বলিভিয়ায় জি-৭৭ গ্রুপের শীর্ষ সম্মেলন গত রবিবার শেষ হইয়াছে। পালিত হইয়াছে এই সংস্থার ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। শেষ দিন ২৪২ দফা ঘোষণা দেওয়া হয়। দুইদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বাংলাদেশসহ ১৩৩ সদস্যরাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তা ও বহুমুখী আর্থিক সংস্থাগুলির ঋণহারসহ এক শতাধিক বিষয় নিয়া আলোচনা হয়। এইসব দেশের মূল সমস্যা দারিদ্র্য। তাই এবারকার ঘোষণায়ও সদস্য রাষ্ট্রগুলির চরম দারিদ্র্য নির্মূলে ২০৩০ সাল নাগাদ একটি নূতন লক্ষ্য নির্ধারণের প্রস্তাব তুলিয়া ধরা হয়। সম্মেলনে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সকলের অংশগ্রহণে দক্ষিণ-দক্ষিণ ও ত্রিমুখী সহযোগিতা আরও সমপ্রসারণ ও গভীর করিতে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানান। এক্ষেত্রে তিনি বেসরকারি খাতের প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করেন। তাহাছাড়া দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা উত্তর-দক্ষিণ সহযোগিতার জন্য সহায়ক হইবে বলিয়া তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি কম উন্নত বা নিম্নআয়ের উন্নয়নশীল দেশগুলির পক্ষে যথার্থই বক্তব্য রাখিয়াছেন। যেহেতু ভারত, ব্রাজিল, ভিয়েতনাম প্রভৃতি জি-৭৭ভুক্ত অনেক দেশই এখন উন্নত দেশের কাতারে শামিল হইয়াছে বা হইতে যাইতেছে, তাই তাহাদের অপরাপর অনুন্নত দেশগুলির উন্নয়নে নজর দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। বিশেষ করিয়া কৃষি, শিক্ষা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার উদীয়মান দেশগুলি বাংলাদেশসহ তুলনামূলকভাবে পিছাইয়া থাকা দেশগুলির সহিত নূতন সহযোগিতা ও বিনিয়োগ জোরদার করিতে পারে।
মূলত তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলি নিয়া জাতিসংঘ সম্মেলনের মাধ্যমে জি-৭৭ গ্রুপের পথচলা শুরু হয় ১৯৬৪ সালে। ২০১৩ সালে আসিয়া ইহার সদস্য সংখ্যা দাঁড়াইয়াছে ১৩৩। উল্লেখ্য, স্নায়ুযুদ্ধের সময় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির সমন্বয়ে গঠিত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বের বিপরীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখনও আফ্রিকা-সাউথ আমেরিকা বা এএসএ গ্রুপের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই উল্লেখ না করিয়া পারা যায় না। এই গ্রুপের আদি নাম সাউথ-সাউথ কোঅপারেশন বা এসএসসি। ১৯৭৮ সালে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও উন্নয়নের লক্ষ্যে জাতিসংঘ সাউথ-সাউথ কোঅপারেশন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করে। তবে এসব দেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করিতে শুরু করে নব্বইয়ের দশকের দিকে। জি-৭৭ভুক্ত দেশসমূহও ভৌগোলিকভাবে পৃথিবীর দক্ষিণে অবস্থিত। পৃথিবীর জ্বালানি সম্পদের বৃহদংশই এসব দক্ষিণের দেশের তথা আফ্রো-এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশের অধিকারভুক্ত। ইহাছাড়াও তাহাদের রহিয়াছে বিপুল জনশক্তি। আছে বিশাল বিজার। স্বল্পোন্নত বিশ্বের অনেক দেশের আছে সুবিস্তৃত আবাদযোগ্য পতিত জমি। ফলে কৃষিখাতে পারস্পরিক বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রহিয়াছে।
যাহা হউক, তৃতীয় বিশ্বের নেতারা মনে করেন, সর্বক্ষেত্রে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। এভাবে তাহারা আরও স্বাবলম্বী হইতে পারেন এবং দাঁড়াইতে পারেন মাথা উঁচু করিয়া। তাহারা এমনকি নূতন বিশ্বব্যবস্থা আনয়ন করিতে সক্ষম এবং সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবিত বিদ্যমান বৈষম্যপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থার প্রতিকার বা প্রতিরোধ করিতে পারেন। এসব দেশের মধ্যে নিরাপত্তা মৈত্রী গড়িয়া তোলারও পক্ষপাতী অনেকে। তাহাছাড়া প্রস্তাবের মধ্যে আছে সাউথ-সাউথ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা, যাহা আইএমএফ ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বিকল্প হইবে বলিয়াও জানা যায়। তবে নর্থ ডোনার দেশগুলি এসব দেশকে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে এবং নর্থ-সাউথ এইডকে কার্যকর করিতে গঠন করিয়াছে ট্রিঅ্যাঙ্গুলার কোঅপারেশন। তাহারা নিজেদের প্রভাব অব্যাহত রাখিতে মরিয়া। নূতন অংশীদারিত্ব সৃষ্টি, গণতন্ত্র জোরদার, বৈশ্বিক স্বাধীনতা ইত্যাদির মাধ্যমে তাহারা অগ্রসর হইতেছে। অতএব, যেকোন সময়ের চাইতে এখন নিজেদের মধ্যে বেশি করিয়া ঐক্য গড়িয়া তোলা প্রয়োজন।
