মত্স্য চাষে ধসঃ যা করণীয়

আপডেট : ১৫ জুন ২০১৪, ২১:৩৬
গত ৭ জুন ২০১৪ তারিখে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ময়মনসিংহে পাঙ্গাস ও তেলাপিয়া চাষে ধস’ শিরোনামে খবরটি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ধসের কারণ হিসেবে চাহিদার তুলনায় বেশি মাছ উত্পাদন, রপ্তানির সুযোগ না থাকা এবং উত্পাদন খরচের চেয়ে কম বাজার মূল্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মাছ চাষিরা দিশেহারা এবং অনেকে মাছ চাষ ছেড়ে অন্য খাতে বিনিয়োগ শুরু করেছে। মাছের উত্পাদন চাহিদার তুলনায় বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ সার্বিক বিষয় না বুঝে অসংখ্য নতুন চাষিদের মাছ চাষে অনুপ্রবেশ। তাছাড়া আরও বড় কারণ হলো উপজেলা মত্স্য অফিসের সাথে আগ্রহী বা নবাগত চাষিদের দুর্বল যোগাযোগ এবং সেখানে তৃণমূল পর্যায়ের পরিসংখ্যানের অপ্রতুলতায় স্থানীয়ভাবে বাস্তব পরিকল্পনা প্রণয়নে সক্ষমতার অভাব। কৃষি ক্ষেত্রে উপজেলা কৃষি অফিসকে কেন্দ্র করে অর্ধ-শতকেরও অধিক জনবল তৃণমূল পর্যায়ে কৃষকদের ধান বা অন্যান্য ফসলের উত্পাদন ও বাজার চাহিদা সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে বাত্সরিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে অনেকটা বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তার জনবল সে তুলনায় একেবারেই সংখ্যালঘু (৫-৬ জন) এবং চাষি পর্যায়ে কাজ করার মত তেমন জনবল নেই বললেই চলে। এরকম অল্পসংখ্যক জনবল দ্বারা সকল মাছ চাষিদের তথ্য সংগ্রহ করে টেকসই পরিকল্পনা প্রণয়ন সহজ কাজ নয়। তাই চাষিদের দোড়গোড়ায় প্রায়োগিক সেবা প্রদানের জন্য মত্স্য অধিদপ্তরের ইউনিয়ন পর্যায়ে সহযোগী কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি করে জনবল বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। মাছের রপ্তাণি বাজার প্রতিযোগিতামূলক, সেখানে প্রবেশ করতে গেলে মূল্য সংযোজনের বিকল্প নেই। আমাদের স্বাদুপানির মাছ উত্পাদনে স্থানীয় ও আমদানিকৃত নিম্নমানের খাদ্যের ব্যবহার, নিয়ন্ত্রণহীন রাসায়নিক ও এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ, পুকুরের পানির গুণাগুন রক্ষায় চাষিদের অসচেতনতা ইত্যাদি কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল-স্রোতে অনুপ্রবেশ সম্ভব হচ্ছে না। প্রবাসি বাঙ্গালিদের কথা বিবেচনা করে এ ধরনের রপ্তানি বাজার তৈরি হতে পারে, কিন্তু তা অনেক দেশে অনুমোদনযোগ্য হবে না এবং বাজারের আকারও ততটা বড় হবে না। বিপরীতে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বাজারে মাছের মূল্য সংযোজনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। শহরমুখী জনস্রোতের কারণে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ এখন নগরবাসী, সেখানে প্রতিদিন কর্মব্যস্ত পরিবারের সদস্যদের পক্ষে রান্না করে খাওয়া এক কঠিন বাস্তবতা। মাছে-ভাতে বাঙ্গালির খাদ্য তালিকায় প্রতিদিন মাছ থাকা কোন সমস্যা না, যদি রান্নাটা হয় বাঙ্গালি কায়দায়। এক্ষেত্রে মাছের দেশীয় পণ্য যেমন মাছের ভর্তা, ভাজা, দো-পেঁয়াজো, বা কোক্ড ফিস ও ভাতের হিমায়িত প্যাকেট বাজারজাতকরণের এক বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। এর দ্বারা বিশাল ফুড-সার্ভিস ভ্যালু-চেইন সৃষ্টির মাধ্যমে একদিকে আভ্যন্তরীণ বাজারে মাছের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে মত্স্য চাষিদের অধিক মুনাফা অর্জিত হবে ও ভ্যালু-চেইনে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে এবং অন্যদিকে ফুড-সার্ভিস গ্রহণকারী ভোক্তাদের কর্মক্ষেত্রে সময়ের অপচয় কমে যাবে। থাইল্যান্ডের সর্বত্র শহুরে রাস্তাগুলোতে সেভেন ইলেভেন নামক দোকানে (সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা) ফুড-গ্রেড প্যাকেটে লাঞ্চ বা ডিনারের জন্য ভাত ও মাছের তরকারি (যেমন তেলাপিয়া ও চিংড়ির ঝোল) পাওয়া যায়। কর্মজীবী মানুষেরা দুপুরের খাবারের সময় চট করে একটি প্যাকেট নিয়ে লাঞ্চ সেরে সময়মত কাজে ফিরে যায়। এরকম ভাত ও মাছের রেডি ফুড-সার্ভিস তৈরিতে দেশীয় উদ্যোক্তা সৃষ্টি হতে পারে এবং তাদের আধুনিক স্বাস্থ্যসম্মত রেস্টুরেন্ট নির্মাণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা প্রয়োজন। মাছ চাষের জন্য সবচেয়ে ব্যয়বহুল উপকরণ হচ্ছে মাছের খাদ্য। সাধারণ হিসাবে ১ কেজি মাছ উত্পাদনে কমপক্ষে ২ কেজি খাবারের প্রয়োজন পড়ে। বর্তমানে ২ কেজি খাবারের দাম প্রায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা। এক কেজি মাছ উত্পাদনে খাদ্য, বিদ্যুত্, শ্রমিক ও অন্য খরচসহ প্রায় ১০০ টাকা ব্যয় হয়। বর্তমানে ১ কেজি মাছ ফার্ম-গেট মূল্য ৮০ টাকায় বিক্রি করে চাষির নিট ক্ষতি প্রায় ২০ টাকা। এ অবস্থায় চাষি না পারছে পুকুরের মাছকে খাওয়াতে না পারছে বিক্রি করতে এবং পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে অনেকে। কৃষির সাথে তুলনা করলে এক্ষেত্রে সরকারের দায় অনেকখানি। গত ২০১৩-১৪ বাজেটে মাছ, চিংড়ি ও গবাদি পশুর পিলেট খাদ্য উত্পাদন খাতের আয়ের উপর কর আরোপের হার বহুলাংশে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে মত্স্য চাষি পর্যায়ে সরাসরি এর কোন প্রভাব পড়েনি। এ বাজেটে (২০১৪-১৫) পোল্ট্রি ও গবাদি পশুর খাদ্যোপকরণ আমদানিতে শুল্ক পুরোপুরি মওকুফের প্রস্তাব করা হয়েছে। পোল্ট্রি, গবাদিপশু ও মত্স্য খাদ্যোপকরণ একই হওয়াতে মত্স্য খাদ্যে বাজেটের চাষি বান্ধব প্রভাব পড়ার কথা, কিন্তু চাষিরা এতে কোন ভরসা পাচ্ছে না। ওয়াল্ডফিসের (২০১৩) এক গবেষণায় দেখা যায়, মত্স্য চাষির ক্রয়কৃত ১০০ টাকার খাদ্যের প্রায় ৭৩ টাকা হলো কাঁচামালের মূল্য। অবশিষ্ট ২৬ টাকার মধ্য যথাক্রমে কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকারী, ফিড মিল এবং ফিড ডিলার ১৬, ৫ এবং ৬ টাকা মূল্য সংযোজন করে থাকে। মত্স্য খাদ্যোপকরণ আমদানিকারক, প্রক্রিয়াজাতকারী, খাদ্য প্রস্তুত এবং সরবরাহকারী সরাসরি লাভবান হচ্ছে, কিন্তু চাষিরা রয়েছে বহুদূরে। পুকুরে ১০০ টাকার খাবার প্রয়োগ করার পর চাষির উত্পাদিত মাছ বিক্রি করে ১০০ টাকা উঠে আসবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা নেই বরং মুনাফা হাতিয়ে দিচ্ছে অন্যরা। আমদানি নির্ভর মত্স্য খাদ্যোপকরণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে প্রয়োজনীয় উপকরণ হলো প্রোটিন সমৃদ্ধ ফিস মিল, মিট এন্ড বোন মিল এবং সয়াবিন মিল। অন্যান্য খাদ্যোপকরণ যেমন, খৈল, চালের কুড়া, গমের ভূষি, ভুট্টা ইত্যাদির আভ্যন্তরীণ সরবরাহ থাকলেও অনেকাংশে আমদানি করতে হয়। এ বজেটে কৃষি ভর্তুকির অধিকাংশই সার আমদানিতে ব্যবহার হবে (সমকাল, ৭ জুন ২০১৪), কিন্তু মত্স্য চাষে এর ইতিবাচক প্রভাবের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই আমদানিনির্ভর মত্স্য খাদ্যের জন্য ভর্তুকি প্রদানে এ বাজেটে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের করণীয় রয়েছে। মাননীয় মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীর নিকট মত্স্য চাষিরা সেরকম চাষি-বান্ধব ভূমিকা প্রত্যাশা করে। লেখক: প্রফেসর, একোয়াকালচার বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় Email: mmhaque1974¦yahoo.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন