেন না। তাহলে প্রতিদিন এই যে হাজার হাজার কাগজপত্রে, সনদে হাজার হাজার সিল পড়ে, স্বাক্ষর পড়ে এগুলো করে কারা? ঢাকা শহরে যারা বেশ কিছু দিন থেকে বাস্তব অবস্থার ফাঁক-ফোঁকর ধরে ফেলেছেন তারা নীলক্ষেত থেকে ৫০ টাকা দিয়ে একটি সিল আর ৩০ টাকা খরচ করে একটি প্যাড কিনে ফেলেছেন। যতদিন প্রয়োজন ব্যবহার করতে পারছেন এটি। নিজে ব্যবহার করছেন এবং পাশের বন্ধুকে ব্যবহার করতে দিয়ে বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি দিচ্ছেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর প্রায় প্রতিটি কক্ষে আপনি এ সুবিধা পাবেন। ঢাকা শহরে যারা নতুন এসেছেন, বিশেষ করে ভর্তি পরীক্ষার্থীরা তারা নীলক্ষেতের দোকানগুলোতে অশিক্ষিত কিংবা অর্ধশিক্ষিত দোকানীদের কাছ থেকে ২০ টাকা খরচ করে কাগজপত্র সত্যায়িত করে নিতে পারবেন। আরও সহজ হবে ফার্মগেটের কোচিং সেন্টারগুলোতে। আপনি যদি সেখানে কোচিং করেন তবে বিনা পয়সায় পাবেন সত্যায়ন কিংবা প্রত্যয়ন সুবিধা। কাগজপত্র সত্যায়ন কিংবা চারিত্রিক সনদপত্রের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করছি না, কিন্তু বর্তমান বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে সত্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাববার তাগিদ অনুভব করছি। আমার চরিত্র সম্পর্কে যার ‘ক-অক্ষর’ জ্ঞান নেই কিংবা যিনি আমাকে চরিত্রের সনদ দিবেন তিনি মারাত্মক দুশ্চরিত্রের, সেই সনদ প্রাসঙ্গিক কিনা তা ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে। কাগজপত্র যাচাইয়ের সূচক যদি হয় এই ধরনের সত্যায়ন তবে ‘সত্যায়ন ও মিথ্যায়ন’ নিয়েও চিন্তা করতে হবে। বাস্তবতা হলো আমাদের সত্য সনদগুলোতে মিথ্যার সিলমোহর লাগিয়ে প্রকারান্তরে সনদগুলোকে কলঙ্কিত করা হচ্ছে। চাকরিপ্রার্থী আর ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা এই মিথ্যার সিল মেরে তাদের কর্মজীবন শুরু কিংবা উচ্চশিক্ষা জীবন শুরু করছে। নৈতিক বিচারে এই ধরনের সত্যায়ন ব্যবস্থার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে সত্যায়ন ব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু তা সীমিত ক্ষেত্রে। সেখানে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তারাই সত্যায়িত করবেন এমনটি নয় বরং কাগজপত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই এসব কাজ করে থাকেন। আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজেই নিজের কাগজপত্র সত্যায়িত করেন অন্যের নামে কিংবা নীলক্ষেতের ২০ টাকা মূল্যের সিল মেরে নেন। অফিসিয়াল বিড়ম্বনাই এর সবচেয়ে বড় কারণ। অনেক সময় কর্মকর্তারা বিরক্ত হয়ে এসব সময় ব্যয় করতে চান না। আবার অনেক সময় সত্যায়ন প্রার্থীরাও কর্মকর্তাদের অফিসের সামনে বিরক্তিকর সময় নষ্ট করে বসে থাকতে চান না। খুব সামান্য ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তারা কাগজপত্র সত্যায়িত করলেও মূলকপি দেখে করেন না যা আসলেই ভুয়ামি। কাগজপত্র যাচাই এবং চরিত্র বাছাই যদি সত্যায়ন ও চারিত্রিক সনদপত্রের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে এ উদ্দেশ্য ষোলআনাই ফাঁকি। ডিজিটাল যুগে একটি ‘নীলক্ষেতের সিল-স্বাক্ষরে’ কাগজপত্র যাচাই হবে তা অবশ্যই অগ্রহণযোগ্য। যেহেতু বর্তমানে জন্মসনদ ও বিভিন্ন পরীক্ষার তথ্যাদি প্রযুক্তিগতভাবে সংরক্ষণ সম্ভব এবং প্রয়োজনীয় সময়ে যাচাই করা সহজ তাই সত্যায়নের এই গতানুগতিক পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাববার অবকাশ রয়েছে। লেখক :এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন