কোন্ পথে সিরিয়া

আপডেট : ১৭ জুন ২০১৪, ২১:১১
স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট, উগ্রবাদী বিরোধীপক্ষ আর ক্ষমতা বাটোয়ারার নিয়ামক পশ্চিমা বিশ্বের ভ্রান্তিগুলি মিলিয়া সিরিয়া কি আরেকটি সোমালিয়া হইয়া যাইতেছে? এই প্রশ্ন যেনতেন কোন ব্যক্তির নহে। গত সপ্তাহে এই আশঙ্কাটি ব্যক্ত করিয়াছেন সিরিয়ার সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘ নিযুক্ত সাবেক বিশেষ দূত লাখদার ব্রাহিমী। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে নিযুক্ত ব্রাহিমী সিরিয়ার পরিস্থিতিতে হতোদ্যম হইয়া গত মাসে পদত্যাগ করেন। ব্রাহিমী যে আশঙ্কাটি ব্যক্ত করিয়াছেন তাহাকে কেবল খেদোক্তি হিসাবে দেখিবার কোন সুযোগ নাই। কেননা, শান্তি স্থাপনের জন্য প্রধানতম শর্তগুলির কোনটিই এখন অবধি পালিত হয় নাই। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ক্ষমতা ছাড়িয়া দিয়া নূতন শাসক বাছাইয়ের প্রক্রিয়ার সূচনা করেন নাই। বিপুল আশাবাদ জাগাইয়া জেনেভাতে বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিতীয় পর্বের যে আলোচনা শুরু হইয়াছিল জানুয়ারি মাসে তাহা শূন্যগর্ভ প্রমাণিত হইয়াছে। আমেরিকা বিদ্রোহীদিগকে কিংবা রাশিয়া সরকারপক্ষকে শান্তি আলোচনায় অর্থবহভাবে নামাইতে ব্যর্থ হইয়াছে। কেবল তাহাই নহে, দুইপক্ষ যে শান্তি স্থাপনে প্রকৃত অর্থেই আলোচনায় বসিবে তাহার এতটুকু আলামত এখন অবধি দৃশ্যমান হইতেছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, উভয়পক্ষই সামরিক কায়দায় বিজয়ী হইবার ব্যাপারে আশাবাদী হইয়া আছে এবং সংলাপের পরিবর্তে সামরিক সমাধানকেই শ্রেয় জ্ঞান করিতেছে। ইহা ব্যতীত আসাদের ক্ষমতা-ক্ষুধা সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে বিদীর্ণ করিয়া দিবার উপক্রম করিতেছে। গত তিন বত্সর ধরিয়া সংঘাত চলিতেছে সিরিয়ায়। এতদিনে ইহা স্পষ্ট যে, আসাদকে ক্ষমতায় রাখিয়া সমস্যার সমাধান হইবে না। আসাদ সরিলেই যে ধর্মীয় উগ্রবাদী প্রাধান্য নির্ভর পশ্চিমা শক্তিপুষ্ট বিদ্রোহীরা মসনদ দখলে লইয়া ফেলিতে পারিবে তাহা হয়তো নহে; কিন্তু বিদ্রোহী দমনের নামে যেমন করিয়া নিজ জনগণের উপরে নির্বিচার নির্যাতন চালাইতেছেন তাহাতে আসাদের সকল বৈধতা উবিয়া গিয়াছে। এমতাবস্থায় শান্তি চাহিলে আসাদের বিদায়ের কোন বিকল্প আছে বলিয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করিতে পারিতেছেন না। কিন্তু এহেন পরিস্থিতিতেও আসাদ টলিতেছেন না। বরং তিনি গত সপ্তাহে এক নির্বাচন অনুষ্ঠান করাইয়া নূতন করিয়া সাত বত্সরের জন্য প্রেসিডেন্ট পদটি কুক্ষিগত করিয়া লইয়াছেন। এই নির্বাচন যে সিরিয়াকে আরো একদফা সমস্যার মধ্যে ফেলিয়া দিল তাহা বলাই বাহুল্য। ইতোমধ্যে আড়াই মিলিয়ন মানুষ শরণার্থী হইয়াছে প্রতিবেশী দেশগুলিতে। এই সংখ্যা সামনের বত্সরে চার মিলিয়ন হইয়া যাইবে। দেশের ভিতরে বাস্তুচ্যুত হইয়াছে ছয় মিলিয়ন মানুষ। জাতিসংঘ গত বত্সরের জুলাই মাসে মৃতের সংখ্যা এক লক্ষের অধিক বলিয়া জানাইয়াছিল। এখন অবধি প্রাণহানি অব্যাহত আছে। এই সংখ্যা কোথায় যাইয়া ঠেকিবে কে বলিতে পারে? উভয়পক্ষের দ্বারা মানবাধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন চলিতেছে সমানতালে। অতীব পরিতাপের বিষয় এই যে, দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে চূড়ান্ত দুর্বিপাক লইয়া সরকার কিংবা বিদ্রোহপক্ষের মধ্যে কোন অনুশোচনা বা পরিতাপের লেশমাত্র অনুপস্থিত। উভয়পক্ষই প্রতিপক্ষের স্কন্ধে নিতান্ত নিষ্ঠুরভাবে দায় চাপাইয়া দিয়া নিজদিগের অমানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখিয়াছে। সিরিয়ায় আসাদ হইতেছেন স্বৈরাচারী। অন্যদিকে শক্তিশালী বিরোধীরা হইতেছে ধর্মীয় উগ্রবাদী। এই দুইপক্ষের সংঘাত কেবল সিরিয়াকে নহে, বরং সম্পূর্ণ অঞ্চলটির নাজুক স্থিতিশীলতা একেবারে বিদীর্ণ করিয়া দিতে পারে বলিয়া বিশ্লেষকদের অনেকেই ইতোমধ্যে আশঙ্কা ব্যক্ত করিতে শুরু করিয়াছেন।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন