পাট শিল্পে সুবাতাস বইবে কি

আপডেট : ২২ জুন ২০১৪, ২০:৫৮
পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনার দাবি এদেশের কৃষকদের দীর্ঘদিনের। ফিরে আসবে কি পাটের সেই সুদিন? প্রশ্ন হলো এ শিল্প ঘিরে কেবলই যে হতাশাব্যঞ্জক চিত্র তা কাটবে কিনা। সহসা কি খুলবে বন্ধ পাটকলগুলোর তালাবদ্ধ দরজা? আগেকার মতো আলোক রশ্মি অন্ধকার পাটকল চত্বরে ঠিকেড় পড়ুক এটাই দেশবাসী চায়। এ চাওয়া এদেশের আম কৃষকদের বৈকি। এরই মধ্যে পাটের আন্তর্জাতিক বাজার চলে গেছে ভারতের হাতে। এ শিল্পে যে আর কোন সম্ভাবনা নেই, আমাদের কৃষকরাও তা বুঝে গেছে। তবুও মাঝে মধ্যে দু’একটা সুসংবাদ আশার সঞ্চার করেছে বৈকি। অল্প-স্বল্প হলেও দেশের পাট শিল্প ঘিরে সুবাতাস বয়। কিন্তু তা কতটা স্থায়ী হয় কিংবা হবে। তবে অদৌ হবে কিনা সেটাই এখন প্রশ্ন। মানুষ এখন পরিবেশ রক্ষায় আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তাই মানুষ পাটজাত পণ্যের প্রতি পুনরায় অধিকতর আগ্রহী হয়ে উঠেছে। মানুষের এই আগ্রহ ও চাহিদাকে ধরে সরকার নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করে এ খাতকে পুনরায় চাঙ্গা করার আরও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ নিলে তা ব্যর্থ হবে না। কিন্তু এজন্য চাই দূরদর্শী কার্যকর উদ্যোগ। যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাতে সম্ভাবনা অনেক। কিন্তু গৃহিত প্রতিটি সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপ দিতে হবে। হতাশার কথাও বলতে হয়। ইতোপূর্বে পাটের তৈরি ব্যাগ ছাড়া কোনো পণ্য পলিথিন বা অন্য কোন জিনিস দিয়ে প্যাকিং করা যাবে না বলে পাটজাত মোড়ক ব্যবহার বিল-২০১০ বিলটি পাস হয়েছে। চিনি, সার, সিমেন্ট ও খাদ্যশস্যসহ যে কোন পণ্য প্যাকিংয়ে পাটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু ‘পাটজাত মোড়ক ব্যবহার বিল-২০১০’ বাস্তবায়ন হয়েছে কি? পাটের মোড়ক ব্যবহারের উদ্যোগ কোথায়? চিনি শিল্প, লবণ, স্পিনিং শিল্পে কভার হিসাবে এখনও ব্যবহার হচ্ছে প্লাস্টিকের ব্যাগ, সর্বক্ষেত্রে এখনও প্লাস্টিক সামগ্রির দাপট। এসব শিল্পে এখনও পাটের তৈরি ব্যাগ ব্যবহার হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না তা প্রায়ই পত্রিকায় লেখা হচ্ছে। প্লাস্টিক শিল্পের সাথে অনেকের স্বার্থ জড়িত। খোদ রাজধানীর লালবাগে অসংখ্য অবৈধ প্লাস্টিক কারখানা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টন প্লাস্টিক ব্যাগ উত্পাদন হয়ে বাজারে যাচ্ছে। প্রশাসনের চোখের সামনেই হচ্ছে সব। বিষয়টি জানে সবাই কিন্তু সবার মুখে ঐ কুলুপ আটা। অর্থ পেয়ে অনেকেই একেবারে চুপচাপ। তাই পাস্টিক ব্যাগের অবৈধ কারবারিরা দাপটের সাথে তাদের কারবার চালিয়ে যেতে পারছে। এসব কৃত্রিম মোড়ক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে এবং এর কাঁচামাল আমদানিতে প্রচুর পরিমাণে বিদেশি মুদ্রা ব্যয় হয়। অন্যদিকে পাট এবং পাটপণ্য ব্যবহারে পরিবেশের কোন ক্ষতি করে না। সেজন্য সরকার ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে রক্ষার জন্য পাটের মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার যে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়েছে তা অতিদ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারেই নয়; পাট পণ্যের দেশীয় চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা নিলে এদেশেও প্রচুর পাট পণ্যের চাহিদা রয়েছে। ফলে কেবল আন্তর্জাতিক বাজারের দিকেই নির্ভর হতে হবে না। উপরন্তু অভ্যন্তরীণ বাজারে পাটপণ্যের মোড়কের এক বিশাল বাজার সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পাটশিল্প অবদান রাখতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে কৃত্রিম তন্তু ব্যবহারে দেশে যে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেছে তা থেকেও আমরা রক্ষা পাব। সেক্ষেত্রে পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসবে। পাট ছিল বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় উত্স। পাট রফতানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে অতীতে। বিশ্ববাজারে পাটের স্থলে কৃত্রিম আঁশ জায়গা করে নেয়ায় বাংলাদেশের পাটকলগুলো ক্ষতির মুখে পড়ে। দিন দিন ক্ষীণ হয়ে যায় পাটের বাজার। হারিয়ে যায় সোনালী আঁশের সোনালী ঐতিহ্য। পাশাপাশি অতীতের সরকারগুলোর ভ্রান্তনীতি ও দাতাসংস্থাগুলোর দেশীয় স্বার্থ বিরোধী প্রেসক্রিপশান অনুসরণ করার ফলে বন্ধ হয়ে গেছে দেশের সিংহভাগ পাটকল। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ পাটকল আদমজী বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশে পাট উত্পাদন তীব্র হুমকির মুখে পড়ে। ক্রমাগত লোকসানের অজুহাতে বিগত ২০০২ সালে আদমজী, নিশাত এবং দৌলতপুর জুটমিল বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে ২০০৭ সালে কর্ণফুলী জুটমিলসহ আরো সাতটি পাটকল বন্ধ করে দেয়া হয়। এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ার পাশাপাশি দেশের পাটখাতও ধ্বংসের কাছাকাছি এসে পৌঁছায়। বন্ধ পাটকল চালু ও পাট নিয়ে ব্যাপক গবেষণার উদ্যোগ আর ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলে চলতি সরকার অন্যতম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। উন্নত জাতের পাটবীজ উত্পাদন অত্যন্ত প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে যে সুযোগ-সুবিধা রয়েছে সেগুলো কি সরকার কাজে লাগাতে পারছেন? যদি না পেরে থাকেন, তাহলে পাট ও পাট পণ্য নিয়ে স্বপ্ন আদৌ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কী? সর্বাগ্রে দেশীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করে একটি সুষ্ঠু ও যুগোপযোগী কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন করা খুব দরকার। এ কর্মপদ্ধতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পাট শ্রমিক ও পাট চাষির হতাশা দূর করে পাট এবং পাটজাত পণ্যের উত্পাদন বৃদ্ধি, বিকল্প ব্যবহার এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের সঠিক বাজারজাতকরণ। লেখক:সাংবাদিক e-mail-newsstore13gmail.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন