বৈষম্যের সঙ্গে বাড়ছে দারিদ্র্য

আপডেট : ২১ জুন ২০১৪, ২০:৪৪
বিগত বেশ কিছুদিন যাবত্ আমাদের ব্যবসা জগতে কিছু অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে বিরূপ প্রভাব। বিশেষ করে মুদ্রা, ব্যাংক এবং শেয়ার বাজার নিয়ে অনিয়ম স্মরণকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় অর্ধ লক্ষ বেকার যুবক। ১৬ কোটি মানুষের দেশে এক অর্থবছরের বাজেট ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার অর্থনীতিতে যদি এক ব্যাংক থেকে লুটপাট হয় ৪ হাজার কোটি টাকা এবং দেশের অর্থমন্ত্রী যদি বলেন ‘এই ৪ হাজার কোটি টাকা আমাদের জন্যে তেমন কিছু নয়’, অতঃপর লুটপাট ধরা পড়ার পরে যদি অর্থমন্ত্রী বলেন যে ‘এ থেকে আমরা উপকৃত, শিক্ষা নিতে পারছি’ তাহলে আমাদের অনুুমান করতে কষ্ট হয় না যে সরকারের ব্যবস্থাপনা কত সুন্দর(!)। সম্প্রতি আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো বাঁচাতে আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকা মূলধন হিসাবে দিচ্ছে সরকার’। উল্লেখ্য চলতি অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে দেয়া হয়েছে ৪ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। গৌরী সেনের টাকা দিতে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কষ্ট লাগার কথা নয় এবং কথায়ও কষ্ট লাগার প্রমাণ পাওয়া যায় না। জনগণের সম্পদে সরকারের দাবি আছে কিন্তু গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাজে বা জনগণের টাকা সরকার ব্যয় করবে কোথায় বা কতটুকু পরিমাণে তা জানতে পারবে না, বা জানার অধিকার নেই করদাতাদের। অবশ্য সরকারের দাবি তারা জনসমর্থিত এবং বড় শক্তিশালী। আমাদের সরকারের ব্যবহার, কথায় মনে হয় নির্বাচনী ম্যানিফেস্টুই জনগণের কাছে একমাত্র প্রতিশ্রুত অঙ্গীকার। আমাদের বর্তমান টালমাটাল অর্থনীতি নিয়ে আলোচনায় অনেকে ধারণা প্রকাশ করেন যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় সরকার কর্তৃক নিয়োগতকৃত বোর্ড ই সকল অপকর্মের জন্মদাতা। সবার প্রতি সম্মান দিয়ে বলতে চাই যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক বা সংস্থার নিয়োগকর্তা কে? আমার সাথে সবাই একমত হবেন যে, মালিক যেহেতু সরকার সে কারণে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থার এক পর্যায়ের নিয়োগকর্তা অবশ্যই সরকার। এমনকি ব্যক্তি মালিকানাধীন সংস্থা যখন বড় বা কার্যাবলী যখন বেশি তখন মালিকের পক্ষে সব কাজ করা সম্ভব হয় না বিধায় মালিকের পক্ষে কাজ করার লোক দরকার হয়। আর এই পর্যায়ে নিয়োগের প্রসঙ্গ চলে আসে। নিয়োগকৃত কর্মকর্তার সক্ষমতার উপর নির্ভর করে কাজের সফলতা। অবশ্য সততাও বিবেচ্য বিষয়। রাজনৈতিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারের সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব থাকাই স্বাভাবিক। যে সরকার নিয়োগে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিবে না এবং নিয়োগে ‘বাণিজ্য’ বন্ধ করতে পারবে না সে সরকারের আমলে ‘হল-মার্ক গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও বেসিক ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা’ বিষয়ক সংবাদ প্রকাশে সরকারের মাননীয় অর্থমন্ত্রীর মন্তব্য ‘কোন ব্যাপার নয়’ শুনতে হবে আমাদেরকে। কারণ পদপ্রার্থী যদি তদবির বা টাকার বিনিময়ে নিয়োগ পায় তাহলে নিয়োগের পর তার প্রথম এবং প্রধান উদ্দেশ্য থাকে তার স্বার্থ যথাসম্ভব নিশ্চিত করা। সমাজে যদি এ অবস্থা বিরাজমান থাকে তাহলে দুর্নীতির পাশাপাশি মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাজের প্রশংসা করে সমাজের একটি অংশের বাহাবাও প্রচার হবে সংবাদপত্রে। কাজের কাজ হবে আলোচনা। কোটি টাকা সম্পদের মালিকের সংখ্যা বাড়লেও দেশের অধিকাংশ জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না। সমাজের যুবক সম্প্রদায়ের চাকরির নিশ্চয়তা না থাকলে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও যেমন ট্রলারে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে কর্মের সংস্থানে বের হবে তেমনি রাজনৈতিক দলের ব্যানারে সুযোগ নিবে বা দিতে বাধ্য থাকবে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার। মনে রাখতে হবে বেকার যুবকের সবচেয়ে সহজ আশ্রয়স্থল রাজনৈতিক দল। সামাজিক বৈষম্য রোধ করতে না পারলে ‘পার ক্যাপিটা ইনকাম’ যত বেশিই হউক না কেন সমাজের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত জনগণের সংখ্যা তেমন হ্রাস পাবে না। দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের সকল কার্যক্রমই শ্লোগান নির্ভর হতে বাধ্য। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল এর আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের ঋণের পরিমাণ যেমন বাড়তে থাকবে তেমনি বাত্সরিক বাজেটে ঋণ পরিশোধের পরিমাণও বাড়তে থাকবে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকার বাজেটে ৩১ হাজার ৪৩ কোটি টাকা ঋণের সুদ পরিশোধ খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন, যা মোট বাজেট প্রস্তাবের ১২.৩৯%। শিক্ষা প্রসারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় খাতে ১৫ হাজার ৫৪০ (৬.২০%) কোটি টাকা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় খাতে ১৩ হাজার ৬৭৩ (৫.৪৬%) কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রী। ১৬ কোটি মানুষের দেশে এক তৃতীয়াংশ যখন তার খাদ্য ক্রয় করার ক্ষমতা রাখে না- এ রকম অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই অর্থবছরে মোট ১১.৬৬% (৬.২০%+৫.৪৬%) বাজেট প্রস্তাব রাখা হয়েছে শিক্ষা খাতে। বর্তমান শিক্ষানীতির ফলে শিক্ষার সব স্তরে ছাত্র-শিক্ষক রেশিও দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সব বৃদ্ধি মঙ্গলজনক নয় এ হিসাব মনে রাখতে হবে। শিক্ষার মানের সাথে বাজেট অপেক্ষা দায়িত্বশীলতার সম্পর্ক বেশি। বড় দুর্ভাগা এদেশের সাধারণ মানুষ। রক্ত দিয়ে স্বাধীন করেও স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়ার অপেক্ষায় ৪৩ বছর পার করতে চলেছে। আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে স্বাধীনতার চেতনা বাস্তবায়নে? সমস্যা সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নয় সমস্যা সরকারের ভুল সিদ্ধান্তে। লেখক :এফসিএ ও অর্থনীতি বিশ্লেষক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন