ভারতের ১৬তম লোকসভা নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পট পরিবর্তনের নির্বাচন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জোটবদ্ধ সরকারের ধারার পরিবর্তন হয়েছে! একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে উঠে এসেছে ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি। আর স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো এই নির্বাচনে বড় পরাজয় দেখেছে দেশটির সবচেয়ে পুরানো দল কংগ্রেস। শুধু পরাজয় নয় অল্পের জন্য ধরে রাখতে পেরেছে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের মর্যাদা। এবারের নির্বাচনে তারা এককভাবে পেয়েছে মাত্র ৪৪টি আসন।
অন্যদিকে, বিজেপির ইতিহাসে এবার তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছে। যদিও তারা জোটেই সরকার গঠন করেছে। নির্বাচনে ভারতের আঞ্চলিক দলগুলো সকলে ভালো করতে না পারলেও পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ও তামিলনাড়ুর জয়ললিতা ধারণার চেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। আর বিজেপি তাদের এনডিএ জোটের শরিকদের নিয়ে বলা চলে এ দুটির রাজ্যের বাইরে কংগ্রেসের ঘাঁটিগুলোতে হানা দিয়েছে। যে কারণে ধারণার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ করেছে কংগ্রেস। এতটাই খারাপ করেছে যে এবার তারা পার্লামেন্টে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পাচ্ছে না। তাই ভারতের ১৬তম লোকসভায় থাকছে না কোনো বিরোধীদলীয় নেতাও। তবে সমপ্রতি সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসকে বিরোধী দলের মর্যাদা দেয়ার জন্য স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অনুনয় করে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠিও লিখেছেন। স্পিকার তাতে কর্ণপাত করবেন কি না সেটা দেখার অপেক্ষায় সবাই।
ভারতের পার্লামেন্টের আইন অনুযায়ী প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেতে হলে লোকসভার মোট আসনের ১০ শতাংশ আসন পেতে হবে। অর্থাত্ কমপক্ষে ৫৫টি আসন পেতে হবে প্রধান বিরোধীদলের। অথচ কংগ্রেস এককভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৪টি আসন পেয়েছে। গত ২৬ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিজেপির নরেন্দ্র মোদী শপথ গ্রহণের পর বলা হয়েছিলো পার্লামেন্টের নিয়ম ও রীতিনীতি পর্যালোচনা করেই কংগ্রেসকে প্রধান বিরোধীদলের মর্যাদা দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। ভারতের পার্লামেন্টে বিরোধীদলীয় নেতা না থাকার ঘটনা নতুন নয়। এর আগে কংগ্রেসের জওহরলাল নেহরু ও রাজীব গান্ধীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় কোনো বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন না।
তবে এবার লোকসভার ডেপুটি স্পিকার, সরকারি হিসাব-সম্পর্কিত কমিটি, কমিটি অব পাবলিক আন্ডারটেকিংস এবং অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রধানের পদ বিরোধী দলগুলোকে ছেড়ে দেবে বলে জানিয়েছে সরকার। কংগ্রেস, এআইএডিএমকে, তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজু জনতা দলের মধ্যে এ পদগুলো ভাগাভাগি হবে। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজেপি সরকারের জন্য বিরোধীদল নিয়ে কোনো ভীতিই থাকছে না। বিজেপির এই বিপুল জয় ভারতের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ প্রভাব ফেলতে পারে। সবার আগে এ অবস্থানে থাকার জন্য বিজেপি কিছু নতুন আইন সহজেই পাস করিয়ে নিতে পারবে। যা বিগত দুই মেয়াদে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার পারেনি।
ভারতের সাম্প্রতিক এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে বড় পরিবর্তন এসেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। গত ২৫ বছরে আঞ্চলিক রাজনৈতিকগুলো প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। কিন্তু এবার তার ব্যত্যয় ঘটেছে। অনেকেই বলছেন, এ নির্বাচনের মাধ্যমে ভারতে জোট সরকারের ধারা শেষ হয়ে গেছে। তবে অনেকেই এ বক্তব্যের সঙ্গে এক মত নন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক কারনিজ এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের দক্ষিণ এশিয়া প্রোগ্রামের সহযোগী মিলান ভাইশনাভের মতে, ভারতের জোট রাজনীতির পর্ব শেষ হয়েছে এমনটা মনে করা এখনই ঠিক হবে না।
