চিকিত্সকদের দায়িত্বশীলতা

আপডেট : ২২ জুন ২০১৪, ২০:৫৭
কর্মস্থলে অনুপস্থিত চিকিত্সকদের প্রতি আবারও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলিয়াছেন যে, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকিলে তাহাদের চাকুরী স্থায়ী করা হইবে না। পদোন্নতি বন্ধ থাকিবে। এমনকি চাকুরীও হারাইতে পারেন তাহারা। গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহিত মতবিনিময়কালে তিনি এই মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী একইসাথে চিকিত্সকদের সরকারি চাকুরীর শর্ত এবং সমাজ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার কথাও স্মরণ করাইয়া দিয়াছেন। চিকিত্সক মাত্রই জানেন যে, চিকিত্সা নিছক একটি পেশা মাত্র নহে, ইহা একটি ব্রতও বটে—যাহার মূল উদ্দেশ্য হইল অসুস্থ মানুষকে সেবা প্রদান করা। সুবিদিত এই সত্যটির পুনরাবৃত্তি করিয়া চিকিত্সকদের উদ্দেশে তিনি খোলাখুলিই বলিয়াছেন যে, তাহাদের পিছনে যে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়, তাহা আসে কৃষক ও খাটিয়া খাওয়া মানুষের ট্যাক্সের টাকা হইতে। অতএব, কর্মস্থলে উপস্থিত থাকিয়া দরিদ্র জনগণের সেই ঋণ শোধ করা চিকিত্সকদের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। কাকতালীয়ভাবে বঙ্গবন্ধুও ঠিক একই কথা বলিয়াছিলেন ১৯৭৫ সালে প্রদত্ত তাঁহার গুরুত্বপূর্ণ এক বক্তৃতায়। তিন যুগেরও বেশি সময়ের ব্যবধানে প্রদত্ত দুইটি বক্তব্যের মর্মগত যে-অভিন্নতা তাহাতে তাত্পর্যপূর্ণ দুইটি ইঙ্গিত রহিয়াছে। প্রথমত, উভয়ের বক্তব্যেই মূলত জনগণের অভিপ্রায়েরই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছে। দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতার উষালগ্নে যেই বিষয়টি বঙ্গবন্ধুকে ব্যথিত করিয়াছিল, চার দশক পরেও সেই অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয় নাই। পরিবর্তন যে হয় নাই তাহার উদাহরণ ভূরি ভূরি। ইতঃপূর্বেও চিকিত্সকদের এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করিয়াছিলেন। সতর্কবার্তাও উচ্চারণ করিয়াছিলেন কর্মস্থলে অনুপস্থিত চিকিত্সকদের উদ্দেশে। তাহাতে কাজ হইলে প্রধানমন্ত্রীকে নিশ্চয় একই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করিতে হইত না। চিকিত্সকদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশই যে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না, প্রায় সকল স্বাস্থ্যমন্ত্রীই অকপটে তাহা স্বীকার করিয়াছেন। স্থানীয় পর্যায়ের এই সমস্যা লইয়া ত্যক্তবিরক্ত জনপ্রতিনিধিরা জাতীয় সংসদেও বিষয়টি উত্থাপন করিয়াছেন একাধিকবার। সংবাদপত্রে প্রায়শ তাহার বিবরণ এবং রোগীদের ভোগান্তির খবর প্রকাশিত হয়। এমনকি এই সম্পাদকীয় যখন লেখা হইতেছে, সেই শুক্রবারের ইত্তেফাকেও অনুরূপ একটি সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে। ইত্তেফাক-এর দৌলতপুর সংবাদদাতা জানাইয়াছেন যে, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ৫০ শয্যার হাসপাতালে ৩৪ জন চিকিত্সকের স্থলে কর্মরত আছেন মাত্র ৩ জন। প্রায় ৭ লক্ষ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের পর্বতপ্রমাণ দায়িত্ব বর্তাইয়াছে তাহাদের উপর। অন্যান্য উপজেলার চিত্রও যে খুব একটা ভিন্ন নহে—তাহা সহজেই অনুমেয়। ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ে চিকিত্সকদের দায়িত্ব পালনে অনীহার অসংখ্য কারণ থাকিতে পারে। তাহার যৌক্তিকতাও হয়তো আছে। কিন্তু সরকারি চাকুরী যাহারা গ্রহণ করিয়াছেন তাহারা নিশ্চয় এই চাকুরীর শর্ত ও বাধ্যবাধকতার বিষয়টি জানিয়াই স্বেচ্ছায় তাহা করিয়াছেন। কেহ তাহাদের বাধ্য করে নাই। বরং চাকুরীর জন্য ব্যাকুল বহু চিকিত্সকের দীর্ঘশ্বাস মাড়াইয়াই তাহারা পদটি করায়ত্ত করিয়াছেন। অতএব, এই ক্ষেত্রে অজুহাত দেখাইবার কোনো অবকাশ নাই। দরিদ্র দেশ। এমনিতেই গ্রামাঞ্চলে জনসংখ্যার তুলনায় চিকিত্সক অপ্রতুল। সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সক অনুপস্থিত থাকিলে যে প্রাইভেট ক্লিনিক বা চিকিত্সকের শরণাপন্ন হইবেন সেই সামর্থ্যও বেশিরভাগ মানুষেরই নাই। চিকিত্সকরাও এই মাটিরই সন্তান। দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার খবর তাহারা রাখেন না—ইহা বিশ্বাস করা কঠিন। তদুপরি, তুলনামূলকভাবে মেধাবী সন্তানরাই যে চিকিত্সক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করিয়া থাকেন—তাহাও অবিদিত নহে। তাহাদের দায়িত্বের কথা কেন মনে করাইয়া দিতে হইবে কিংবা শাস্তির ভয়ই-বা দেখাইতে হইবে কেন? চিকিত্সক হিসাবে জনগণের প্রতি তাহাদের দায়বদ্ধতার বিষয় তো আছেই। সর্বোপরি, দেশের কৃতী সন্তান হিসাবেও প্রতিটি ক্ষেত্রে তাহারা সুনাগরিকের স্বাক্ষর রাখিবেন ইহাই প্রত্যাশিত।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন