সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভুল চিকিত্সা কিংবা চিকিত্সায় অবহেলার অভিযোগে চিকিত্সকদের উপর রোগীর আত্মীয়-স্বজনের হামলা এবং প্রতিবাদে চিকিত্সকদের ধর্মঘটের নামে চিকিত্সাসেবা বন্ধ করার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। এর পাশাপাশি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে একপেশে সংবাদ পরিবেশন আর উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুল সংবাদ প্রচারের অভিযোগ আনছেন চিকিত্সকরা। ফলশ্রুতিতে সাংবাদিকদের উপর চিকিত্সকদের হামলার ঘটনাও ঘটেছে। আসলেই কি হাসপাতালে কোন রোগীর মৃত্যু হলে তার জন্য সবক্ষেত্রেই চিকিত্সকই দায়ী? একজন চিকিত্সক কি তাহলে হত্যাকারী? তিনি কি ফৌজদারী দণ্ডবিধিতে অভিযুক্ত হবেন? চিকিত্সক, চিকিত্সা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং আপামর জনগণ, সবার মাঝে আজ এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।
প্রথমেই জানা যাক, চিকিত্সাধীন অবস্থায় একজন রোগীর মৃত্যুর পিছনে কি কি কারণ থাকতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগের স্বাভাবিক পরিণতিতে রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। অনেক সময় একরোগের চিকিত্সা চলাকালীন হঠাত্ অন্যকোন প্রাণঘাতী রোগে, যেমন হার্ট এ্যাট্যাকে আক্রান্ত হয়েও মৃত্যু হতে পারে। চিকিত্সা কিংবা অপারেশনের স্বীকৃত জটিলতা বা যথাযথ ঔষধের স্বীকৃত পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াতেও রোগীর মৃত্যু হতে পারে। চিকিত্সা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভুল বা অবহেলায়ও মৃত্যু ঘটা অসম্ভব নয়। এছাড়া উপযুক্ত চিকিত্সা উপকরণ বা ঔষধের অভাব, প্রয়োজনীয় দক্ষ চিকিত্সক বা নার্সের অভাব, রোগীর ব্যয়বহুল চিকিত্সার খরচ মেটানোয় অসামর্থ্য, এমনকি রোগীর আত্মীয়-স্বজনের অনাগ্রহ বা অবহেলাও এক্ষেত্রে মূল নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে। এতগুলো কারণের মাঝে শুধু চিকিত্সককে দায়ী করা নিশ্চয়ই যৌক্তিক নয়, অথচ আমাদের দেশে মৃত্যু হলেই প্রায়ই চিকিত্সককে দায়ী করা হয়। চিকিত্সা দিতে গিয়ে যেন কোন গাফিলতি বা ত্রুটি না হয় সেজন্য ডাক্তার, নার্স সবাইকেই সতর্ক থাকতে হবে। তবে এটাও বোঝা দরকার যে, চিকিত্সাধীন অবস্থায় একজন রোগীরও মৃত্যু হবে না, এর নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না, পৃথিবীর কোথাও না। কিছু কিছু রোগের সুনির্দিষ্ট চিকিত্সা পৃথিবীর কোথাও বের হয়নি। আবার অনেক রোগের পূর্ণ নিরাময় সম্ভব নয়, যেমন ক্যান্সার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে গেলে, লিভার, কিডনী বা হূদপিন্ড নষ্ট হয়ে গেলে ইত্যাদি।
আসলে চিকিত্সাক্ষেত্রে ভুল হতেই পারে। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের হাসপাতালেও ডাক্তারদের অনিচ্ছাকৃত ভুলে রোগী মারা যাওয়ার অভিযোগ শোনা যায়। এক্ষেত্রে চিকিত্সা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তি প্রদান করে থাকেন। অনেক সময় বিপুল অংকের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, এমনকি সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকের লাইসেন্সও বাতিল করা হয়। কিন্তু তাই বলে ঐসব দেশে রোগী মৃত্যুর সাথে সাথে ডাক্তারকে দায়ী করে ভাংচুর আর মারামারি শুরু করা হয় না।
অথচ আমাদের দেশের চিত্রটা হচ্ছে এই যে, প্রায় সব মৃত্যুর জন্যই ঢালাওভাবে ডাক্তারকে দায়ী করা হয়, চিহ্নিত করা হয় হত্যাকারী হিসেবে। ভুল চিকিত্সার অভিযোগ তোলা হয়, যদিও ডাক্তারের এই “ভুল” নির্ণয় করার কোন যোগ্যতাই রোগীর আত্মীয়-স্বজনের নাই। আর এমন অনুমাননির্ভর, আবেগপ্রসূত আর অনেক সময় উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা অভিযোগের ভিত্তিতে শুরু হয় ভাংচুর, গালিগালাজ, মারধর আর মামলা মোকদ্দমা। কোনরকম তদন্ত ছাড়াই চিকিত্সককে গ্রেফতার করা হয়, রিমান্ডে নেয়া হয়, সামাজিকভাবে নাজেহাল করা হয়। ইদানীং আবার এসব ঘটনা ফলাও করে পত্রিকায় প্রচার করা হয়, যার বেশিরভাগই একপেশে, খণ্ডিত সত্য।
আসলে একজন ডাক্তার সবসময়ই চেষ্টা করেন রোগীকে ভাল করে তুলতে, এটাই তার পেশাগত এবং নৈতিক দায়িত্ব। দুই একজন যদি যথাযথভাবে এই দায়িত্ব পালন না করে, তার জন্য সমস্ত ডাক্তার সমাজকে ঢালাওভাবে দায়ী করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। গুটিকয়েক চিকিত্সকের অবহেলা বা ভুলের জন্য সকল চিকিত্সককে দায়ী না করে, আমাদের চিকিত্সা ব্যবস্থার মূল সমস্যাগুলোয় দৃষ্টি দেয়া দরকার। আমাদের দেশে জনসংখ্যা বেশি, তাই রোগীর সংখ্যাও বেশি। সেই তুলনায় দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকবল ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা অপ্রতুল। এমনকি আমাদের ভালো ডাক্তার তৈরীর পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। উপরন্তু যত্রতত্র মেডিক্যাল কলেজের অনুমোদন, নোংরা রাজনৈতিক দলাদলির প্রভাব আর সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতি, মানসম্মত ডাক্তার তৈরীকে বাধাগ্রস্ত করছে। এতকিছুর মাঝেও বেশিরভাগ চিকিত্সক এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করেন মানুষকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে। তাই বলির পাঠার মত ডাক্তারের ঘাড়ে কোপ না দিয়ে চিকিত্সাক্ষেত্রে বিরাজমান অরাজকতাগুলোকে চিহ্নিত করে সমাধান করা দরকার।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আজ সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়তই নানাভাবে হয়রানি, নিপীড়ন, জোর জবরদস্তি ও অবিচারের শিকার হচ্ছে। সমাজ ও রাষ্ট্র কোনো ক্ষেত্রেই এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু কোথাও প্রতিকার মিলছে না। দেশে আইন আছে, প্রশাসন আছে, আছে বিচার ব্যবস্থা। কিন্তু ভুক্তভোগীরা এর সুফল পাচ্ছে না। সর্বক্ষেত্রে বিরাজমান এই পরিস্থিতি চিকিত্সকদের মাঝেও প্রকাশ পাচ্ছে, কারণ তারা এই সমাজেরই অংশ। আসলে অবহেলা আর অনিয়মের ব্যাধি ক্যান্সারের মত সারা সমাজদেহেই বাসা বেঁধেছে, শুধু একটি পেশার মানুষকে দোষ দিয়ে এর থেকে মুক্তি কি সম্ভব? অন্য সকল ক্ষেত্রে অনিয়ম আমরা চোখ বুঁজে মেনে নেই, কিন্তু দুই একজন ডাক্তারের কার্যকলাপে পান থেকে চুন খসলেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠি, দায়ী করা হয় সব ডাক্তারকেই। সমাজের বড় বড় দোষগুলো আমরা নত মস্তকে মেনে নিতে বাধ্য হই, অথচ ডাক্তারের ছোট ছোট ত্রুটি বড় হয়ে উঠে। বিভিন্ন মিডিয়া আর সাংবাদিকরা চিকিত্সকদের ছোট ত্রুটি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করে ছাপিয়ে দেয়, অথচ অন্যদের বেলায় থাকে নমনীয়। মিডিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আর তাদের আত্মীয়-স্বজন কি কখনও চিকিত্সকদের কাছে চিকিত্সা নেন নাই, কেউ কি রোগমুক্ত হন নাই?
তবে একথা সত্য যে, অবহেলার সকল অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। চিকিত্সাক্ষেত্রে কোথাও কোথাও যে অনিয়ম হচ্ছে, ভুল চিকিত্সা বা অবহেলার ঘটনা ঘটছে তা সত্য, আর এর বেশিরভাগই ঘটছে অনুমোদনহীন যত্রতত্র গড়ে উঠা হাসপাতাল বা ক্লিনিকে। আবার নামিদামি হাসপাতালেও এ ধরনের অঘটন ঘটছে। অদক্ষ, দুর্নীতিপরায়ণ ও ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি সম্পন্ন চিকিত্সকদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা বিএমডিসির রয়েছে। ক্লিনিক আর হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি বিভাগ রয়েছে। কিন্তু এসকল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অভিযোগ আমলে না নেয়ার প্রবণতা আর বিচার না হওয়ার প্রথা, এসব অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এতে প্রকৃত অন্যায়কারীর পাশাপাশি ঢালাওভাবে কর্তব্যপরায়ণ চিকিত্সকেরাও অপমান ও হামলার শিকার হচ্ছেন।
এই পরিস্থিতির সমাধানকল্পে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনাই প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত। এজন্য চিকিত্সক আর রোগীর সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় করতে হবে। এক্ষেত্রে চিকিত্সকদের ভূমিকাই মুখ্য। রোগী আর তার আত্মীয়-স্বজনের সাথে সঠিক যোগাযোগ আর তথ্য আদান-প্রদান এবং তাদের সাথে সুন্দর মার্জিত ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। এ বিষয়ে ডাক্তারদের আরো আন্তরিক হওয়া দরকার। সেই সাথে আমাদের চিকিত্সা শিক্ষা ব্যবস্থাতেও এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া দরকার। উন্নত বিশ্বে চিকিত্সা শিক্ষার শুরুতেই শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় রোগীদের সাথে পেশাগত সুসম্পর্ক রচনার কৌশল, জোর দেয়া হয় রোগী ও রোগীর স্বজনদের সম্মান দেয়ার বিষয়েও। রোগীর মৃত্যু হলে স্বজনদের প্রতি কিভাবে সহমর্মী হতে হয় সে শিক্ষাও দেয়া হয়। আমাদের কারিকুলামে এদিকটা অবহেলিত। অথচ চিকিত্সক রোগী সৌহার্দ্য, সহমর্মীতা আর মানবিক আচরণের উপর প্রয়োজনীয় কোর্স থাকলে, সম্ভবত চিকিত্সকদের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব, তাদের কাজের জায়গাটা আরও সুন্দর হতে পারত।
স্বাস্থ্যখাতে চলতে থাকা এই পরিস্থিতি যাতে আরো নাজুক না হয়, তার জন্য এখনই প্রশাসনসহ সকল স্তরের ব্যক্তিবর্গের এগিয়ে আসা দরকার। এই অবস্থা চলতে থাকলে জনগণ, হাসপাতাল, ক্লিনিক, চিকিত্সক, সাংবাদিক আর সরকার পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে যাবে। বলা বাহুল্য এতে কোনপক্ষই লাভবান হবে না। চিকিত্সক ও সেবাপ্রার্থীদের মধ্যে অবিশ্বাস আর অনাস্থা আরো বাড়বে। একদিকে সুযোগ সন্ধানীরা রোগীদের আরো অবহেলা করবে, রোগীরা যথাযথ সেবাবঞ্চিত হবেন, সামর্থ্যবান রোগীদের বিদেশগামিতা বেড়ে যাবে, অন্যদিকে ক্রমাগত ভাংচুর আর হামলার ফলে চিকিত্সকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন, ভালো কাজের স্পৃহা হারিয়ে ফেলবেন, গুরুতর অসুস্থ রোগীর চিকিত্সা দিতে নিরাপদ বোধ করবেন না। জটিল বা গুরুতর মনে হলেই নানা ধরনের বাহানা দেখিয়ে রোগীকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবেন। তাই হাসপাতালে যথাযথ সেবাদান আর তার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। এর জন্য সবার আগে হাসপাতালে সেবাদাতা ও গ্রহীতা উভয়পক্ষের সদাচরণ নিশ্চিত করতে হবে। চিকিত্সক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও রোগী উভয়ের অধিকার ও নিরাপত্তা সুরক্ষার আইনি ব্যবস্থা থাকতে হবে। চিকিত্সা সংক্রান্ত রিপোর্টিং সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং দেশের চিকিত্সা ব্যবস্থা উন্নয়নের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। একই সাথে হাসপাতালে সাংবাদিকদের নির্বিঘ্ন পেশাগত দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। দুই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অতিপ্রচার যেন না করা হয়, সেদিকটাও দেখতে হবে।
চিকিত্সকরা অবশ্যই তাদের পেশাদারিত্ব বজায় রাখবেন, মানবিকতা ও সুশিক্ষার পরিচয় দিবেন। অন্যদিকে হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীরা ও তাদের আত্মীয়-স্বজন ডাক্তারদের সীমাবদ্ধতা ও দায়িত্বের বিশালতা সম্পর্কেও সচেতন থাকবেন এবং হাসপাতালে সংঘাত-সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি থেকে বিরত থাকবেন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন, সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারীদের আস্থা অর্জন, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও নিরাপত্তা বিঘ্নকারীর শাস্তিদান, আর একইসাথে চিকিত্সাক্ষেত্রে অবহেলাকারীদের যথাযথ শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা দেশ ও জনগণের স্বার্থে অতীব জরুরি।
লেখক :ডিন, মেডিসিন অনুষদ অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
