ছদ্মবেশী মিনিকেট

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৪, ২১:৫৬
মিনিকেট নামক জনপ্রিয় চাউলকে ঘিরিয়া যে প্রতারণার কারবার চলিতেছে, তাহা ক্রমশ স্পষ্ট হইতেছে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদন হইতে জানা গিয়াছে, মিনিকেট নামক যে সরু চাউল ভোক্তারা ক্রয় করিতেছেন তাহার এক বিরাট অংশই আদৌ সেই রকম কিছু নহে, বরং মোটা চাউলকেই মেশিনের সাহায্যে কাটিয়া-ছাঁটিয়া সরু করা হইতেছে। এইগুলি হইলো বিআর-২৯ এবং বিআর-২৮ নামক চাউলের পরিবর্তিত রূপ। অন্যদিকে প্রকৃত মিনিকেট যাহা আছে তাহার প্রকৃত নাম আবার মিনিকেট নহে, ভারতের শতাব্দী নামক এক ধানের জাতকেই মিনিকেট বলিয়া চালাইয়া দেওয়া হইয়া থাকে। দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের চাউলকলের মালিকরাই চাউলের মিথ্যা নামকরণ করিয়া ভোক্তাদিগকে প্রতিনিয়ত ঠকাইয়া যাইতেছেন এবং বিপুল অর্থ কামাইয়া লইতেছেন। তাহা হইলে মিনিকেট নামটি কোথা হইতে আসিল? ইহা জনপ্রিয়ই বা হইলো কেন? আশির দশকের শেষদিকে ভারতের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বোরো মৌসুমে চাষের জন্য সরু জাতের একটি ধানের জাত উদ্ভাবন করে। ইহার নাম দেওয়া হয় শতাব্দী। এই ধান চাষের জন্য বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় কীটনাশক একটি মিনি কিটবক্সে ভরিয়া কৃষকদের সরবরাহ করা হয়। ভারত হইতে বাংলাদেশে আসিতে আসিতে শতাব্দী চাউলটি ‘মিনিকিট’-এর সংশ্লিষ্টতার ইতিহাস হইতে বিবর্তিত হইয়া ‘মিনিকেট’ নাম ধারণ করে। তবে এই জাতটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে আসে নাই। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী যশোরের শার্শা, ঝিকরগাছা ও চৌগাছা, সাতক্ষীরার কলারোয়া, ঝিনাইদহের মহেশপুর, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর ও দামুড়হুদা উপজেলার চাষিরা সীমান্তের ওপারের চাষিদের নিকট হইতে এই ধানের বীজ সংগ্রহ করিয়া এই পাড়ে চাষ শুরু করে। বোরো মৌসুমে আমাদের দেশে তখন কোনো সরু ধানের জাত না থাকায় ব্যাপক পরিচিতি পায় তথাকথিত মিনিকেট চাউল। সরু চালের কারণে ভোক্তাদের নিকট এই চালের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। ১৯৯১ সালে শুরু হইবার পর ক্রমশ এই ধানের চাষ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ যথেষ্ট না থাকায় মোটা চাউলকেই কাটিয়া-ছাঁটিয়া বাজারে সরবরাহের অসাধু প্রক্রিয়া শুরু হয়। সাধারণত ধানের পুষ্টিগুণের অনেকখানিই থাকে ইহার বহিঃস্থ স্তরে। মোটা চাউলকে কাটিয়া ফেলার পর ইহা কেবল উচ্চদরেই বিক্রি হইতেছে না, প্রকৃত মোটা চাউলের পুষ্টিগুণও হ্রাস পাইতেছে। এই অসাধুতা ও প্রতারণার বিহিত হওয়া দরকার। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে এইক্ষেত্রে সচেষ্ট হইতে হইবে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীবৃন্দের অসাধুতার সীমা-পরিসীমা নাই। বিশেষত খাদ্য ও ঔষধে ভেজাল ও প্রতারণার কোনো ক্ষমা হয় না। কারণ ইহা কেবল লোক ঠকানোর বিষয় নহে, একটি জাতিকে ক্রমশ পুষ্টিহীনতা ও অসুস্থতার দিকে ঠেলিয়া দিবার মতো বড় অপরাধ কমই হয়। আর ভোক্তাসাধারণকেও অধিক সচেতন হইতে হইবে। মিনিকেট চাউলকে পুরাপুরি বর্জন একটা উপায় হইতে পারে। আমাদের ভোক্তা-আচরণে অধিক বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করিতে হইবে। এমন নহে মিনিকেট চাউল লইয়া প্রতারণার ব্যাপারটি প্রথম শোনা গিয়াছে। লোকমুখে এই কথাটি যথেষ্ট প্রচার ইতোমধ্যে হইয়া গিয়াছে। কিন্তু পরিস্থিতি একই রকম থাকিয়া যায়। কারণ আমাদের সচেতনতা কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ থাকে। অন্যদিকে আমাদের এত ভালো ভালো ধানের জাত থাকিতে ভারতীয় একটি জাত লইয়া দ্বিধায় পড়িবার দরকারই বা কী? আমাদের দরকার মিনিকেট চাউলের সমস্যাকে অধিক হারে জনসম্মুখে আনা এবং ক্রমশ ইহাকে অজনপ্রিয় চাউলে পরিণত করা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন