স্মরণ

শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. মুহম্মদ সিরাজুল হক

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৪, ২১:৫৭
গত ১৪ জুন ভোরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনির্ভাসিটির প্রফেসর ড. মুহম্মদ সিরাজুল হক মারা গেছেন (ইন্নালিল্লাহে...রাজেউন)। অর্থনীতির একজন আদর্শ শিক্ষক ও নিবেদিতপ্রাণ এই শিক্ষকের মৃত্যুতে দেশ একজন খ্যাতনামা মানুষ গড়ার কারিগরের সেবা থেকে বঞ্চিত হলো। তিনি ১৯৫৪ সালে চট্টগ্রামের চন্দনাইশে জন্মগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগদান করেন। কানাডার সাইমান ফ্রেশার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। দীর্ঘ নয় বছর বিদেশে অধ্যয়ন ও চাকরি করার পর দেশে এসে দেখেন যে, তার পরের সময়ে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছেন, তারা প্রমোশন পেয়ে গেছেন। তারপরও তিনি হতোদ্যম হননি। আমাদেরকে সে সময়ে প্রফেসর হরেন্দ্র কান্তি দে স্যার মাস্টার্সে ইকোনোমেট্রিক্সে পড়াতেন। হরেন্দ্র স্যার একদিন এসে বললেন যে, আমাদের ছাত্র সিরাজ বিদেশ থেকে এসেছে, তিনি তোমাদের এখন থেকে ইকোনোমেট্রিক্স পড়াবেন। সে বছর আমরা মাস্টার্সের মোট আড়াইশ’ ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে মাত্র বারোজন ইকোনোমেট্রিক্স নিয়েছিলাম। সবাই হরেন্দ্র স্যারকে অনুরোধ করেও টলাতে পারলাম না। এদিকে আমাদের আরেক শিক্ষক সেকান্দর স্যারও এসে বললেন যে, উনার উন্নয়ন অর্থনীতি কোর্সের তাত্ত্বিক অংশটুকু সিরাজ স্যার নেবেন। ছোটখাট গড়নের মানুষ, অথচ যখন পড়ানো শুরু করতেন তখন জটিল জিনিস ছবির মত হয়ে ধরা দিত। ১৪ তারিখ প্রথমে আমার সহপাঠী ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর মোদাব্বর আহামদ যখন জানাল যে, সিরাজ স্যার দীর্ঘদিন রোগ-ভোগের পর মারা গেছেন, তখন কত স্মৃতি একের পর এক ধরা দিল। আশির মাঝামাঝি সময়ে শিবিরের অত্যাচারের মধ্যে আমরা প্রগতিশীলদের বহু কষ্ট সহ্য করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়েছে। একটু পরেই চট্টগ্রাম থেকে আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রফেসর ড. মুহম্মদ আব্দুল মান্নান চৌধুরী স্যার ফোন করে আবার মৃত্যুর সংবাদ জানালেন। অর্থনীতিবিদ ড. ফরাস উদ্দিন স্যারের ভাষায় বলা— সিরাজ সাহেব একজন দক্ষ অর্থনীতিবিদ ছিলেন। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যারের জানাজায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরা ছাড়াও সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষকমণ্ডলী ও ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ ছিলেন। স্যারের ছোট ছেলেও জানাজায় বক্তব্য রাখেন এবং অংশ নেন। রোগে আক্রান্ত হয়ে লড়তে লড়তে স্যারের দেহখানি মলিন হয়ে গিয়েছিল। আমার ইস্ট ওয়েস্টের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের দেখে অশান্ত মনে কিছুটা সান্ত্বনা পেয়েছিলাম। সিরাজ স্যার অত্যন্ত সহজ ভাষায় অর্থনীতির জটিল বিষয় আমাদের পড়াতেন। পড়া না বুঝলে স্যারের বাসায় যেতাম। একটুও রাগ না করে পড়া দেখাতেন। স্যারের স্ত্রী যথেষ্ট যত্ন নিয়ে আপ্যায়ন করতেন। স্যারের বড় ছেলেকে চট্টগ্রাম থেকে আসার সময় দশ মাস দেখে এসেছিলাম। সে এখন কানাডায় সাইমন ফ্রেশারে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে Mentor হিসাবে কাজ করতেন। চোরাচালানের উপর তার কাজটি বেশ তথ্য সমৃদ্ধ। নিরহংকারী সিরাজ স্যার ব্যক্তিজীবনে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে আদর্শ স্বরূপ ছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যখন চেয়ারম্যান ছিলেন তখন প্রফেসর ড. আব্দুল মান্নান চৌধুরী স্যারের সহযোগিতায় অর্থনীতির জার্নালটি নিয়মিত বের করতেন। তিনি মৃদু ভাষায় সত্য কথা বলতে ভালোবাসতেন। গত বছর রোজার সময়ে একুশে টিভিতে ব্যবসা-বাণিজ্য অনুষ্ঠানে টক-শোতে আমার বক্তব্য শুনে ফোন করে উচ্ছ্বসিত ভাষায় প্রশংসা করেছিলেন। আবার গত বছরের শেষদিকে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে ড. মুহম্মদ ইউনূস সম্পর্কে আমার বক্তব্য শুনে বলেছিলেন যে, মাহবুব আমার স্যার সম্পর্কে এমনটি না বললেও পারতেন। আমি বলেছিলাম যে, স্যার আমি বিশ্বাস করি এনজিওরা সুদের হার হ্রাস করলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বর্তমান সরকারের প্রয়াস আরো শক্তিশালী হবে। দেশ মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হবে। প্রফেসর ড. মুহম্মদ সিরাজুল হক আর বেঁচে নেই। কিন্তু তিনি তার আদর্শ, নীতি ও কর্মপন্থা দ্বারা স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবেন। মৃত্যুকালে দু’পুত্র ও স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন ও অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী রেখে গেছেন। আল্লাহ তাকে বেহশত্ নসীব করুন। লেখক :ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়্যাল ইকোনোমিস্ট [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন