প্রকৃতি ও জীবন

শিশুর বিকাশ ও পরিবেশের ভূমিকা

আপডেট : ২২ জুন ২০১৪, ২০:৫৮
আসলে একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে বর্ণিত জীবগতসহ, বস্তু ও অবস্তুগত উপাদনের মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠতে থাকে। কতগুলো সরাসরি জীবনের ঊষালগ্ন থেকেই আষ্টে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো মা-বাবা। এই দু’জন ব্যক্তিত্ব শিশুর এমনই আপনজন, যাঁদের সাথে রক্তের বাঁধনে বাঁধা। তাই শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে প্রতিমুহূর্তে তাঁদের ক্রিয়াকলাপ অনুসৃত হয়ে থাকে। এ অবনীতে শিশু প্রথম যে মানুষটিকে চেনে, তিনিই গর্ভধারিণী মা এবং তত্পর বাবা। শিশু প্রথম যে গন্ধ ও শব্দের সাথে পরিচিত হয়, সেটা হলো মায়ের গায়ের গন্ধ ও তাঁর মধুর ডাক। উল্লেখ্য যে, শিশুর জীবনের প্রথম আট বছর পরিবারের লোকজন বিশেষ করে মায়ের সরাসরি বিভিন্ন আঙ্গিকে হূদয় নিংড়ানো যত্ন, আদর ও ব্যবহার শিশুর ভবিষ্যত্ জীবনের বীজ হিসেবে পুষ্টি লাভ করে কিশলয় হয়ে শাখা-প্রশাখা ছেড়ে বাড়তে থাকে। শিশুর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব সুগঠিত হয় মূলত তিনটি স্বভাবজ ও কৌশলগত সম্পর্কের (Co-herent & strategic relations) উপর ভিত্তি করে। যেমন- (ক) পিতা-মাতার মধ্য সম্পর্ক (খ) পিতা-মাতা ও শিশুর মধ্যে সম্পর্ক এবং (গ) পরিবারের অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন, খেলা ও স্কুলসাথীসহ অন্য শিশুদের মধ্যে সম্পর্কের উপর। এদিকে জীবগত, বস্তুগত ও অবস্তুগত উপাদান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মিথস্ক্রিয়ার সূত্র ধরে শিশুর জ্ঞান, নৈতিকতা ও বাস্তবতা প্রসূত রূপ-রসে ভরে দিতে থাকে। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলে জীবনের মান রক্ষা তো দূরে থাক, জীবন পর্যন্ত সংকটাপন্ন হতে পারে। এরকম অনেক উদাহরণ আছে। তার মধ্যে অধুনা সংঘটিত ঐশীর ঘটনা কে না জানে? এক্ষেত্রে যতদূর প্রতিভাত হয়, তাতে মনে হয় ঐ মেয়েটির পারিবারিক পরিবেশসহ বন্ধু-বান্ধবীরা দায়ী। সেহেতু পারিপার্শ্বিকতাসহ অতি আদর বা অনাদর উভয়ই খারাপ। ইংরেজিতে একটি কথা আছে: “Spare the rod, spoil the child”. কিন্তু এই কথাটি খুব একটা কার্যকরি নয় বলে প্রতীয়মান হয়। কেননা শিশুকে শাস্তি দিলে বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, আবার একেবারেই ছেড়ে দিলে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তবে এক্ষেত্রে ম্যাকগ্রেগরের X এবং Y তত্ত্ব সমধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। যদিও বর্তমানে প্রাইমারী শিক্ষা ব্যবস্থায় পাশ্চাত্য রীতিতে জার্মানী শিক্ষাবিদ ফ্রেডারিক ফ্রোবেলের তত্ত্ব অনুযায়ী কিন্ডারগার্টেন পদ্ধতি শহরাঞ্চলসহ রাজধানীতে গড়ে উঠেছে। তথাপিও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সার্বজনীন হিসেবে কতখানি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে? কেননা এক্ষেত্রে অভিভাবকের সচ্ছলতা, সময় ও মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে উল্লেখ্য যে, শুধু আর্থ-সামাজিক কারণে আমাদের দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু প্রাইমারী স্কুল থেকে ঝরে পড়ে থাকে এবং শিশুশ্রমে ঢুকে পড়ে। এদিকে এখনও আমাদের দেশে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার (Proverty level) নিচে বসবাস করে। তাই সংসারের সব খরচ মিটিয়ে বাচ্চাদের মানসম্মত শিক্ষা দেয়ার মতো তেমন অর্থ হাতে থাকে না। যদিও মৌলিক চাহিদার মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। তথাপিও সর্বদিকে খরচ কমিয়ে তথাকথিত মৌলিকত্বহীন কোচিংয়ের টাকা যোগাতে অনেক পরিবারকে হিমসিম খেতে হচ্ছে। আর বর্তমান যে সিলেবাস আছে, তাতে নৈতিকতার তেমন প্রাধান্য নেই। কোন ধরনের শিক্ষা গ্রহণ করলে সহজে চাকরি পাওয়া যাবে এবং উপরি নামক ঘুষ পাওয়ার পথ সুগম হবে, সেটাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। দিকে শিশুদের জন্য কাম্য চিত্ত-বিনোদনমূলক ব্যবস্থা অপরিহার্য। এজন্যে খেলাধুলা, শরীরচর্চা, সঙ্গীত ও নানাবিধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকার প্রয়োজন। কেননা এগুলোর অভাবে অনেক শিশুকে যত্রতত্র রাস্তাঘাটে ঘুরতে-ফিরতে এবং ছুটাছুটি করতে দেখা যায়। এ ধরনের বিশৃঙ্খলভাবে ঘোরাফেরা সাময়িক আনন্দ দেয় ঠিকই, তা প্রকারান্তরে অপরাধপ্রবণতার দিকে ঠেলে দেয়। এ ধরনের অনেক ঘটনা পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়। শহরের মহল্লায় বা স্কুল বা কলেজে খেলার মাঠ না থাকায় শিশুর মতিগতি অন্যদিকে প্রবাহিত হয় বিধায় উচ্ছৃঙ্খল জীবনে পা বাড়ানোর বিষয়টি খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। লেখক :গবেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন