২০০৯ সালে, ভারতে নির্বাচনের কিছুদিন বাদে, বিজেপির প্রবীণ নেতা লালকৃষ্ণ আদভানির সঙ্গে দিল্লি বিমানবন্দরের ভিআইপি রুমে কংগ্রেস যুবনেতা রাহুল গান্ধীর হঠাত্ মুখোমুখি দেখা। বিজেপির লৌহমানব বলে পরিচিত আদভানি সস্নেহে সেদিন তাঁকে কাছে টেনে বসিয়েছিলেন বলেই খবর। দুজনের গন্তব্যই সেদিন ছিল গুজরাটের আমেদাবাদ। ভিআইপি রুম থেকে গন্তব্য পর্যন্ত দীর্ঘ পথে নানা কথার মধ্যে আদভানিজি সেদিন রাহুলকে বলেছিলেন যে, ‘দ্যাখো, রাহুল, এবারের (২০০৯) নির্বাচনেও কংগ্রেস বা বিজেপি কেউই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল না। এখন বোধহয় ভাবার সময় এসেছে যে, ভারতে কি তাহলে দ্বি-দলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করার সময় এসে গেছে! নইলে আর কতদিন এভাবে আমাদের এইসব আঞ্চলিক দলগুলোর ব্ল্যাকমেলিংয়ের কাছে নতিস্বীকার করতে হবে!’ এবারের নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্থাত্ ২৮২টি আসন পেয়ে পাঁচ বছরের জন্যে দেশ শাসনের অধিকার অর্জন করল। ৫৪৩টি আসন সমৃদ্ধ ভারতের সংসদে এবার কংগ্রেস মাত্র ৪৪টি আসন পেয়েছে। এবং বিজেপির অন্য শরিকরা মিলে আরো প্রায় শতাধিক আসন। এই সবকিছুর ফলাফল হিসেবে সেদিন রাহুল বা আদভানি যে গুজরাটে যাচ্ছিলেন, সেই গুজরাটেরই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী, যিনি সকলের কাছে নরেন্দ্রভাই হিসেবেই পরিচিত, তিনি এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
এবার, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বুঝতে চাইছেন এই ঘটনার সুদূরপ্রসারী ফল কী হতে চলেছে। তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, তাহলে এই যে সব আঞ্চলিক দলগুলো, এদের ভবিষ্যত্ই বা কী, আর বামপন্থিরাই বা দেশের রাজনৈতিক এই পরিস্থিতিতে ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে! ২০০৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বামেরা পেয়েছিল ৬১টি আসন। বিজেপিকে রুখতে বাইরে থেকে তারা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ-১-কে সমর্থন করেছিল। বামদের সেই আসন ২০০৯-এর নির্বাচনে কমে দাঁড়ায় ২৫-এ। আর ২০১৪-এ সেটাই আরো কমে দাঁড়িয়েছে ১১-য়। আর, পশ্চিমবঙ্গে তাদের হাল তো আরো খারাপ। এখানে তারা আসন পেয়েছে মাত্র ২টি। এখন প্রশ্ন যে, যে বামেরা একটানা ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে এবার তাদের এ হাল হলো কেন? ২০০৭-এ মনমোহন সিং যখন আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু চুক্তি করলেন, তখন বামেরা তাদের সমর্থন তুলে নেয়। তবু, তারপরেও সরকার টিকেছিল প্রায় দেড় বছর। সংসদে আস্থাভোটে ড. সিং জয়ী হন এবং বামদের সঙ্গে সেদিন ইউপি-১ কে ফেলতে হাত মিলিয়েছিল বিজেপি, দক্ষিণপন্থি এই বিজেপিই। ভারতের মানুষ কিন্তু ২০০৯-এর নির্বাচনেই বুঝিয়ে দেন যে, তাঁরা এটা মানছেন না। ফলে, সেবার নির্বাচনে কংগ্রেসের আসন বেড়ে দাঁড়ায় ২০৮-এ, যেটা ইউপি-১ এর সময় ছিল ১৪০।
চার বামদল সিপিআইএম, সিপিআই, আরএসপি ও ফরোয়ার্ড ব্লকের বিস্তার মূলত কেরল, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার সামান্য অংশে। ২০০৭-এ ইউপিএ-১ থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করার দিনকয়েক আগে প্রকাশ কারাতের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা অসুস্থ জ্যোতি বসুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। জ্যোতিবাবু সেদিন তাঁদের বলেছিলেন, ‘দ্যাখো প্রকাশ, কংগ্রেস আমাদের স্বাভাবিক বন্ধু। ’৫২ থেকেই এই সম্পর্ক। এখন এই ভুলটা তোমরা যদি করো তাহলে এটা হয়ে দাঁড়াবে তেমনই ঐতিহাসিক ভুল, যা তোমরা করেছিলে আমাকে প্রধানমন্ত্রী হতে না দিয়ে।’ বর্ষীয়ান এই বাম নেতা একটানা ২৬ বছর এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। দিল্লিসহ সারা বিশ্বে তাঁর নেতৃত্বে ছিল প্রবল আস্থা। শুধু তা-ই নয়, ইন্দিরা গান্ধী থেকে ড. মনমোহন সিং, রাজীব গান্ধী থেকে নরসিমহা রাও, ভিপি সিং, দেবগৌড়া, গুজরালসহ প্রত্যেক প্রধানমন্ত্রীই দরকারে তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। তাঁর উপদেশ তাঁরা গ্রহণও করেছেন নিয়মিত। অথচ তাঁর নিজের দলেরই প্রকাশ কারাত-বিমান বসুরা যে তেমন কিছু বোঝেন না তা তিনি বহুবার আলোচনাসূত্রে আমায় বলেছেন। ফলে, যা হবার তা-ই হলো। পশ্চিমবঙ্গে ২০১৪-র নির্বাচনে ২৯ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েও তাদের ঝুলিতে আসন সংখ্যা লজ্জাজনকভাবে ২, যার মধ্যে একটি জিতেছেন মহ. সেলিম, মাত্র ১১০০ ভোটে। অন্যদিকে ২০০৯-এ যে বিজেপি রাজ্যে পেয়েছিল ৪ শতাংশের সামান্য বেশি ভোট, সেটাই এবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ শতাংশে। কংগ্রেসের ভোট এককভাবে লড়ে ৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ শতাংশে। আসন সংখ্যা ৪। তা-ও অধিকাংশই বাঙালি মুসলিম এলাকায়, মালদা ও মুর্শিদাবাদে। এই লেখা পর্যন্ত বাম নেতারা পর্যালোচনা করছেন অবস্থার এই শোচনীয়তা নিয়ে আর তলার দিকের বামকর্মীদের একাংশ প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে যোগ দিচ্ছেন বিজেপিতে। রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, পশ্চিমবঙ্গে একটা ভয়াবহ অবস্থার সূত্রপাত হলো, যা থেকে বাম ও কংগ্রেস কীভাবে বেরিয়ে আসবে তা তারা নিজেরাই বুঝতে পারছে না। তারা দিশেহারা। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল নামে যে দলটি এই মুহূর্তে সর্বক্ষেত্রে ছড়ি ঘোরাতে ব্যস্ত, তারা জন্মলগ্ন থেকেই বিজেপির দোসর। অটলবিহারীর সরকারেও তারা ছিল। সেই সরকার ছেড়ে বেরোবার পর, ২০০৪-এ, তারা লোকসভা নির্বাচনে পায় মাত্র ১টি আসন। তারপর তারা মুখ ফেরায় কংগ্রেসের দিকে। পশ্চিমের একটি বড় শক্তির মদদ পেয়ে ২০০৯-এ তারা আসন পায় ১৯টি। ইউপিএ-২ সরকারে তারা শরিকও হয়। তখন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন এমন এক ব্যক্তি, যিনি নিজের দলের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ভোটের আগে এই আঞ্চলিক দলের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন। নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটিকে ভুল বুঝিয়ে সিংহভাগ মূল্যবান আসনই ছেড়ে দেয়া হয় তৃণমূলকে। প্রায় সাড়ে তিন বছর কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে থাকার পর, অবান্তর কারণেই প্রায়, তৃণমূল সেই সরকার থেকে বেরিয়ে আসে। কংগ্রেসের নতুন প্রজন্ম এ রকম পরিস্থিতিতে দিল্লিকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, তারা একাই লড়বে। এবং এবার তা-ই ঘটেছেও। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকার, যার মদদেই হোক, সংবিধান, আইন, নিয়ম কিছুই মানে না। বাম, বিজেপি ও কংগ্রেসের অভিযোগ, গত ৩ বছরে তাদের শতাধিক কর্মী এদের হাতে নিহত হয়েছেন, যার কোনোটারই কোনো বিচার হয়নি। দুর্নীতিতে এদের গলা অব্দি ডুবে আছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৩৫৪টি চিট ফাণ্ড নিয়ে ব্যাপক শোরগোল চলছে। কয়েক লক্ষ্য গরিব মানুষ এদের অত্যাচারে সর্বস্বান্ত। অথচ এরকম সংস্থার মধ্যে সব থেকে বড়টি, অর্থাত্ সারদা নিয়ে অজস্র অভিযোগ সত্ত্বেও মমতা সরকার যথাবিহিত তদন্তে কিছুতেই রাজি হতে চায়নি। শেষমেষ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সবেমাত্র এই বিষয়ে তদন্তে নেমেছে সিবিআই। নেমেই তারা হোঁচট খাচ্ছে। কারণ, রাজ্য পুলিশ কোনোভাবেই তাদের সঙ্গে কোনো সহযোগিতা করছে না। বাধ্য হয়ে সিবিআই-এর ডিরেক্টর রঞ্জিত্ সিনহা রাজ্যের চিফ সেক্রেটারি সঞ্জয় মিত্রকে কড়া চিঠি দিতে বাধ্য হয়েছেন। তারপরেও স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর জেদের জন্য সিবিআই পদে পদে বাধা পাচ্ছে। এত বড় কেলেঙ্কারি স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে বোধহয় আর হয়নি।
সব মিলিয়ে বাম, বিজেপি, কংগ্রেসের যে অভিযোগ উঠে আসছে তা আরো মারাত্মক। তাদের মতে, এবার নাকি আদৌ যথাযথ নির্বাচনই হয়নি। তাদের অভিযোগ, পুলিশ তৃণমূল নেতৃত্বের নির্দেশেই বিরোধীদের ভোটে বাধা দিয়েছে। খোদ তৃণমূলেরই কলকাতা নেতাদের ধারণা ছিল যে, তাঁরা ১৬-১৮ টার মতো আসন পাবেন, যে সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়িয়েছে শেষ পর্যন্ত ৩৪-এ, যা সমস্ত প্রাক-নির্বাচনী ও বুথ ফেরত সমীক্ষকদেরও হতবাক করে দিয়েছে। তাঁদের জনান্তিকে প্রশ্ন: এরকমটা হয় কী করে! তার ওপর এখন বুথ ধরে ধরে যে অঙ্কটা কলকাতার খবরের কাগজগুলোয় বেরোচ্ছে তা ধরলে তো খেলাটা সত্যিই চোখ কপালে তোলার মতো।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান প্রসঙ্গে জ্যোতিবাবু জীবিতকালে বলতেন, ‘মমতার সব অপরাধ ক্ষমা করা যায়, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মতো একটা ষোলো আনা ধর্মনিরপেক্ষ সীমান্তরাজ্যে হাত ধরে বিজেপিকে ঢোকানো কেউ বরদাস্ত করবে না।’ জ্যোতিবাবু ধরতে পেরেছিলেন এর ফল কী ঘটতে পারে। তা-ই ঘটছে, ঘটবেও। কার্যত তাঁর আশংকাই ফলে গেল।
নির্বাচনোত্তর পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি ভয়াবহ। গা বাঁচাতে বামদের একাংশ পর্যন্ত বিজেপিতে যোগ দিতে দৌড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকাও উত্তেজনার কবলে। মানুষ খুন হচ্ছেন, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে, চলছে চরম অরাজকতা। রাজ্যের মানুষ জানতে চাইছেন, এর জন্যেই কি তাঁরা রাজ্যে পরিবর্তন চেয়েছিলেন! ক্ষমতায় আসার আগে তৃণমূল বলেছিল, বদলা নয়, বদল চাই। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে ঠিক উল্টোটা। এটা পরিষ্কার যে, এই সরকারের আমলে আর কোনোদিনই অবাধ ও সুস্থ নির্বাচন হবে না। এই সরকার বহিরাগত সন্ত্রাসবাদীদের প্রশ্রয় তো দিচ্ছেই, সব রকম সাহায্যও করছে। পূর্বতন কংগ্রেস সরকার বিষয়টি নিয়ে বার বার রাজ্যকে নিষ্ফল সতর্ক করেছে। কিন্তু মোদী সরকার আর সতর্ক করবে না বলেই ধরে নেয়া যায়। নির্বাচনী প্রচারে পশ্চিমবঙ্গে এসে বিষয়টা মোদী যে জানেন তা তিনি বুঝিয়েও দিয়েছেন। সব মহলেরই ধারণা, এ ব্যাপারে তিনি কঠোর ব্যবস্থাই নেবেন; শুধু সময়ের অপেক্ষা।
মোদী যে মমতার আকাশ ছোঁয়া দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবেন না তা তিনি পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে এসে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন। এবং তিনি যে তাঁর চাপ বজায় রাখবেনই তা বোঝা যাচ্ছে শপথ নেবার পর থেকেই তাঁর বিভিন্ন উক্তি ও পদক্ষেপ থেকে। তিনি সরাসরি বলেছেন যে, মমতার সরকার দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে জনসাধারণকে সর্বস্বান্ত করছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ইতিমধ্যে মোদীর গোচরে তৃণমূল ও তার নেত্রীর তরফে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবার নানা তথ্য পৌঁছে দিয়েছে। এবার মানুষ দেখছেন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি-মতো মোদী কতটা সফল হন। এটা মাথায় রেখেই একটি আঞ্চলিক দলের দুর্নীতিকে যে তিনি প্রশ্রয় দেবেন না তা মোদী নিজেও বুঝিয়ে দিয়েছেন। বিশেষত এইরকম পরিস্থিতিতে, যেখানে গত ৩ বছরে সাধারণ মানুষ পদে পদে হেনস্থা হয়েছেন এবং এখনো হচ্ছেন, সরকারের নানা অপকর্মের বলি হচ্ছেন। আর পুলিশ গ্রামে গ্রামে গিয়ে বলছে যে, তোমরা তৃণমূলে না এলে তোমাদের নিরাপত্তা দেয়া যাবে না। কার্যত প্রাণ বাঁচাতেই পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় বিরোধী দলগুলো ভেঙে পড়ছে। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এখন তাঁদের সামনে আপাত ভরসা মোদী।
মমতা নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, ফেডারেল ফ্রন্ট তৈরি করে তিনিই নাকি প্রধানমন্ত্রী হবেন। তাঁর নেতারা প্রকাশ্যে বলছিলেন, সারা দেশে ১০০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাঁদের দল ৮০টি আসন পাবে। তাঁদের হিসেব ছিল, যেহেতু কোনো আঞ্চলিক দলই এতগুলো আসন পাবে না, ফলে তাঁদের নেত্রীই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। এটা মাথায় রেখেই পাশের রাজ্য উড়িষ্যার মুখ্যমন্ত্রী এবং দক্ষিণের তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার সঙ্গে ফেডেরাল ফ্রন্ট নিয়ে মমতা বহু আলোচনাও করেছেন। অথচ, ঘটনা হল, পশ্চিমবঙ্গের বাইরে মমতা যেসব প্রার্থী দিয়েছিলেন তাঁদের সকলের জামানতই জব্দ হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, তিনিই হবেন প্রধানমন্ত্রীর নির্মাতা। কিং মেকার। না, ভারতের ভোটাররা তাঁর কথা শোনেননি। আবদারও মানেননি। নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে তিনি কার্যত একা। নবীন পট্টনায়ক বা জয়ললিতার মধ্যে কেউই তাঁর সঙ্গে হাত মেলাতে রাজি নন। ফলে, এখন তিনি শুধু একাই নন, অসহায়ও। এই অবস্থায় তিনি নিজের দলের মধ্যে নিজস্ব কায়দায় নানা ব্যবস্থা নিয়ে চলেছেন, যা দেখে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ভাবছেন পশ্চিমবঙ্গে কী তবে ফের হিটলারই রাজত্ব করতে নেমে এল! মমতার ভরসা হল ’৪৭-এর পর উত্তর বিহার থেকে যাঁরা সেদিনকার পাকিস্তান এবং বর্তমান বাংলাদেশে চলে যান তাঁরাই। ’৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এঁরা দলে দলে ফের পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসেন। এঁরা কারা! উত্তর হল: এঁরা হলেন পাকপন্থি এবং বাংলাদেশ বিরোধী জনগোষ্ঠী। এঁদের মধ্যে ৫ জন আবার মমতার মন্ত্রিসভাতেও আছেন। ২০১২-তে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং উত্তর-পূর্বের ৭টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে ঢাকা সফরে যান। তাঁর ইচ্ছে ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে সব সমস্যার সমাধান করা। কিন্তু বাদ সাধেন মমতা। তিনি সফরে অনুপস্থিত ছিলেন। বক্তব্য হিসেবে তিনি বলেন, তিস্তার জল বণ্টনে তিনি অরাজি। পরে দেখা গেল মমতার মন্ত্রিসভার ঐ ৫ জন প্রকাশ্যেই বলেছেন যে, তিস্তার জল দিয়ে মনমোহন হাসিনাকে ফেরত আনতে চলেছেন। এই জন্যেই নাকি মমতার সঙ্গে পরামর্শ না করে মনমোহন সিং ঐ চুক্তি করতে গিয়েছিলেন। তাঁদের এই বক্তব্য যে মিথ্যা তা স্বয়ং ড. সিং একাধিকবার এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। বলেছেন, তাঁর তরফ থেকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশংকর মেনন ৪ বার কলকাতায় এসে মিটিং করে গেছেন। শেষ মিটিং থেকে উঠে আসার সময়ে পশ্চিমবঙ্গের তত্কালীন মুখ্যসচিবকে তিনি বলে আসেন, ‘তোমার মুখ্যমন্ত্রীকে একটু ইংরেজি শেখাও। উনি কিছুই হয় বুঝছেন না নয়তো বুঝতে চাইছেন না!’ মমতা সম্ভবত তখন ভুলে গিয়েছিলেন যে, তিনি ভারতের এক অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। বিদেশনীতি নিয়ে কথা বলার কোনো অধিকারই তাঁর নেই। অথচ, তিনি সস্তা জনপ্রিয়তা পেতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যার পরিণাম হয়েছে ভয়ংকর। সুতরাং আদভানি সেদিন রাহুলকে যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন এবারকার নির্বাচনী ফলাফলও সেদিকেই আঙুল তুলছে কিনা-এটাই এখন প্রশ্ন।
লেখক : ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি ও কলামিস্ট
