গত মাসে একটি খবর বিশ্বে খুব আলোড়ন তুলেছিল। খবরটি বিশ্বের শীর্ষ গণমাধ্যমে খুবই গুরুত্ব পেয়েছিল। সেটি হলো তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) বিভক্ত হয়ে গেছে। বিশ্লেষকরাও মনে করেছিলেন, এবার বুঝি দুর্বল হয়ে পড়লো তারা। বড় ধরনের কোনো হামলা চালানো তাদের দ্বারা হয়তো আর সম্ভব হবে না। খুশি হয়েছিল পাকিস্তানও। কারণ এই বিভক্তির পেছনে পাকিস্তান সরকারের হাত আছে বলে মনে করা হয়। কিন্তু সব খুশি এবং সবার ধারণাকে ম্লান করে দিয়ে বড় ধরনের এক হামলা করে টিটিপি তাদের ভয়ঙ্কর রূপটি বিশ্বের কাছে তুলে ধরলো। জানিয়ে দিল তারা কোনোভাবেই দুর্বল নয় এবং বিভক্ত হলেও করাচি বিমানবন্দরের মতো নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘেরা স্থানে হামলার সক্ষমতা তাদের আছে। কিন্তু কেন করাচিকে টার্গেট করা হলো এবং আসলে এর পেছনে কারা আছে তাই খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
করাচি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যেটি (জিন্নাহ বিমানবন্দর নামে পরিচিত) দেশটির বৃহত্ বিমানবন্দর। করাচির মতো স্থানে হামলা এই প্রথম নয়। এর আগেও হয়েছে। ২০১১ সালে করাচির নৌঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল টিটিপি এবং ১০ জন সেনা সদস্যকেও হত্যা করেছিল। এর আগে রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দফতরে এবং পেশোয়ারের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলা চালায় জঙ্গি গোষ্ঠীটি। আর এমন সব গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা করে নিজেদের ক্ষমতার কথা জানানা দিয়েছে তারা। কিন্তু তারপরও পাকিস্তানের দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা সবল হয়নি। গত ৮ জুন মধ্যরাতে করাচি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অজ্ঞাত বন্দুক-ধারীদের চালানো হামলায় ২৯ জন নিহত হয়। হামলাকারী ১০ জনও ওই ঘটনায় প্রাণ হারায়। পরদিন হামলার দায় স্বীকার করে পাকিস্তান তালেবান। হামলাকারীরা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা রক্ষীদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড এবং গুলি ছুঁড়ে হামলা শুরু করে। হামলার পরপরই দেশটির সেনা কমান্ডোরা বিমান বন্দরটি ঘিরে ফেলে এবং আক্রমণকারীদের সাথে গোলাগুলি শুরু হয়। পাকিস্তানের প্রভাবশালী ডন পত্রিকা জানিয়েছে, ফক্কার গেট এলাকা দিয়ে আক্রমণকারীরা বিমানবন্দরে অনুপ্রবেশ করেছিল। বলা হচ্ছে, আক্রমণকারীরা কাঁটাতারের বেড়া কেটে সেখানে প্রবেশ করে। পত্রিকাটি আরো জানায়, হামলাকারীদের কয়েকজন একটি বিমানের ভেতরেও ঢুকে যেতে সমর্থ হয়। ৯ জুন সকালেও আবার হামলা চালায় তালেবান। যদিও সেটা বড় ধরনের কোনো হামলা ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। মার্কিন প্রভাবশালী গণমাধ্যম কেবল নিউজ নেটওয়ার্ক (সিএনএন) জানায়, পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী ফেডারেল মন্ত্রীরা পর্যটন এবং বিমানবন্দরের প্রশাসনিক ব্যবস্থার দেখভাল করবেন। কিন্তু ওই হামলার পর কোথাও কাউকে দেখা যায়নি। এমনকি সেনা অভিযানের অগ্রগতি সম্পর্কে টুইটারের মাধ্যমে জানিয়েছেন সেনাবাহিনী ইন্টার সার্ভিস পাবলিক রিলেসনস’র (আএসপিআর) একজন মেজর জেনারেল। আর এর মাধ্যমে দেশটির সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের একটা সুস্পষ্ট বার্তা পেল বিশ্ব। লাহোরের নিরাপত্তা ভাষ্যকর হাসান আসকারি রিজভীও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, এমন একটি স্থানে কিভাবে এতগুলো হামলাকারীরা প্রবেশ করতে পারলো? তিনি বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের কার্যক্রম আরো সমন্বিত হতে হবে যা এধরনের হামলা থেকে পাকিস্তানকে রক্ষা করতে পারে।
টিটিপি’র সঙ্গে সমঝোতা
করাচি বিমানবন্দরে হামলার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে পাকিস্তানে বেসামরিক এবং সামরিক নেতৃত্ব টিটিপির সঙ্গে সমঝোতা করার উপায় খুঁজছিল। যদিও অনেক আগে থেকেই এই চেষ্টাটি চলে আসছিল। কিন্তু সেটা মাঝপথে এসে আটকে গেছে বারবার। সমঝোতার একটি কারণও আছে। তাহলো বেসামরিক নাগরিকরা টিটিপির ভয়ঙ্কও হামলায় ভীত হয়ে পড়েছে। প্রতিনিয়ত তারা এই হামলার সম্মুখীন হচ্ছেন। আর সামরিক বাহিনীও চায়- তাদের আর কোনো সৈন্য যাতে নিহত না হয়। সামপ্রতিক বছরগুলোতে টিটিপি’র হামলায় জেনারেলসহ পাকিস্তানের ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার সেনাসদস্যকে অকালে জীবন দিতে হয়। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে তিনটি যুদ্ধ (১৯৬৫, ১৯৭১ এবং ১৯৯৯) হয়েছে পাকিস্তানের। কিন্তু এতো সৈন্য মারা যায়নি। আর তাইতো গত বছরের নভেম্বরে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেয়ার পর টিটিপিকে সামালানোর একটা বার্তা দিয়েছিলেন জেনারেল রাহিল শারীফ।
টিটিপি কী দুর্বল?
গত বছরের নভেম্বর মার্কিন ড্রোন হামলায় টিটিপির শীর্ষ নেতা হাকিমুল্লাহ মেহসুদ নিহত হন। এরপর জঙ্গি গোষ্ঠীটি এর প্রতিশোধ নেয়ার অঙ্গীকার করে। কিন্তু এরপর নেতৃত্ব এবং কার্যক্রম নিয়ে জঙ্গি গোষ্ঠীটির মধ্যে একটা বিরোধ দেখা দেয়। হাকিমুল্লাহ মেহসুদের অনুগত আজম তারিক নামের এক মুখপাত্র গত মাসে এক বিবৃতিতে জানান, তারা মনে করেন জনসম্মুখে হামলা, চাঁদাবাজি এবং অপহরণ ইসলাম সম্মত নয়। এটি অবৈধ। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসলামপন্থির এই গোষ্ঠীটির মধ্যে এটা বড় ধরনের পরিবর্তন। তবে এর মানে এই নয় যে, সহিংসতা সৃষ্টিতে তারা দুর্বল হয়ে পড়লো। বিভক্ত হয়ে যাওয়া এই অংশের নেতৃত্ব দেবেন খালিদ মেহসুদ। যিনি ‘খান সাঈদ সাজনা’ নামে পরিচিত। পাকিস্তানের আফগান সীমান্তের দক্ষিণ ওয়াজিরিস্থানের নেতা তিনি। পাকিস্তানি থিংক ট্যাংক জিন্নাহ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো রাজা রুমি মনে করেন, খালিদ মেহসুদ হয়তো ২৬শ’ উপজাতির নেতৃত্ব দেবেন। টিটিপির মোট শক্তির অর্ধেক। সঠিক সংখ্যাটি বলা সম্ভব নয় বলেও মত দেন রাজা রুমি। হাকিমুল্লাহ মেহসুদ নিহত হওয়ার পর নেতৃত্ব আসে মুল্লাহ ফজলুল্লাহর হাতে। তিনি সোয়াত উপত্যকার নেতা। এই প্রথম টিটিপির কোনো নেতা ‘মেহসুদ’ উপজাতির বাইরে থেকে আসলেন। এজন্য গোষ্ঠীটির আভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় গভীর মনোযোগ দিয়েও নিজেদের ঐক্যবদ্ধতা ধরে রাখতে পারেননি ফজলুল্লাহ।
তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের বিভক্তির ক্ষেত্রে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সফলতা আছে বলে মনে করা হয়। ওয়াশিংটন ভিত্তিক ইউএস ইনস্টিটিউট অব পিস’র দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক মোয়ীদ ডাব্লিউ ইউসুফ জানিয়েছেন, টিটিপি’র বিভক্তিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্বাগত জানানোর বিষয়। তারা কৌশলে টিটিপি’র আধুনিক অংশটিকে বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছে। যদিও সেনাবাহিনী তাদের এই পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেনি। টিটিপি’র কয়েকটি অংশ আছে যারা পাকিস্তানে কোনো ধরনের হামলা করতে চায় না। বিনিময়ে উপজাতি অধ্যুষিত এলাকা শাসনের অধিকার চায় তারা। কিন্তু ফজলুল্লাহর গ্রুপ চায় যেকোনোভাবেই হোক পাকিস্তানে শরীয়াহ আইন চালু করতে। এই দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের জিহাদি কার্যক্রম বন্ধ করবে না। এ জন্যই তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালায়-জানান রুমি। তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি টিটিপি’র সঙ্গে সরকারের যে আলোচনা শুরু হয়েছে তার একটা সফলতার দাবি করতে পারে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইন্টিলিজেন্স (আইএসআই)। পাকিস্তান তালেবানের ‘মেহসুদ’ অংশটি পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুভাবাপন্ন। তাদের পাকিস্তানের ক্ষমতা নেয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। তারা এই হামলার মাধ্যমে পাকিস্তানের বড় ধরনের কোনো ক্ষতি না করতে না পারলেও বিশ্ব গণমাধ্যমের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন এবং জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা বিভক্ত হলেও তার শক্তি কিংবা সামর্থ্য কোনোটাই কমেনি।
কেন এই হামলা এবং করাচি কেন টার্গেট
টিটিপি’র অন্যতম মুখপাত্র শাহিদুল্লাহ শাহিদ বিমানবন্দরে হামলার পর জানিয়েছিলেন, ঘটনাটি ছিল পাকিস্তানের সরকারের উদ্দেশে একটি বার্তা যার মাধ্যমে জানানো হচ্ছে যে বিভিন্ন গ্রামে বোমা হামলার মাধ্যমে যে সব নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে তার জবাব দিতে আমরা এখনো প্রস্তুত আছি। তিনি আরো বলেন, হাকিমুল্লাহ মেহসুদ নিহত হওয়ার প্রতিশোধ এটি। রাষ্ট্রের বড় ধরনের এমন একটা প্রতিষ্ঠানে হামলার সময় জঙ্গিরা আত্মঘাতী হামলার সমস্ত উপকরণই পরিধান করে আসে। তারা সঙ্গে খাবারও নিয়ে আসছিল। ডন জানিয়েছে, এমন প্রস্তুতিতে বিমানবন্দরে তাদের দীর্ঘমেয়াদে অবস্থানের পরিকল্পনা ছিল বলে মনে করছে দেশটির সেনাবাহিনী। বিবৃতিতে হামলার বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেটি হলো- করাচি বিমানবন্দর দিয়ে ইউএস-ন্যাটোর কার্গোগুলো চলাচল করে এবং বাহিনীকে খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হয়। এটা বন্ধ করার জন্যই এই হামলা। হামলার শিকার টার্মিনালটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটের জন্য ব্যবহূত হতো না, এখানে কেবল কার্গো পরিবহন এবং ভিআইপি ফ্লাইট চলাচল করতো।
সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল তালাত মাসুদ সিএনএনকে বলেন, এই হামলার উদ্দেশ্য কেবল এসবই নয়। তার মতে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করারও একটা চেষ্টা আছে। বিমানবন্দরে হামলার মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, আপনারা করাচি বিমানবন্দরে আসবেন না। তিনি স্মরণ করেন ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের ওপর তালেবানের হামলার কথা। ক্রিকেট দলটির হামলার পর আর কোনো বিদেশি ক্রিকেট দল নিরাপত্তার অজুহাতে পাকিস্তান সফর করতে চায়নি। তিনি আরো স্মরণ করেন, ২০১৩ সালের ২৩ জুন ১০ জন বিদেশিকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ডের কথা। এসব করার মাধ্যমে পাকিস্তানের নেতিবাচক ভাবমূর্তিই বিশ্বের কাছে তুলে ধরা হয়েছে বলে মনে করেন তালাত মাসুদ। রাজা রুমির মতে, টিটিপি চায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ থেকে সরে আসুক পাকিস্তান। এসব হামলা পাকিস্তান সরকারকে চাপে রাখার কৌশল।
হামলায় বিদেশি জঙ্গি?
বিমানবন্দরে জঙ্গি হামলায় সেনাবাহিনীর অভিযানের নেতৃত্বদানকারী মেজর জেনারেল রিজওয়ান আকতার জানান, হামলায় উজবেক জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতা আছে। আপাতত চেহারা দেখে সেটাই মনে করা হচ্ছে। তবে সত্যটা জানা যাবে নিহত জঙ্গিদের ডিএনএ পরীক্ষার পর। এই উজবেক জঙ্গিদের হামলায় জড়িত থাকার বিষয়টি এবারই নতুন নয়। এর আগেও তারা সমন্বিত হামলা করে নিজেদের সামর্থ্যের স্বাক্ষর রেখেছে। টিটিপি বহুদিন ধরেই ইসলামিক মুভমেন্ট অব উজবেকিস্তান (আইএমইউ) জঙ্গি গোষ্ঠীর সমর্থন পেয়ে আসছে। তারা আফগান তালেবানের সঙ্গে যুক্ত। আফগানিস্তানে তালেবানের পতনের পর এই গ্রুপটি আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের মধ্যবর্তী ওয়াজিরিস্থানে ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। এখানে চীনের উইঘুর সম্প্রদায়ের জঙ্গিরাও আশ্রয় নিয়ে আছে। ২০০৯ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিজেদের নেতা তাহির উেসভ নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানে হামলা শুরু করে উজবেক জঙ্গি গোষ্ঠী। এরা সংঘবদ্ধ হয়েই বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর সাবেক কমোডর জালাম হুসেইন বলেন, প্রশাসনের অভ্যন্তরে কাজ করা কোনো কর্মকর্তার সহায়তা ছাড়া এমন সমন্বিত হামলা করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়।
