অদ্য বিশ্ব শরণার্থী দিবস। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্রগত-আদর্শিক সহিংসার প্রকোপে পড়িয়া নিতান্ত নিরুপায় হইয়া পৃথিবীব্যাপী বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুহারা হইয়া জীবন ধারণ করিতেছে পরভূমে। ইহা এমনই এক সমস্যা যাহার দৃশ্যত কোন নিদান আছে বলিয়া মনে হয় না। সীমিত সম্পদের উপরে অসীম লোভ হইতে উদ্ভূত সংঘাতের সংস্কৃতির অবসান না হওয়া পর্যন্ত শরণার্থী শিবিরগুলি উঠিয়া যাইবার কোন ব্যবস্থা কোনদিন হইবে বলিয়া মনে হয় না।
ইউএন হাইকমিশন ফর রিফিউজিস (ইউএনএইচসিআর) এর ২০১৩ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত হিসাব মোতাবেক মানবসৃষ্ট দুর্যোগে বিশ্বব্যাপী শরণার্থীতে পরিণত হওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৯ মিলিয়ন। শরণার্থীর এই সংখ্যাবৃদ্ধি পূর্ববর্তী ছয় মাসের তুলনায় তিন মিলিয়ন অধিক ছিল। গত বত্সরের সমাপ্তি নাগাদ এই সংখ্যা ৪৫ মিলিয়ন ছাড়াইয়া যায়। শরণার্থীর সংখ্যার এহেন বৃদ্ধি গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরিতাপের বিষয় এই যে, শরণার্থীর সংখ্যা কমিয়া যাইবার তেমন কোন সম্ভাবনা চলতি বত্সরেও দেখা যাইতেছে না। বরং মধ্যপ্রাচ্যসহ নানান স্থানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ক্রমশ বাড়িতে থাকিবার কারণে শরণার্থীর সংখ্যাও পাল্লা দিয়া বাড়িয়া যাইবার আশঙ্কা করিতেছেন বিশ্লেষকেরা। সর্বশেষ হিসাব মোতাবেক শরণার্থী গ্রহণকারী তালিকার প্রথম পাঁচটি দেশ হইতেছে যথাক্রমে পাকিস্তান, ইরান, জর্দান, লেবানন ও কেনিয়া। ইহাদের মধ্যে পাকিস্তানে আশ্রয় লওয়া শরণার্থীর সংখ্যা দেড় মিলিয়নের অধিক। পক্ষান্তরে, শরণার্থী প্রেরণকারী দেশগুলির শীর্ষে রহিয়াছে আফগানিস্তান। এই দেশটির আড়াই মিলিয়নের অধিক মানুষ বিভিন্ন দেশের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় লইতে বাধ্য হইয়াছে। তালিকার শীর্ষ পাঁচের পরের দেশগুলি হইতেছে যথাক্রমে সিরিয়া, সোমালিয়া, সুদান ও কঙ্গো।
জাতিসংঘের হিসাব মোতাবেক গত বত্সরে বিশ্ব জুড়িয়া দৈনিক গড়ে ২৩ হাজার মানুষ শরণার্থীর জীবন বাছিয়া লইতে বাধ্য হইয়াছিলেন। ২০১২ সাল পর্যন্ত শরণার্থীদের মধ্যে নারী ও শিশুদের সংখ্যা যথাক্রমে শতকরা ৪৮ ভাগ ও ৪৬ ভাগ। আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশনের তথ্য মোতাবেক সিরিয়া ও সোমালিয়া হইতে শরণার্থী হওয়া মানুষের মধ্যে শিশুর সংখ্যা যথাক্রমে ৫০ ভাগের অধিক ও প্রায় ৬০ ভাগ। এইবারের বিশ্ব শরণার্থী দিবসের প্রাক্কালে আসিয়া শরণার্থী বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির মধ্যে ব্যাপকমাত্রায় উদ্বেগ দেখা দিয়াছে। বিশেষ করিয়া সিরিয়া, দক্ষিণ সুদান, সোমালিয়ার মত দেশগুলিতে বিরাজমান পরিস্থিতির কারণেই উত্কণ্ঠার মাত্রা বাড়িয়া চলিয়াছে। উল্লেখ্য, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে কেবল সিরিয়া হইতে শরণার্থী হওয়া মানুষের সংখ্যা তিন মিলিয়নে যাইয়া ঠেকিতে পারে বলিয়া ধারণা করা হইতেছে।
শরণার্থীর জীবন হতভাগ্যের জীবন। শরণার্থী মানুষেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আশ্রয় লয় পরদেশে। শরণার্থী শিবিরগুলিতে তাহারা বাস করে মানবেতর পরিবেশে। দারিদ্র্য ও স্থানীয় মানুষদের নিন্দা-মন্দ হয় তাহাদের ললাট লিখন। অনেক দেশেই শরণার্থী শিবিরগুলিকে ঘিরিয়া গড়িয়া উঠে অবৈধ বাণিজ্য। অপরাধী চক্রগুলিও নানা কারণে আস্তানা গাড়ে শরণার্থী শিবিরগুলিতে। কোন কোন দেশে শরণার্থী শিবিরগুলিতে অস্ত্র-মাদকসহ নানা প্রকারের অবৈধ ব্যবসার বিস্তার ঘটে বলিয়াও শুনিতে পাওয়া যায়। শিশুদের শৈশব চুরি হইয়া যাওয়া, নারীর সম্ভ্রমহানির ঘটনা দেশে-দেশে শরণার্থী শিবিরগুলিতে হামেশাই ঘটিয়া থাকে। মোটকথা, মানবতার যাবতীয় লাঞ্ছনা সম্পন্ন হয় শরণার্থী শিবিরগুলিতে। এই যে মানবেতর বাস্তবতা তাহার জন্য শরণার্থীরা কিন্তু দায়ী নহে। তাহারা সুখে-দুঃখে সাধারণ জীবন কাটাইতেছিল। আচম্বিতে একদিন রাজনীতির দাবা খেলা রক্তের হোলি খেলাতে পরিণত হইলে এই মানুষেরা জীবন বাঁচাইবার তাগিদে শরণার্থী হইয়া যায়। আর যাহারা খেলা খেলিতেছিল তাহারা খেলিতেই থাকে, খেলিতেই থাকে। খেলা একদিন শেষ হয় বটে। কিন্তু ততদিন অসংখ্য মানুষের জীবন আজীবনের মত পাল্টাইয়া যায়। হায়! কি নিদারুণ এই পৃথিবী!
