পরীক্ষা, ফলাফল, ভর্তি এবং অবশেষে...

আপডেট : ২০ জুন ২০১৪, ২০:৩২
দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা-সংক্রান্ত কতকগুলো প্রশ্ন মাথার মধ্যে তালগোল পাকাচ্ছিল। কোনটারই সঠিক জবাব মিলছিল না। মনে হচ্ছিল, বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষা-ব্যবস্থা নিয়ে কেন কেউ ভাবছে না, কথা বলছে না? অবশেষে দৈনিক ইত্তেফাকের ৯ মে ২০১৪ তারিখের ড. জাফর ইকবালের ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস কী অপরাধ নয়’ ? এবং আব্দুল্লাহ আল নোমানের ২৪ মে ২০১৪ তারিখের ‘পাবলিক পরীক্ষার এই হাল কেন’ ? — দুটো লেখা থেকে বুঝলাম আরো কারো কারো মধ্যেও এই প্রশ্নগুলো জেগেছে। ইদানিংকার পাবলিক পরীক্ষাগুলোর পাসের হার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা সুখের কথা। কিন্তু ছাত্রদের মান যদি যাচাই করতে যান, ফ্যাকড়া সেখানেই। ফলাফল একেবারে খারাপ নয়, ২.৫/৩.০ পয়েন্ট নিয়ে যখন ছাত্ররা কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তখন শিক্ষকদের তাদের পড়াতে গিয়ে মনে হয় — ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি। এ পর্যায়ে তাদের ভাষাজ্ঞান তৈরি করে দেয়া কী সম্ভব ? ভাষাজ্ঞান একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যা চর্চার মধ্যদিয়ে শাণিত হয়। কিন্তু এদের সে অভ্যাস একেবারেই নেই। এরা যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষাতেই লেখন লেখে। বাক্য ঠিক করে লিখতে পারে না। কোন্ শব্দের কী অর্থ, না বুঝেই পরীক্ষার খাতায় যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করায় শেষপর্যন্ত তা থেকে কোন বক্তব্য উদ্ধার করা যায় না। পড়া না বুঝে মুখস্থ করতে গিয়ে এমন কিছু লিখে ফেলে, যা পূর্বে বলে আসা কথাগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত। কীভাবে নম্বর দেবেন? বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব ছাত্র-ছাত্রী পড়াশুনা করে, তাদের অভিভাবকরা সবাই ধনী নয়, অধিকাংশই অনেক কষ্ট করে সন্তানের অর্থের যোগান দেন। এদের সন্তানরা ফেল করলে সন্তান নয়, সেই অভিভাবকের অসহায় মুখচ্ছবিই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ছাত্র-ছাত্রীদেরই-বা কতটুকু দোষ ? হয়তো ভাল শিক্ষক নেই, শিক্ষার পরিবেশ নেই, অভিভাবক অশিক্ষিত, গাইড করার মতো কেউ নেই, সামনে কোন আদর্শ নেই, উদ্দেশ্য নেই, উপরন্তু পরীক্ষা পাসের জন্য সামনে যেসব রসালো মুলো ঝুলছে, তাতেই তারা আকৃষ্ট হচ্ছে। তারপর গড্ডালিকায় ভাসতে ভাসতে যেখানে আশ্রয় মেলে। উচ্চতর শিক্ষাক্ষেত্রেও এরা আসে নকলের আশায়। কখনও আশা পূরণ হয়, কখনও হয় না। ফলে নকল করে ধরা পড়ে, বহিষ্কার হয়, ফেল করে এবং একসময় এভাবেই শিক্ষাজীবন শেষ হয়। আর যারা টেনে-হিঁচড়ে পার হয়ে যায় অথবা টাকার বদৌলতে নামসর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনভাবে সার্টিফিকেট ক্রয় করে, তারা এদেশে প্রচলিত ওপেন সিক্রেট নানা পন্থায় ঠিকই উপরে উঠে যায়। কারণ, শুধু স্কুল-কলেজের পরীক্ষাতেই নয়, নিয়োগ-পরীক্ষাতেও অবাধে চলছে প্রশ্নফাঁস এবং নিয়োগ-বাণিজ্য। আর রাজনীতির ময়দানে যদি কেউ ঢুকতে পারে, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানবান করে, মুক্তচিন্তার অধিকারী করে, সত্য, ন্যায়, যুক্তি ও কল্যাণের পথ দেখায়, উদার ও বিনয়ী করে, মানবতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে, দেশপ্রেম শেখায় এবং আপন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে। বাংলাদেশের এই চলতি শিক্ষা কী এ অর্থ বহন করে ? বরং আজকাল শিক্ষা হয়েছে সার্টিফিকেট অর্জনের মন্ত্র আর সার্টিফিকেট হয়েছে টাকা উপার্জনের যন্ত্র। আমাদের সন্তানরা কী এ পথেই হাঁটছে ? ওদের নতুন পথ দেখাতে হবে — এটা আমাদেরই দায়িত্ব। আমার ছেলে গত এস.এস.সি-তে পরীক্ষার্থী ছিল। একটা করে প্রশ্ন ফাঁস হয়, আর তার মুখে হতাশা শোনা যায় —‘ আম্মু সারাবছর পড়ে কী হলো ? সেই তো প্রশ্ন আউট হয়ে গেল।’ পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেল, সে গোল্ডেন এ+ পেয়েছে। কাজেই সব কষ্ট ভুলে গেল। কিন্তু যখনই শুনতে পেল — ‘গোল্ডেন এ+ পাওয়া নাকি আজকাল ডাল-ভাত, এমনকি চেয়ার-টেবিলও পাস হয়ে যাচ্ছে’, তখন আরেক কষ্ট। অপরাধ না করেও ওরা এক ধরনের ভুক্তভোগী। কারণ, ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দিয়ে কে পাস করেছে, তা তো কারো গায়ে লেখা নেই। অন্যদিকে নকলের যে অভিনব পন্থা (আব্দুল্লাহ আল মামুনের লেখায় পাওয়া যায়) আবিষ্কৃত হয়েছে এবং যাকে প্রশ্রয় দিয়ে আবার লালন-পালন করা হচ্ছে, তাও উদ্বেগজনক। এই ছোট চারাগাছটিকে এখনই উপড়ে না ফেললে প্রশ্নফাঁসের মতো তা মহীরুহে রূপ নেবে। দুঃখের বিষয়, সাধারণের মধ্যে এসবের প্রতিক্রিয়া যেমন হওয়ার কথা, তেমনটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোথায় যেন একটা নীরব সম্মতি রয়ে গেছে। আর সুখের কথা, কিছু মানুষ জেগেছে। কিন্তু এ জাগার অর্থ কেবল পত্র-পত্রিকায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ড. জাফর ইকবালের মতো মাঠে নামতে হবে। সরকার তথা শিক্ষামন্ত্রীর উপর যথার্থ চাপ সৃষ্টি করতে হবে। কেবল তারা মনে-প্রাণে চাইলেই প্রশ্নফাঁস তথা নকল বন্ধ সম্ভব, নতুবা নয়। কারণ, যে প্রশাসনযন্ত্র প্রশ্নফাঁসে সহায়তা করে, সে প্রশাসনযন্ত্রের চাবি তাদেরই হাতে। এতদিন প্রশ্নফাঁসকে শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে গুজব বলে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এবারের এইচ.এস.সি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের কথা স্বীকার করা হয়েছে এবং সেই ফাঁসকৃত প্রশ্নের পরীক্ষার তারিখও পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। কাজেই এবার প্রতিকার চাই। আমাদের নতুন প্রজন্মকে আর মেধাশূন্য করে দুর্নীতির পথে এগিয়ে দিতে দেয়া হবে না। ছোট দুর্নীতি বড় দুর্নীতিকে সহায়তা করে—যা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে প্রকম্পিত করে তোলে, এখনও তুলছে। আর কত? এসব কোমলমতি শিশুকে রক্ষা করুন—রক্ষা করুন দেশকে, জাতিকে। লেখক:সহকারী অধ্যাপক, ভাষা-যোগাযোগ ও সংস্কৃতি বিভাগ গণ বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন