অফিসে সবাই মিষ্টি খাচ্ছে। ঘটনা কি? এত হৈচৈ আনন্দ করে সবাই মিষ্টি খাচ্ছে কেন? তাও আবার যা তা ধরনের মিষ্টি নয়। বেশ দামী মিষ্টি। তার মানে কোনো দামী মানুষের ছেলে অথবা মেয়ে কি পরীক্ষায় ভালো পাস দিয়েছে? তা কি করে হয়? গত কয়েকদিনে হৈচৈ আর আনন্দ করে মিষ্টি খাওয়ার মতো কোনো বড় পরীক্ষার রেজাল্ট তো বের হয়নি। তাহলে এত দামী মিষ্টি কে কি উপলক্ষে খাওয়াচ্ছে?
আমাদের অফিস পিয়ন আব্দুল ওয়াহাব আমার জন্য ট্রেতে মিষ্টি নিয়ে হাজির। আর তক্ষুণি আসল ঘটনা বোঝা গেল।
কিরে মিষ্টি কেন? ওয়াহাবকে প্রশ্ন করতেই সারা মুখে আনন্দ ছড়িয়ে মৃদু হেসে বলল আমাদের বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আইজকা জব্বর খেলা দেখাইছে। ইন্ডিয়ার শোচনীয় অবস্থা। এই খুশিতে স্যার মিষ্টি আনলাম। ভালো মিষ্টি, একটা খান... এই ছেলে বলে কি? বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সাহারা কাপ এর দ্বিতীয় দিনের ক্রিকেট খেলা তখনও শেষ হয়নি। সবেমাত্র ভারতীয় দলের ব্যাটিং শেষ হয়েছে। ২৫ ওভারে সবক’টি উইকেট হারিয়ে ভারত করেছে মাত্র ১০৫ রান। খেলার অবস্থা দেখে ধরেই নেয়া যায় আজ বাংলাদেশ জিতবে। কিন্তু ক্রিকেট হলো অনিশ্চয়তার খেলা। কাজেই বাংলাদেশের ব্যাটিং না দেখেই কি বলে দেয়া সম্ভব বাংলাদেশ জিতেছে? ওয়াহাবকে মৃদু ধমক দিলাম অ্যাই খেলা এখনো শেষ হয় নাই। অথচ তুমি বলতেছ বাংলাদেশ জিতেছে। সবাইকে মিষ্টি এনে খাওয়াচ্ছ। এইসব পাগলামির কোনো মানে হয়? যাও নিজের কাজ করো গিয়ে... যাও...
অন্যদিন হলে ওয়াহাব এতক্ষণে ভয়ে আমার দৃষ্টির বাইরে চলে যেত। কিন্তু আজ গেল না। বরং আমার ধমক খেয়েও মৃদু হেসে বলল স্যার আইজ আমাগো টাইগারদের দিন। ভাইবা দেখেন মাত্র ২৫ ওভারে ইন্ডিয়ার সবাই অল আউট। রান করেছে মাত্র ১০৫। আর আমগো নতুন পোলাটা কি যেন নাম? হ্যাঁ মনে পড়ছে তাসকিন... হ্যায় তো সবাইরে টাসকি খাওয়াইছে। অভিষেক ম্যাচেই ৫ উইকেট... এই ম্যাচে স্যার আমরা জিতবই... একটা মিষ্টি খান স্যার। ভালো মিষ্টি... ওয়াহাবের মুখের দিকে তাকালাম। ওর সরল, অমায়িক মুখটার জন্য মায়া হচ্ছে। আহারে দেশের জন্য কি মায়া! ওয়াহাব এমনিতে ক্রিকেট পাগল। দেশে-বিদেশে যেখানেই বাংলাদেশের খেলা থাকুক না কেন টিভিতে সে খেলা দেখবেই। বাংলাদেশ নিশ্চিত হেরে যাচ্ছে এমন মুহূর্তেও তার চোখে-মুখে হাসি লেগে থাকে। একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম অ্যাই ক্রিকেট তোমার এত প্রিয় খেলা কেন?
ওয়াহাবের তাত্ক্ষণিক জবাব স্যার আমগো দেশে এই একটামাত্র খেলা আছে যে খেলায় সরকার, বিরোধী দল, হাসিনা, খালেদা সবাই একসাথে জিততে চায়। আমাদের অফিসের কথাই ধরেন স্যার... কেউ সরকারি দল আবার কেউ বিরোধী দলকে সাপোর্ট করে। কিন্তু ক্রিকেটের বেলায় সবাই স্যার এক হয়। বাংলাদেশ জিতলে সবাই একসাথে তালি দেয়, হাসে, আনন্দ করে। এইজন্য স্যার ক্রিকেট খেলা আমার খুব পছন্দ। নেন স্যার মিষ্টিটা খান... ওয়াহাবের মতো অফিসে আমরা সবাই নিশ্চিত ধরে নিলাম বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আজ জিতবেই। কথায় আছে মর্নিং শোজ দ্য ডে... সকালের সূর্যই বলে দেয় দিনটা কেমন যাবে। খেলার গতিপথই বলে দিচ্ছে বাংলাদেশ অবশ্যই জিতবে। ওয়াহাবের মতো আমাদের এক ক্রিকেটপ্রেমী সহকর্মী রীতিমতো হিসাব কষতে শুরু করল স্যার হিসাবটা দেখেন... বৃষ্টির কারণে খেলা হবে ৪১ ওভার। রান করতে হবে মাত্র ১০৬। এইটা কোনো ব্যাপার হলো? তামিমসহ আমাদের উদ্বোধনী জুটিই ম্যাচ জয় করবে। আজ আমরা ১০ উইকেটে জিতব। সিরিজও জিতব আমরা। অফিসের ‘কাজবাজ’ মোটামুটি লাটে উঠেছে। সবাই টিভির সামনে বসে বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়েই আলোচনা করছে। রাতে হবে ফুটবল বিশ্বকাপে ব্রাজিল বনাম মেক্সিকোর খেলা। ব্রাজিলের সমর্থকরা একটু যেন বেশিই খুশি। একজন আমার কাছে চিরকুট পাঠালো আজ শুভ দিন। বাংলাদেশ জিতল... ব্রাজিলও জিতবে...
বিরতি শেষে বাংলাদেশের ব্যাটিং শুরু হলো। ওয়াহাব বসেছে টিভির একেবারে সামনে। উদ্বোধনী জুটি তামিম এবং আনামুল হক বিজয় এলো মাঠে। সবার সে কি উত্তেজনা। প্রথম বলেই তামিম চার মারল। আনন্দে আমাদের একজন সহকর্মী চিত্কার দিয়ে বললেন হ্যারেই কয় টাইগার... সাবাশ তামিম... সাবাশ... কিন্তু দ্বিতীয় বলেই তামিম ধরাশায়ী। টিভির সামনে সবাই নিশ্চুপ। কেউ একজন কষ্ট জড়ানো কণ্ঠে বলল এইটা কি হইল?
ওয়াহাব মাথা নিচু করে টিভির সামনে থেকে চলে গেল। তারপর একে একে বাংলাদেশ দলের উইকেটের পতন হতে থাকল। একটা অফিসের উত্সবমুখর পরিবেশ নিমিষে বদলে গেল। কেউ কারো দিকে ভালোভাবে তাকাচ্ছে না। তাকালেও কেউ কিছু বলছে না।
আসলে বলার কি কিছু আছে? এ কথা তো সত্য বাংলাদেশে ক্রিকেটই একমাত্র খেলা যার জন্য দেশবাসী এককাতারে মিলিত হয়। ক্রিকেটের জয়ে একত্রে হাসে, আনন্দ-উত্সব করে। ক্রিকেট হাসলে গোটা বাংলাদেশ হাসে। ক্রিকেটের পরাজয়ে গোটা বাংলাদেশ লজ্জায় নুয়ে পড়ে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের ক্রিকেটের অবস্থা কি? অনেকে বলেন, ভারত তার সর্বশক্তি নিয়ে এবার বাংলাদেশে ক্রিকেট খেলতে আসেনি। তার মানে এক ধরনের অবজ্ঞা নিয়েই তারা বাংলাদেশে এসেছে। এবং দ্বিতীয় সারির দলকে দিয়েই বাংলাদেশকে পর্যুদস্ত করেছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অবস্থানটা তাহলে কোথায়? দেশের ক্রিকেটপ্রেমী কোনো মানুষই বোধকরি আশা করে না বাংলাদেশ প্রতিটি খেলায় জিতুক। কিন্তু তারা এটা আশা করে বাংলাদেশ হারলেও যেন লড়াই করে হারে। হ্যাঁ, বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিতীয় দিনের খেলায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দল দুর্দান্ত বোলিং করেছে। বিশেষ করে ডেব্যু খেলোয়াড় তাসকিনের অনবদ্য পারফরমেন্স বুঝিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ লড়াই করতে জানে! কিন্তু ব্যাটিং-এ কি করল বাংলাদেশ? একেকজন মাঠে যায় আর উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসে। তামিম ইকবালের মতো নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় পরপর দু’ দিন যখন একই ভুল করে তখন ভরসার জায়গাটা আর থাকে না। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের শোচনীয় পরিণতিতে সারাদেশে ক্রিকেটপ্রেমী মানুষ শোকাহত। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? বাংলাদেশ-ভারত দ্বিতীয় ওয়ানডেতে শোচনীয় পরাজয়ে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মুশফিকুর রহীম। মুশফিক বলেছেন, এভাবে হারার কোনো ব্যাখ্যা নেই। অনেক বড় সুযোগ এসেছিল। কিন্তু আমরা সুযোগটাকে কাজে লাগাতে পারিনি। একটা জাতির জন্য এরচেয়ে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না। আমারও বোধগম্য নয় কেন এমন হলো। অধিনায়ক হিসেবে আমি সবার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দল জাতীয় ঐতিহ্য ও ঐক্যের প্রতীক। দলের অধিনায়কের ক্ষমা প্রার্থনা মানেই পুরো জাতির মাথা নত হওয়া। আমরা জানি না বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে নিয়ে কর্তৃপক্ষ আসলে কি ভাবছেন? আমাদের অধিনায়ককে আমরা ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গিতে দেখতে চাই না। তাকে সবসময় উজ্জীবিত, উচ্ছসিত দেখতে চাই। এজন্য কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি, কার্যকর উদ্যোগ কামনা করছি।
লেখাটা শুরু করেছিলাম ওয়াহাবকে দিয়ে। তাকে দিয়েই শেষ করতে চাই। বাংলাদেশ-ভারত দ্বিতীয় ওয়ানডে শেষ হয়েছে। অফিস থেকে সবাই চলে গেছে। কিন্তু ওয়াহাব বাসায় যাচ্ছে না। ঘটনা কী? খোঁজ নিয়ে জানা গেল ওয়াহাব তার বন্ধুর সাথে বাজি ধরেছিল আজ বাংলাদেশ জিতবেই। বাজিতে হেরে গেছে। তাই মুখে চুনকালি মেখে অফিসের এ কোণায় বসে আছে। কাঁদছে ওয়াহাব। প্রিয় পাঠক, ওর পরাজয়ের কান্না কি আপনারা শুনতে পাচ্ছেন?
লেখক: নাট্যকার, সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক
