‘যেতে নাহি দেব হায় তবু যেতে দিতে হয়’ এই অমোঘ সত্য থেকে প্রাণীজগতের নিষ্কৃতি নেই জেনেও মানুষ অমরত্বের সন্ধানে দশ দিগন্তে রেখে যেতে চায় তার সৃষ্টি সম্ভার, রাজা-প্রজা থেকে শিল্পী, কবি-সাহিত্যিক সকলেই নিরন্তর সেই চেষ্টায় নিজেকে নিয়োজিত করতে চান তার শিল্প বলয়ে। সেই বলয়ে কেউবা সার্থকতা অর্জন করেন। সার্থকতার সাফল্য পেতে যদিও সময়ের প্রয়োজন, সময়ই তাকে এগিয়ে নিয়ে যায় অনন্তের দুয়ারে। অনন্তের দুয়ার পেরিয়ে যারা উজ্জ্বলের পথে অগ্রসর হতে পারেন, তারাই হয়তোবা শিল্পকর্মে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন সমাজের আলোকিত লোকালয়ে।
আলোকিত লোকালয়ের তেমন একটি মানুষ ফকরুজ্জামান চৌধুরী। যিনি একাধারে ছিলেন অনুবাদক প্রকাশক এবং হাস্যোজ্জ্বল সরল ব্যক্তিত্ব। জনাব চৌধুরী জন্মেছিলেন কুমিল্লার একটি শিক্ষিত শিল্পসংস্কৃতিমনা পরিবারে ১৯৪০ সালে, শিক্ষায় আলোকিত হয়েছিলেন পারিবারিক আবহে এবং ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগ থেকে যে কয়েকজন ছাত্রছাত্রী পরবর্তী জীবনে স্বনামে খ্যাত হয়েছেন তাদের মধ্যে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, রাহাত খান, সুনন্দা সেন গুপ্ত, জিয়া হায়দার এরা বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্য অঙ্গনে স্বপ্রতিষ্ঠায় সমুজ্জ্বল।
আমাদের অগ্রজ জিয়া হায়দার যদিও তাদের সঙ্গে উল্লেখিতদের ভেতরে বছর দুয়েকের অগ্রজ ছিলেন তা সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে ছিলো প্রগাঢ় সম্পর্ক। সম্পর্ক আরো গভীর হয়েছিল তাঁর অগ্রজ ডা. মনিরুজ্জামান চৌধুরী সেইসময়ে পাবনা সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জন হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ফলে উভয় পরিবারের মধ্যে আরো সম্পর্ক গভীর হয়।
ফকরুজ্জামান চৌধুরীকে আমরা ফকরু ভাই বলতাম পরবর্তীতে। ফকরু ভাই তাঁর যাত্রাপথের বিবরণ দিলেন এবং জগন্নাথগঞ্জ ঘাট ও সিরাজগঞ্জ ঘাটের, যমুনা নদীর ইলিশ মাছ ভাজি এবং ট্রেনের চেকার সাহেব বার দুয়েক তার টিকিট চেক করেছিলেন, কারণটি জিয়া ভাই জানতে চাইলে ফকরু ভাই জানিয়েছিলেন, চেকার সাহেব হয়তো ভেবেছিলেন কলেজের ছাত্র বিনা টিকিটের যাত্রী। সেই প্রেক্ষাপটেই বার দুয়েক দেখেছিলেন আমার ইন্টার ক্লাসের টিকিট।
একদিন ফকরু ভাই এলেন আমাদের শহরতলীর দোহারপাড়ার বাড়িতে। তিনি কিছুটা সময় দোতলার ঘরে বসে তার প্রিয় রউফ ভাইকে (জিয়া ভাইকে) বললেন, আমরা দোতলায় না থেকে পুকুরপাড়ে গিয়ে সময় কাটাই। পুকুরের তিনদিকে তিনটি ঘাট। ফকরু ভাইয়ের পছন্দ হয়েছিল পশ্চিম ঘাটটি। এমন সময় নারিকেল, চিড়া মুড়ি গুড় এবং আমাদের বাগানের ল্যাংড়া আম দিয়ে বৈকালিক ভোজন হলো এবং একই সঙ্গে পুকুরের মাছও ধরা হলো রাতের আহারের জন্য। রাতে আহার না করেই আমার মা আর পিতাকে জানালেন, বড়োকর্তা রাগ করবেন রাতে দুইজনই রউফ ভাইয়ের জন্য রান্না করেছেন এবং ভাতিজি লায়লাও কান্নাকাটি করবেন।
এমএ পাস করার কিছুদিন পরেই ফকরু ভাই যুক্ত হয়েছিলেন বাংলা একাডেমীর ফোকলর বিভাগের গবেষক পদে। পরবর্তীতে তত্কালীন পাকিস্তান কাউন্সিলের ঢাকাস্থ শাখার প্রধান নির্বাহী পদে ১৯৬৪ সালে নিয়োগ পেয়েই তিনি তার হবু স্ত্রীকে [দিলারা জামান, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অভিনেত্রী] হুডতোলা রিকশায় নিয়ে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন তার প্রিয় রউফ সাহেবের বাসায়। ৬৮/২ বেচারাস দেউরীর একতলা বাড়িতে, ১৯৬৪ সালের সেই সন্ধ্যায় বরযাত্রীবিহীন বিয়েটির দায় নিয়েছিলেন আমাদের অগ্রজ এবং শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, দিলারার বাবা ছিলেন ডকসাইডের ইঞ্জিনিয়ার, তিনি যদি তার অধস্তন কিংবা শ্রমিকদের দিয়ে নতুন জামাই এবং স্নেহদাতাকে উত্তম মাধ্যমের ব্যবস্থা করেন, ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোক অতোটা নিচে নামতে পারেননি কেননা উভয় পরিবারই শিক্ষিত।
১৯৬৪ বাংলা একাডেমি থেকে ফকরু ভাই পাকিস্তানে কাউন্সিলর আঞ্চলিক পরিচালক হয়ে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ময়মনসিংহ কলেজে এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই শুরু হয়েছিলে তাঁর শিল্পকর্ম বিশেষত তিনি অনুবাদক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ৬০ দশকেই। পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন দেশের বিস্তর লেখকদের কবিতা, গল্প, উপন্যাস বাংলায় অনুবাদ করে লব্ধপ্রতিষ্ঠিত অনুবাদক এবং সৃজনশীল লেখকদের কাতারে নিজেকে দাঁড় করান।
অনুবাদক হিসেবে তাঁকে ২০০৬ সালে বাংলা একাডেমি সম্মানিত করেছিলেন বাংলা একাডেমী পুরস্কারে। ছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের পরিচালক। আমি চাকরি সূত্রে টেলিভিশনে গেলেই ফকরু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতাম। শিল্প-সাহিত্য, অনুবাদ নিয়ে প্রায়শই আলাপচারিতায় মগ্ন হতাম, কবি ফারুক আলমগীরসহ। ফারুক ভাই ছিলেন বিটিভির নিউজের কর্তাব্যক্তি। ফকরু ভাই চলে গেলেন অজানার দেশে জুনের ১২ তারিখে। অসুস্থতার সন্ধিক্ষণে, বিনা টিকিটের যাত্রী হয়ে। পূজাপর্বে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন ‘জাগিতে হবে রে মোহনিন্দ্রা কত না রবে চিরদিন’।
তুব যেতে দিতে হয় সকল যাত্রীকেই। যেতে হবে সেই অজানার দেশেও বিনা টিকিটেই।
লেখক :কবি
