থাইল্যান্ডের ‘হ্যাপিনেস ক্যাম্পেইন’

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৪, ২১:৫৬
থাইল্যান্ডের ফুটবলপ্রেমীদের নিখরচায় বিশ্বকাপ উপভোগের পাকা ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছে সামরিক সরকার। জাতীয় টেলিভিশন সমপ্রচার কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশও দেওয়া হইয়াছে। থাইল্যান্ডে এই খেলা দেখানোর স্বত্ব কিনিয়াছে আরএস ব্রডকাস্টার। তাহারা চ্যানেলের মাধ্যমে এক-তৃতীয়াংশ খেলা এমনিতেই বিনা খরচে দেখানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছিল। তবে সবগুলি খেলা দেখিতে আগ্রহীদের একটি ডিকোডার কিনিতে হইত। এই ডিকোডারের মূল্য বেশি হওয়ায় অনেক গরীব মানুষই গুরুত্বপূর্ণ অনেক খেলা দেখার সুযোগ হইতে বঞ্চিত হইত। এই সুযোগই গ্রহণ করিয়াছে নূতন থাই জান্তা সরকার। এখন সরকারের গৃহীত ব্যবস্থায় সবাই সব খেলা উপভোগ করিতে পারিবে। এজন্য আরএস ব্রডকাস্টারকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে সরকার দিবে ২ কোটি ১৫ লক্ষ ডলার। ইহাতে জনগণ ও টিভি স্বত্বাধিকারী যেমন খুশি, তেমনি সবাইকে খুশি করিতে পারিয়া সরকারও খুশি। শুধু বিনা পয়সায় ফুটবল খেলা দেখানো নহে, তাহাদের নির্মল আনন্দ দিতে শুরু করিয়াছে সেনাবাহিনীর চৌকস নারী সদস্যরা। তাহারা ব্যাংককের রাস্তায় রাস্তায় নৃত্য সহযোগে সঙ্গীত পরিবেশন করিতেছে। ইহাছাড়া নাগরিকদের বিনা খরচে চুল ছাঁটিয়া দেওয়ারও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইয়াছে। থাই জনগণের সুখের জন্য আর কী চাই? এইসব কর্মকাণ্ডের গালভরা নাম দেওয়া হইয়াছে হ্যাপিনেস ক্যাম্পেইন। এ যেন ধন্য রাজার পুণ্য দেশ। হ্যাপিনেস ক্যাম্পেইনের আওতায় থাই জান্তা সরকার যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে, তাহা চিত্তাকর্ষক ও জনপ্রিয়ই বটে। সমপ্রতি থাইল্যান্ডে যে সাধারণ নির্বাচন হয়, তাহাতে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার দলই জয়লাভ করে। এই নির্বাচন বয়কট করে বিরোধী দল। তাহারা নির্বাচন বানচাল করিবার নানা চেষ্টা করার পরও সফল হয় নাই। থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে প্রধান দুই পক্ষের মধ্যে একদিকে আছেন রাজা ও সেনাবাহিনী, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ঝাণ্ডা হাতে আছে থাকসিন পরিবার। নির্বাচনের পর প্রথম পক্ষের উস্কানিতে দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু হয়। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয় কমপক্ষে ২৮ জন। ইহাতেই হুংকার দিয়া ওঠে থাই সেনাবাহিনী। শেষ পর্যন্ত গত মে মাসে তাহারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। শুরু করে দমন-নিপীড়ন। কয়েকদিন আগে সান্ধ্য আইন তুলিয়া নেওয়া হইলেও বিক্ষোভ দমন ও মানবাধিকার লংঘন অব্যাহত আছে। স্বাভাবিকভাবেই থাই জনগণ অস্থির ও অসুখী। তাই তাহাদের সুখী করার সুমহান দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছেন সেনাপ্রধান। দুনিয়ার যেখানেই যখন সামরিক সরকার ক্ষমতাসীন হইয়াছে, সেখানেই দেখা গিয়াছে যে, তাহারা চমক দিবার চেষ্টা করেন। পাকিস্তানে লৌহ মানব আইয়ুব খান ক্ষমতা গ্রহণ করিয়াই দেশব্যাপী শুরু করিলেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান। ইহাতে জনগণ তটস্থ হইয়া পুকুর-ডোবা ও খাল-বিলের কচুরিপানাও পরিষ্কার করিতে লাগিলেন। বাংলাদেশ আমলেও বিভিন্ন সময়ে সামরিক সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ, ফুটপাথ হইতে রাতারাতি হকার উচ্ছেদ, হাট-বাজারের অবৈধ স্থাপনা ভাঙিয়া গুঁড়াইয়া দেওয়া—এমনই আর কত কী না দেখাইয়াছে! যানজটমুক্ত রাজধানী ঢাকা দেখিয়া অনেকে আহ্লাদিত বোধ করিয়াছিলেন বৈকি! কিন্তু কোথাও এইরূপ সুখ বা আহ্লাদ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মোহ ভাঙিতেও সময় লাগে না। দুনিয়ার তাবত্ সামরিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করিয়াই চমক দেওয়ার চেষ্টা করে। এই চমক দেখানোই তাহাদের স্বভাব। ইহাতে সাময়িকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি হয় বটে, কিন্তু সত্য উন্মোচিত হইতে সময় লাগে না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন