ইরাকে ক্ষমতার রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব এর আগে কখনই এতটা প্রকট হয়নি। এমনকি সাদ্দাম হোসেনের সময়কালেও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এতটা চড়া মূল্য দিতে হয়নি ইরাকের মানুষকে। সুন্নী চরমপন্থিদের উত্থানে ভয়াবহ এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে তারা মসুল ও তিকরিতসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নগরী দখল করে নিয়েছে। সহিংসতার কারণে তিকরিত, সামারা ও মসুলে ঘরছাড়া হয়েছে অন্তত পাঁচ লাখ চল্লিশ হাজার মানুষ। এসব এলাকা থেকে মার্কিন সেনাদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইরাকি সেনারাও পালিয়ে গেছে। রক্ত নিয়ে যেন চলছে নৃশংস হোলি খেলা! একপক্ষের হাতে নির্দয়ভাবে মারা পড়ছে প্রতিপক্ষ। চরমপন্থিদের গতি এখন বাগদাদের দিকে। সুন্নী বিদ্রোহীদের এই উত্থানকে একই সুরে জঙ্গিবাদ বলছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরাকের এই পরিস্থিতির জন্য বিশ্ব গণমাধ্যমে চলছে নানামুখী আলোচনা বিশ্লেষণ।
শিয়া-সুন্নী বিরোধ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নয়। ইরাকের শিয়াদের সংখ্যাগরিষ্ঠদের কাফের ঘোষণা দিয়ে ভারি অস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে রক্তাক্ত লড়াইয়ে নেমেছে সুন্নী চরমপন্থিরা। তাদের সংগঠনের নাম- ‘ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড লিভ্যান্ট’, সংক্ষেপে ‘আইএসআইএল’। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আগ্রাসন চলাকালে কট্টরপন্থি এই সংগঠন ইরাকে বিস্তার লাভ করে। আইএসআইএস বাহিনীতে সাদ্দাম শাসনামলের সেনা কর্মকর্তারাও রয়েছেন। দলের শীর্ষ নেতা আবু বকর আল বাগদাদী, যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল কৌশলী কমান্ডার হিসেবে খ্যাত। তবে তার সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। বর্তমানে আইএসআইএলের কোন আঞ্চলিক সীমারেখা নেই। আইএসআইএলের সদস্যরা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধেও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট আসাদ এক শিয়া ধর্মাবলম্বী এবং ইরানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর এ কারণেই ইরাকে সুন্নী চরমপন্থিদের উত্থান গোটা ঐ অঞ্চলের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। তবে লক্ষণীয় যে, সিরিয়ায় যে দল যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সাহায্যপুষ্ট, ইরাকে সেই দলের উত্থানকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কিভাবে সামাল দেয়।
সাদ্দামের পতনের পর সুন্নী সংখ্যালঘুদের আধিপত্য ও কর্তৃত্বও শেষ হয় ইরাকে। অনেকে অভিযোগ করেন, শিয়াপন্থি প্রধানমন্ত্রী নূরি আল মালিকির সরকারের সময় একেবারেই কোণঠাসা বা দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে সুন্নীদের। কর্তৃত্ব হারানোর যাতনার মধ্যে আইএসআইএলের জন্ম বলে মনে করছেন অনেকে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সাদ্দাম শাসনামল আর সাদ্দাম পরবর্তী সময়ের বাস্তবতা এক নয়। সাদ্দামের সময়কালে যে কারণে ইরাকের সাথে ইরানের শত্রুতা ছিলো। একই কারণে এখন বাগদাদ তেহরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু। ইরাকে সুন্নী বিদ্রোহীদের উত্থানে তাই সবচেয়ে বেশি নড়েচড়ে বসে ইরান। সুন্নীপন্থি সাদ্দাম হোসেন পরবর্তী ইরাক সরকারের শিয়া নেতাদের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রক্ষা করে আসছে ইরান। গত দশ বছর ধরে ইরান যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে বাগদাদে তেহরানপন্থি সরকার প্রতিষ্ঠার। সেই জায়গায় সুন্নী বিদ্রোহীদের বন্দুক হাতে বাগদাদমুখী অভিযাত্রাকে চরম হুমকি বলে মনে করছে ইরান। কারণ সুন্নীরা সফল হলে ইরানের এক দশকের পরিশ্রম মাটি হয়ে যেতে পারে। আর এ কারণেই ইরাকে সুন্নী গেরিলাদের উত্থান ইরানের মাথাব্যথার বড় কারণ।
সুন্নী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাই বাগদাদকে সব ধরনের সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়েছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার একবছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ইরাক সরকার চাইলে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সব ধরনের সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছে ইরান। এমনকি এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে কাজ করতেও আপত্তি নেই তেহরানের। তবে ইরাকে গোপনে কমান্ডো বাহিনী পাঠানোর কথা অস্বীকার করেন প্রেসিডেন্ট রুহানি। অবশ্য বিবিসি জানিয়েছে, ইরানের রেভ্যুলুশন গার্ডের ১৩০ জন সদস্যকে বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে ইরাকে পাঠানো হয়েছে। এক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বিপ্লবী বাহিনীর সদস্যদের অ্যাসাইনমেন্ট হলো সামরিক প্রশিক্ষণ ও কৌশল বাতলে দেয়া। ইরানের কুদস বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার জেনারেল কাশেম সুলায়মানি এখন বাগদাদে অবস্থান করছেন। সেখানে তার উদ্দেশ্য বাগদাদ এবং উত্তরাঞ্চলীয় পবিত্র নগরী সামারার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কাজে সার্বিক সাহায্য করা। এছাড়াও সুলায়মানির আরো একটি অ্যাসাইনমেন্ট রয়েছে বলে বিবিসি জানিয়েছে, তা হলো, ইরাকের শিয়া গেরিলা গ্রুপগুলোকে সংগঠিত করা। অন্যদিকে, ইরান তার বাহিনীকে দু’টি ভাগে বিভক্ত করে সীমান্ত এলাকায় পাহারা জোরদার করেছে। ইরানের সবচেয়ে সিনিয়র শিয়া ধর্মীয় নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলী আল সিস্তানি সুন্নী গেরিলাদের বিরুদ্ধে শিয়াদের অস্ত্র তুলে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এরই মধ্যে কয়েক হাজার যুবক যোগ দিয়েছে শিয়া গেরিলা দলে। এদিকে, মসুল ও তিকরিত দখলের পর সুন্নী গেরিলারা দক্ষিণে দায়ালা প্রদেশে ধাবিত হয়। যেখানে একই সাথে শিয়া ও সুন্নীদের বাস। এর আগে শুক্রবার বাগদাদের মাত্র আশি কিলোমিটার দূরে মুকদাদিয়া এলাকায় শিয়া ও সুন্নী গেরিলাদের সাথে ব্যাপক বন্দুকযুদ্ধ হয়। শিয়া গেরিলা ও ইরাকি সেনাবাহিনী সামারায় সুন্নীদের বিরুদ্ধে একসাথে লড়াইয়ে নামার পরিকল্পনা নিয়েছে। যেখানে উত্তরদিক থেকে ঢোকার চেষ্টা করছে সুন্নীরা। গত শনিবার নূরি আল মালিকি সামারা সফর করেন। সেখানে তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় শিয়াদের উস্কে দিয়ে বলেন, সুন্নী সন্ত্রাসবাদ শেষ করার শেষ যুদ্ধ এটা।
বর্তমান ইরাক প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখনও স্পষ্ট নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ইরাক ইস্যুতে কি ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে তা ঠিক করতে আরো কিছুদিন লাগবে। তবে ইরাকে কোন সৈন্য পাঠানো হবে না বলে নিশ্চিত করেন তিনি। জানা গেছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ওয়াশিংটন। এমনকি ইরাক সহিংসতাকে কেন্দ্র করে নানাজনের সমালোচনা ও বিশ্লেষণও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কারণ ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের ভিত্তি নিয়ে রয়েছে বিভিন্নমুখী সমালোচনা। বলা হয়েছিলো, সাদ্দাম হোসেনের কাছে রয়েছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র। কিন্তু আট বছর ধরে গোটা ইরাকে সে ধরনের কোন অস্ত্র ভান্ডারের সন্ধান পায়নি যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী। উল্টো ইরাক আগ্রাসন এবং এর পরবর্তী সময়ে সহিংসতায় মারা পড়ে কয়েক লাখ মানুষ। তবে আগ্রাসনের কারণে বর্তমান ইরাক পরিস্থিতি অভিযোগ অস্বীকার করেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। ওয়েব সাইটে এক নিবন্ধে তিনি এই অভিযোগকে অদ্ভুত বলে ব্যাখ্যা করেন। ইরাকের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সিরিয়ার আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়াকে দায়ী করেন টনি ব্লেয়ার।
