গত শতকের নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ‘মঙ্গা’ ছিল বাংলাদেশের দারিদ্র্যের অন্যতম সূচক। প্রতি বছর বিশেষ করে ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক মাসে রংপুরসহ দেশের উত্তরাঞ্চল মঙ্গায় আক্রান্ত হতো। মানুষের হাতে কাজ থাকত না। কর্মহীন দরিদ্র মানুষ দিনের পর দিন অর্ধাহার-অনাহারে থাকত। এনজিওগুলো দেশব্যাপী ক্ষুদ্রঋণের ব্যবসা করলেও এখানে তাদের তত্পরতা ছিল খুবই কম। কোন্ যাদুর কাঠির ছোঁয়ায় মঙ্গা দূর হবে তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনারও শেষ ছিল না। অনেক বিশেষজ্ঞের অভিমত ছিল, যেকোনো সরকারের জন্য মঙ্গা দূরীকরণ হবে ‘বিরাট সাফল্য’। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার মঙ্গা প্রতিরোধে বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সে ধারাবাহিকতায় মঙ্গা দূরীকরণে সরকার বেশ সাফল্যও অর্জন করে। দেশের উত্তরাঞ্চলে উচ্চমাত্রার প্রবৃদ্ধি (১৫০.৬০%) গ্রামীণ অর্থনীতিকেও বিকশিত করেছে। রংপুর বিভাগে ১৯৮৬ সালে অর্থনৈতিক ইউনিট ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ১৩৫। ২০০১ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ৫ হাজার ৫৮৩ এবং ২০১৩ সালে ১০ লাখ ৮৮ হাজার ২৫৫ তে উন্নীত হয় (অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩)। এখন সচরাচর কর্মহীন মানুষ চোখে পড়ে না। কেউ না খেয়ে থাকে না।
মঙ্গা দূরীকরণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি সূচক। মাথাপিছু আয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাজেটের আকার ইত্যাদি সূচকেও বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রশংসনীয়। শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদের শেষ বাজেটের আকার ছিল ৪৩ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। বিএনপি ২০০২-০৩ অর্থবছরে ৪৪ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে। পাঁচ বছর শেষে ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বিএনপি’র বাজেটের আকার ছিল ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এক-এগার’র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২০০৭-০৮ সালের বাজেটের প্রকৃত আকার (বিপিসি’র দায় ব্যতীত) ছিল ৭৯ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। গণমাধ্যমে এ বাজেটকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বাজেট বলে অভিহিত করা হয়। ২০০৮-০৯ সালে এ সরকার ৯৯ হাজার ৯৬২ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে। সরকারের দুই বছরে বাজেটের আকার রেকর্ডধারী হলেও তা উন্নয়ন ও সুশাসনে খুব বেশি কার্যকর ছিল না বলেই বিশ্লেষকদের অভিমত। বস্তুত গণতন্ত্রকে ব্যাহত করে, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও নিপীড়ন করে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১৯ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে। এ বাজেটকে সরকার ‘রূপকল্প ২০২১’ বাস্তবায়নের প্রথম সোপান হিসেবে উল্লেখ করে। সমালোচকরা বাজেটকে উচ্চাভিলাষী বলে অভিহিত করেন। বস্তুত, ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে এ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের উত্থাপিত প্রায় প্রতিটি বাজেটকেই ‘উচ্চাভিলাষী’ এবং ‘বাস্তবায়নযোগ্য নয়’ বলে সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি বাজেটই লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। তাই নবম সংসদের পাঁচ বছরে বাজেটের আকার দাঁড়ায় প্রায় দ্বিগুণ। ২০১৩-১৪ সালে তিনি ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। অর্থমন্ত্রী তথা সরকার উচ্চাভিলাষী বলেই বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হবার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ২০০৯ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ৬৯০ মার্কিন ডলার। মাত্র পাঁচ বছরে তা ১১৯০ ডলারে উন্নীত হয়েছে (এপ্রিল ২০১৪)। জুলাই ’১৩ থেকে এপ্রিল ’১৪ এই ১০ মাসে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ১৩৬ মার্কিন ডলার! বস্তুত, বাংলাদেশের সমৃদ্ধির জন্য কেবল স্বপ্ন নয়, সাহস এবং উচ্চাভিলাষ থাকাও জরুরি। সেটি আছে বলেই শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেন। অর্থমন্ত্রী ২ লক্ষ ৫০ হাজার ৮০৬ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন ।
এবারের বাজেটকেও যথারীতি উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবায়নকে ‘চ্যালেঞ্জিং’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। দারিদ্র্য বিলোপে সহায়ক, ব্যবসাবান্ধবের পাশাপাশি কেউ কেউ বাজেটকে ‘স্বপ্নবিলাসী’ বলেও অভিহিত করেছেন। বস্তুত আমাদের মত উন্নয়নকামী দেশকে নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই অগ্রসর হতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক সংঘাত ও অস্থিরতা, উন্নয়ন সহযোগীদের শর্ত ইত্যাদি কেবল বাজেট নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যও চ্যালেঞ্জ। দেশের অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল রাখতে অবকাঠামোতগত উন্নয়ন, গ্যাস-বিদ্যুত্, জনশক্তি ইত্যাদির উপরও অপরিসীম নির্ভরতা রয়েছে। কেবল নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ একটি দেশের অথনীতিকে পাল্টে দিতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক গতিশীলতার মূলেও বিদ্যুত্ ব্যবস্থার উন্নতি বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। ০৬ জানুয়ারি ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা যখন দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করেন তখন সারাদেশে বিদ্যুতের জন্য হাহাকার। যত্রতত্র ‘খাম্বা’র দেখা মিললেও বিদ্যুত্ ছিল দুষ্প্রাপ্য। অনেকে তখন বলতেন, কেবল বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধানের মাধ্যমেই সরকার তার জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারে। ২০১২ সাল পর্যন্তও লোডশেডিং মানুষকে অতিষ্ঠ করে রাখত। কিন্তু এখন বিদ্যুতের সমস্যা সহনীয় মাত্রায় নেমে এসেছে। গত পাঁচ বছরে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বিদ্যুত্ খাতে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। ২০০৯ সালে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ উত্পাদন ক্ষমতা ছিল সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট। ২০১৩ সালে তা ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। বিদ্যুতের উন্নতি ছাড়াও বাংলাদেশ এখন অনেক বড় বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। মানুষের কাজের সুযোগ তৈরির মধ্য দিয়ে ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস পাচ্ছে দারিদ্র্য। সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা একটি বিশেষ ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে গেছে। তাই উন্নয়ন সগযোগী দেশ ও সংস্থাগুলোও এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করছেন।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে কারো তেমন সংশয় নেই। সরকারের ঘোর সমালোচকও এ সত্যটি স্বীকার করতে বাধ্য। কিন্তু কেবল অর্থনৈতিক অগ্রগতি এখন সবকিছু নয়। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করা যেমন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার, তেমনি সুশাসন নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। মঙ্গা দূরীকরণ, বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধান ইত্যাদি যেমন সময়ের দাবি ছিল, একইভাবে সুশাসনও এখন সময়ের দাবি। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি কখনো ব্যক্তি, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রের কল্যাণ নিশ্চিত করবে না। ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার সবচেয়ে বেশি নিন্দিত হয়েছিল সুশাসন ও আইনের শাসনে ব্যর্থতার দায়ে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ, ন্যায়বিচারের অভাব এবং বিচারহীনতা দেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। নানা চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসে। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, আইসিটি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকার চমকপ্রদ সাফল্য অর্জন করে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্যি যে, সরকার সুশাসনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারেনি। সেজন্যই অনেকে বলেন, মহাজোট সরকার উন্নয়ন দিয়েছে, সুশাসন দেয়নি। ফলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা সরকারের কাছে সুশাসনই ছিল প্রধান দাবি। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারেও সুশাসনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়। কিন্তু সুশাসনের বিষয়ে প্রায়শ সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এটি অস্বীকার করে লাভ নেই যে, একটি দুর্বল নির্বাচন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। এই দুর্বল ভিত্তিটিকে সংহত করার নিয়ামক শক্তি হতে পারে সুশাসন। এ বিষয়ে উদাসীনতা সরকারকে বাড়তি চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলতে পারে। ইলিয়াস আলী যে দলেরই হোন, দেশের একজন নাগরিক হিসেবে তার অপহরণের রহস্য উদঘাটন সরকারের দায়িত্ব। অথচ বিষয়টি নিয়ে কেবল রাজনীতি হয়েছে, কাজের কাজ হয়নি কিছুই। সাগর-রুনির চাঞ্চল্যকর হত্যার কোনো ক্লু আজো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারেনি। গত ২/৩ বছরে রাজধানীসহ সারা দেশ থেকে অনেকে নিখোঁজ হয়েছেন। অভিযোগ কিংবা মামলা দায়ের হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটনার কোনো কূলকিনারা হয়নি। পরিবারগুলো মাসের পর মাস অশেষ যন্ত্রণা নিয়ে অপেক্ষা করছে। মানুষগুলো মারা গেলেও পরিবার তাদের আত্মার শান্তি কামনাও করতে পারছে না। নিখোঁজ মানুষগুলোর কোনো মৃত্যুদিবস নেই, কবর নেই। পরিবারগুলোতে চলছে অনিশ্চিত হাহাকার। এমন অবস্থাকে আর যাই হোক সুশাসন বলা যায় না।
বস্তুত সন্ত্রাসী, গডফাদার, দুর্নীতিবাজরাই সরকারকে ক্রমশ অজনপ্রিয় করে তোলে। সরকার যদি এদের পক্ষে অবস্থান নেয় তবে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে চলে যায়। ফলে শত উন্নয়ন করেও সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়। সুশাসন এবং আইনের শাসনই কেবল পারে একটি সরকারকে জনগণের সরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়,
ইমেইল: [email protected]
