দুর্গতদের কাছে পৌঁছানো

আপডেট : ২১ জুন ২০১৪, ২০:৪৭
জোবেদা (৪৫) ইতোমধ্যেই বন্যা ও নদী ভাঙনের কারণে ১০ বার বাসস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। তার স্বামী আবার বিয়ে করার পর কুড়িগ্রামের একটি নদী তীরবর্তী ফুলার চরে তার জীবনধারণ কষ্টকর হয়ে পড়ে। বুয়ার কাজ করে দৈনিক মাত্র ১০-২০ টাকা আয় করে নিজের জন্য ও তার কন্যার জন্য খাবার জোটানো তার কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। নারী প্রধান পরিবারে জোবেদা ও তার মেয়ে ছিল বিপদাপন্ন। উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশে এমন শত শত হাজার মানুষ বাস করে এই এলাকা হচ্ছে দেশের দরিদ্রতম বহু লোকের ঠিকানা যেখানে অস্থায়ীত্ব, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং স্বল্প, অস্থিতিশীল আয় তাদের প্রতিনিয়ত জীবনযাপনের বাস্তবতা। নদী তীরবর্তী চরগুলো তৈরি হয় নদী ভাঙনের ফলে। পশ্চিমে ধাবমান যমুনা নদী তার তীরবর্তী এলাকায় যে ভাঙা গড়ার খেলা খেলে, তার ফলে প্রায় প্রতি বছর বন্যা হয় এবং অনেক পরিবার উপায়হীন হয়ে বাড়ির ছাদে বাস করতে শুরু করে। এর কারণেই প্রতিনিয়ত চর পুনর্গঠন হয়। এমন অস্থায়ী চর এবং মূল জমি থেকে তাদের বিছিন্ন হওয়ার কারণ খারাপ অবকাঠামো, যোগাযোগ এবং বাজার সেবা সুবিধায় সীমিত সুযোগ, তারপরও যমুনা চরের বেশিরভাগ জায়গা জুড়েই বসবাস ও চাষাবাদ চলে। কর্মসংস্থান ও জীবিকানির্বাহের সীমিত সুযোগের কারণে অধিকাংশ চরবাসী জমি থেকে নগণ্য আয় নিয়ে বেঁচে থাকে। জমির প্রতি নির্ভরতা সবচেয়ে স্পষ্ট আকার ধারণ করে মৌসুমী খাদ্যাভাবের সময়, যাকে বলা হয় ‘মঙ্গা’। এটি হয় আমন ধান লাগানোর ও কাটার মাঝামাঝি সময়টায়, যখন তেমন কোন কৃষি কাজ করার সুযোগ থাকে না। এই সময় অনেক চরবাসী জীবিকা পাল্টিয়ে কাজ খোঁজে। এই সমস্ত কারণে চরবাসীর অতিদারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার খুব কম সম্ভাবনা থাকে। চর জীবিকা কার্যক্রম (সিএলপি) প্রায় ১ মিলিয়ন অতিদরিদ্র পুরুষ মহিলা ও শিশু যারা চরে বাস করে তাদের জীবিকা, আয় ও খাদ্য নিরাপত্তার উন্নয়নের চেষ্টা করে। এটি করা হয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ বৃদ্ধি, আর্থিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি হ্রাস ও বাজার সেবা গ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে। চরবাসীদের এই অনিশ্চিত জীবনকে আরও বিস্বাদ করে দেয়। তাদের স্থাবর-অস্থাবর, সামাজিক ও আর্থিক সম্পদের অভাব, মধ্য সেপ্টেম্বর ও মধ্য নভেম্বর মাঝের সময়ের যে মৌসুমী কর্মহীনতা আসে সেটির সাথে খাপ খাইয়ে চলতে গিয়ে তারা তাদের যে সামান্য সম্পদ আছে সেটি বিক্রি করে দেয় এবং খাদ্যের জন্য অর্থ ধার নেয়। ফলে তারা তাদের সামান্য সঞ্চয় ও সম্পদকেও হারিয়ে সহায় সম্বলহীন হয়ে পড়ে। বাত্সরিক বন্যার সময় পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং নিরাপদ খাবার পানির সংকট দেখা দেয়। চরবাসীদের পরিবেশগত ঝুঁকি এড়াতে সিএলপি তাদের বাড়িগুলোকে স্বাভাবিক বন্যার স্তর থেকে ৬০ সে.মি. উপরে যেটা কিনা সর্বোচ্চ বন্যার পানির স্তরেরও উপরে সেখানে বসিয়েছে বন্যা সমস্যা এড়াতে এবং নিরাপদ খাবার পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার ব্যবস্থা করেছে। সিএলপি’র কৌশলের মূল দিকটি হচ্ছে পরিবারগুলোর পছন্দ অনুযায়ী একটা আয় অর্জনকারী সম্পদ হস্তান্তর। সম্পদের মূল্য ১৬,০০০ টাকা। ৯৯% পরিবারই বেছে নেয় গবাদি পশুকে যেহেতু একে নিরাপদ বিনিয়োগ ভাবা হয় এবং তাদের গতিশীলতার কারণে তারা ভ্রমণশীল চরজীবনের উপযুক্ত। সিএলপি অংশগ্রহণকারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে যাতে তারা তাদের সম্পদ থেকে আয় করতে পারে এবং তাদের যাতে বিপদের সময় সম্পদ বিক্রি করতে না হয় এজন্য একটা মাসিক ভাতা দেয়। একটা সিএলপি জরিপের মতে পরিবারগুলোর সম্পদের মূল্য এবং গড় আয় বেড়েছে এবং পরিবারগুলো সিএলপি এর ঋণের সাহায্যে সম্পদ বানাতে পারছে। বস্তুগত সম্পদের হস্তান্তরই সহনশীল উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট না। সিএলপি সম্পদ হস্তান্তরকে সামাজিক উন্নয়নমূলক দলগত সভার সাথে পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করে যা সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক বৃদ্ধি করে, অংশগ্রহণকারীদের নাগরিক অধিকার ও আইন সচেতনতা বাড়ায় এবং স্বাস্থ্যজ্ঞান, স্বাস্থ্যসম্মত জীবন-যাপন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জ্ঞান বাড়ায়। এই বর্ধিত সামাজিক মূলধন সম্প্রদায়কে সংঘবদ্ধভাবে সরকারকে পাশে আনতে এবং খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দাবি জানাতে সমর্থ করতে গুরুত্বপূর্ণ। এই সমস্ত বিষয় এখন দূরবর্তী ও অনুন্নত চরের জন্য পূরণ না হওয়া চাহিদা হয়ে রয়েছে। চরগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা সীমিত এবং অনেক চরবাসী ঐতিহ্যগতভাবে ‘কবিরাজ’দের উপর নির্ভরশীল। সিএলপি সাম্প্রদায়িক স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয় ও অর্থায়ন করে স্যাটালাইট স্বাস্থ্য ক্লিনিক চালানোর জন্য স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টি ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য। কিছু এলাকায় সিএলপির কার্যক্রমের মেয়াদ যেহেতু শেষ হয়ে আসছে, পরবর্তীতে সিএলপি যখন কিছু এলাকা চিহ্নিত করবে তখন ব্র্যাক চরগুলোতে যাবে এবং সিএলপি মডেলের মত করে স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে যাবে। চরবাসীদের বাজার প্রবেশ ও সম্পর্ক উন্নয়ন তাদের জীবিকানির্বাহের উপায় বাড়াতে জরুরি। সিএলপি মূলত মনোযোগী বাজার ব্যবস্থা যা কিনা গবাদি পশুর জন্য তা উন্নয়ন করে লাভজনক সুযোগ সৃষ্টি করতে। এটি করা হয় চরের অনিশ্চিত জীবনকে লক্ষ্য করে। এর মধ্যে আছে গবাদি পশুর খাদ্য তৈরি, দুধ বাজারজাতকরণ, হাঁস-মুরগি পালন, গবাদি পশু সেবাদানকারীদের প্রশিক্ষণ এবং হাঁস-মুরগির টিকাদান এবং গ্রামের সঞ্চয় ও ঋণদান গ্রুপ করাসহ অনেক ধরনের প্রকল্প। চরবাসীদের মৌসুমী শ্রমের উপর নির্ভরতার ফলে যখন মঙ্গার সময় কৃষিশ্রম কম থাকে তখন অনেক পরিবার খাদ্যের অনিরাপত্তায় ভোগে। সিএলপি একটি ‘কাজের বিনিময়ে টাকা’ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে যেটি বাড়ির মূলস্তম্ভ তৈরির কাজে এলাকার শ্রমিকদের ব্যবহার করে। সিএলপি সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে যারা আছে যেমন বিধবা এবং প্রতিবন্ধী যারা কাজ করতে অক্ষম এই সময়ে তাদেরকে নিরাপত্তার জন্য অর্থ দেয়। দুর্বল যোগাযোগ, বাজার প্রবেশের সীমিত সুযোগ এবং মূল সেবাসমূহে ব্যবহারের সীমিত সুযোগ, দৈনিক শ্রম ও মৌসুমী স্থানান্তর আর তার সাথে পরিস্থিতি আরও বিষিয়ে তুলতে নদী ভাঙন এবং বার্ষিক বন্যা চরবাসীদের একটা চরম সংকটে ফেলে দেয়। সিএলপি পরীক্ষা করে দেখেছে যে এই সকল মানুষের জীবিকা উন্নয়নে প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করা সম্ভব। সেখানে প্রকৃতপক্ষে সরকার ও অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার এই চ্যালেঞ্জের প্রতি সাড়া দিয়ে চরবাসীর জীবন উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে, যারা বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র নাগরিক এবং সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ক্ষুধা ও দরিদ্র দূরীকরণে ভূমিকা রাখতে পারে। লেখকবৃন্দ: চর লাইভলিহুড প্রোগ্রামে কাজ করেন। ই-মেইল : [email protected], [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন