ঢাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন

আপডেট : ১৭ জুন ২০১৪, ২১:১১
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ঢাকা মহানগরের ৩২১ ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করিয়া তাহার তালিকা ঢাকা সিটি করপোরেশনে পাঠাইয়াছে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার জন্য। ইহা সুসংবাদ, সন্দেহ নাই। তবে, সরকারেরই আরেকটি প্রতিষ্ঠান কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের (সিডিএমপি) সামপ্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, ঢাকা শহরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ৭০ সহস্রাধিক। তাহার মধ্যে মারাত্মক ঝুঁকিতে রহিয়াছে সাড়ে ৬ হাজার ভবন। এই ভবনগুলির কোনো কোনোটি অতিরিক্ত লোড, ভূমিকম্প কিংবা মাটির দুর্বল গঠনের কারণে যেকোনো মুহূর্তে ধসিয়া পড়িতে পারে বলিয়া আশঙ্কা করিতেছেন ভবন প্রকৌশলীরা। তাহারা বলিতেছেন দ্রুত এই সকল ভবনের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ না লইলে আমাদিগকে আরও মানুষের লাশ লইয়া আহাজারি করিতে সবসময় প্রস্তুত থাকিতে হইবে; যেকোনো দিন ঢাকা আবারও হইয়া উঠিতে পারে মৃত্যুর উপত্যকা। একইসঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, ঢাকার মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জে মারাত্মক ঝুঁকিতে রহিয়াছে ২৪৩টি পোশাক কারখানা। যেকোনো মুহূর্তে এই কারখানাগুলিও ধসিয়া পড়িতে পারে। সিডিএমপি’র প্রতিবেদন ও তথ্যানুসন্ধানে দেখা গিয়াছে, ঢাকা শহরের মাত্র ৩৫ ভাগ স্থাপনা শক্ত মাটির ভিতের ওপরে তৈরি। বাকি ৬৫ ভাগ স্থাপনাই বালু দিয়া বিভিন্ন জলাশয় ভরাট করিয়া নরম মাটিতে তৈরি করা হইয়াছে। অধিকাংশ ভবনই বিল্ডিং কোড মানিয়া তৈরি করা হয়নি। ফলত, এই সকল ভবন অতিরিক্ত ভরের কারণে ধসিয়া পড়িবার আশংকা রহিয়াছে। যদি ৭ মাত্রায় ভূমিকম্প হয় তাহা হইলেই ঢাকার এক-তৃতীয়াংশ অথবা প্রায় ৭৮ হাজার ভবন মুহূর্তেই ধসিয়া পড়িতে পারে। আর, এরূপ ঝুঁকির তালিকায় কেবল পুরাতন ভবন নহে, সমসাময়িককালে নির্মিত অনেক আধুনিক ভবনও রহিয়াছে। ভবন নির্মাণে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারসহ ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন ও নানা অনিয়ম ইহার জন্য দায়ী হইলেও প্রতিকারে কর্তৃপক্ষের রহিয়াছে চরম গাফিলতি ও উদাসীনতা। ফলে দেশের নানা স্থানে প্রায়শই ভবন ধসের ঘটনা ঘটিতেছে। ইতিপূর্বে রাজধানীর বেগুনবাড়ি, শেওড়াপাড়া, কল্যাণপুর, গ্রিনরোডসহ বিভিন্ন এলাকায় বহুতল ভবন ধসের ঘটনা ঘটিয়াছে। সর্বশেষ সাভারের রানা প্লাজা ধসিয়া সহস্রাধিক মানুষ নিহত হইবার খবরও সর্বজনবিদিত। ঢাকা মহানগরী আমরা পরিকল্পনামাফিক গড়িয়া তুলিতে পারি নাই। সুস্থ নগর ও জীবনের জন্য প্রশস্ত পরিসর অত্যন্ত প্রয়োজন, তাহা না পাইলে নগরজীবন দুর্বিষহ হইয়া ওঠে, মন কূপমণ্ডূক, সংকীর্ণ ও ঈর্ষাকাতর হইয়া থাকে। কিন্তু আমরা ফুটপাত তো দূরের কথা, রাস্তার পা ফেলিবার জায়গাটুকুও নিরাপদ রাখিতে পারি নাই। এমনকি রাস্তা ছাড়িলে যে নিরাপদ গৃহকোণটুকু নগরবাসীর পাইবার কথা, আমরা তাহাও নিশ্চিত করিতে পারি নাই। পাড়া-মহল্লায় সরু গলির দুইদিকে আকাশচুম্বী ভবন দৃষ্টি আগলাইয়া রাখে। দুর্ঘটনা ঘটিলে সেইসব ভবন হইতে অধিবাসীরা বাহির হইতে তো পারিবেন না, উদ্ধারকর্মীরাও পৌঁছাইতে পারিবে না। নগর পরিকল্পনার ধার না ধারিয়া, ভবনের নকশার তোয়াক্কা না করিয়া আকছার আকাশচুম্বী ভবন উঠিতেছে। অনেক সময় দেখা যায়, সিটি কর্পোরেশন যে নকশা অনুমোদন করিয়াছিল তাহা ফেলিয়া রাখিয়া ভিন্ন নকশায় বিল্ডিং উঠিয়াছে। কিন্তু তাহাও তো কর্তৃপক্ষকে তদারকি করিতে হইবে! তাহা হইতেছে বলিয়া তো দেখা যাইতেছে না। উন্নত বিশ্বে দুর্ঘটনা ঘটিলে আধুনিক প্রযুক্তি, জনবল, অর্থবল প্রভৃতির কল্যাণে খুব সহজেই তাহারা সামলাইয়া লইতে পারে। আমাদের না আছে প্রাযুক্তিক দক্ষতা, না আছে জনবল ও আর্থিক সঙ্গতি। এই অবস্থায় আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনা ঘটিলে তাহা সামলানো দুরূহ হইয়া ওঠে। সেহেতু, সময় থাকিতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলি নিয়া সচেতন হইবার পাশাপাশি নূতন নির্মাণে যথাযথ মান বজায় রাখিবার ক্ষেত্রে আমাদের গুরুত্বারোপ করিতেই হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন