ওরা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল। ওরা কখনো স্কুলে যায়নি। এখন ওরা স্কুলে যাচ্ছে। এরা কারা? এরা ভ্যানচালক, রিক্সাচালক, দিনমজুর, কাজের বুয়া— তাদের সন্তান। এমনিসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে একটি স্কুল। দেখা গেছে, এসব শিশুদের মধ্যে ৩০% ছেলে এবং ৭০% মেয়ে। স্কুলে পড়তে এসে এখন ওদের চোখে-মুখে অনেক স্বপ্নের ছটা। ওদের স্বপ্নরাজ্য এখন অনেক বড়। ওদের ভাবনা, কেউ বড় হয়ে ডাক্তার হবে। কেউ সরকারি কর্মকর্তা হবে। কেউ ব্যবসা করবে, আবার কেউবা গ্রামের উন্নয়ন করবে। ইত্যাদি...অনেক কিছু।
ওদের এই স্কুলটি ‘সোনালী পল্লী’ জিরানী বাজার, সাভারে অবস্থিত। চারদিকে দেয়ালবেষ্টিত, বড় বড় গাছপালা নিয়ে, ছায়াঘেরা স্থানে একটি টিনের ঘর, যার আয়তন ২৭–৩৩.৫০=৩৬৫ বর্গফুট। সুন্দর একটি গ্রামীণ পরিবেশে স্কুলটি অবস্থিত। প্রতিদিন দুই শিফটে, প্রতি শিফটে ৩৪ জন ছাত্র/ছাত্রী নিয়ে স্কুলটি পরিচালিত হয়। বাসা-বাড়ির কাজ ছেড়ে দিয়ে, শিশুশ্রম বাদ দিয়ে ছোট ছোট শিশু বুকে বই জড়িয়ে ধরে স্কুলে আসে। তাদের পরণে রঙ-বেরঙের পোশাক। সহজ-সরল গরীব ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে। এ যেন, ফুটন্ত ফুলের বাগানের সাথে তুলনা করলে এতটুকু ভুল হবে না। যা আমি এতদিন কল্পনায় ভাবতাম, তাই যেন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। বেসরকারি একটি উন্নয়ন সংস্থা আমার এই ছোট্ট জায়গাটিতে ছিন্নমূল শিশুদের নিয়ে স্কুল তৈরি করেছে। বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ তথা বই, খাতা, পেন্সিল সরবরাহ ও পাঠদান করে সুবিধাবঞ্চিত ঐসব পিছিয়ে পড়া শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করে তুলছে এ সংস্থাটি।
Millennium Development Goals (MDG) মূলত ৮টি লক্ষ্যের একটি সমষ্টি। তার একটি হলো সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন। সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার প্রায় ৯৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক সাফল্যাঙ্কের নিরিখে পৃথিবীর অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এ অর্জন সত্যিই গর্ব করার মতো।
রাশিয়ার চিলড্রেন ফান্ড প্রদত্ত লেভ তলস্তয় আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদকে ভূষিত হয়েছেন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। এটা আমাদের জন্য গর্ব। প্রতিবছর শিশুদের শিক্ষা ও সেবাদানের ক্ষেত্রে তাত্পর্যপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাশিয়ান চিলড্রেন ফান্ড থেকে এ পুরস্কার দেয়া হয়। এর আগে এ পুরস্কার পেয়েছেন মাদার তেরেসা, পোলিও ভ্যাকসিনের উদ্ভাবক আলবার্ট সেবিন প্রমুখ। প্রতিভা শব্দটা কেবল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। প্রতিভাবান ব্যক্তি পৃথিবীতে প্রতিদিন আসেন না। কালে-ভদ্রে জন্মগ্রহণ করেন। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি সব সময় দেশ ও জাতির গৌরব। কঠোর পরিশ্রম ও সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনার মাধ্যমে অনেক কিছু করা সম্ভব। দেশে ব্র্যাকের বিশাল বিস্তার এবং বহির্বিশ্বে তার কর্মকাণ্ডের প্রসার সত্যিই দেশের জন্য গর্ব।
প্রত্যেক শিশুর মধ্যেই স্নেহ, মমতা ও ভালবাসার চাহিদা থাকে। প্রত্যেক শিশু সফলতা চায়। শিশুর সাথে গলার স্বর আস্তে ও নরম করে বন্ধুর মতো কথা বলতে হয়। শিশুর সাথে কথা বলতে একজন ভালো শ্রোতা হতে হয়। অর্থাত্ মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনা, কথার মাঝে বাধা না দেয়া ইত্যাদি। এছাড়া শিশুর মনস্তাত্ত্বিক চাহিদাগুলো— অর্থাত্ Acceptance তথা স্বীকৃতি, Affection তথা স্নেহ এবং Achievement তথা সাফল্য ইত্যাদি পূরণ করে শিশুকে সুখী রাখতে হবে। শিশুরা অনুকরণ প্রিয়।
একজন শিক্ষক, শিশুদের যে শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন শিশুরা তাই শিখবে। শিক্ষার্থীদের জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য কী হবে শিক্ষকরাই ছোটবেলায় তা শিখিয়ে দেবেন। ধর্মীয় নিয়ম-কানুন, আদব-কায়দা, শিষ্টাচার, বিনয়, নম্রতা, নিয়মানুবর্তিতা, দয়া, সহানুভূতি ইত্যাদি শিক্ষা দেবেন। পিতা-মাতার পরই শিক্ষকের মর্যাদা। শিশুদেরকে প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে তোলেন একজন শিক্ষক।
সবশেষে বলা, দেশে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে অনেক। সময় এসেছে ভাবার, কিসে দেশের সমৃদ্ধি হবে। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশ আজ অনেক অগ্রগামী। এ অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখার পাশাপাশি একে আরো বেগবান করতে হবে। যা আমাদের সকলের দায়িত্ব। বিশ্বের বুকে তবেই একদিন, বাংলাদেশ হবে অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়।
লেখক : এসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার, সোনালী ব্যাংক লিমিটেড
