একটি পাবলিক পরীক্ষার সর্বপ্রথম ধাপ হলো প্রশ্নপত্র তৈরি করা। ধরে নিই, প্রতিটি বিষয়ের জন্য ৫০ জন প্যানেল শিক্ষকের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র আহবান করা হলো। তারা তাদের প্রতিটি প্রশ্নপত্রের একটি করে সফট কপি একটি বিশেষ ফরম্যাটে আপলোড করলেন একটি শক্তিশালী সফটওয়্যার অ্যাপলিকেশনে। এই সফটওয়্যারটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অ্যালগোরিদম ব্যবহার করে random selection এর মাধ্যমে এই ৫০ সেট প্রশ্নপত্র থেকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কোটি কোটি ধরনের প্রশ্নপত্র তৈরি করতে সক্ষম। সুতরাং, কোন শিক্ষকের পক্ষেই অনুমান করা সম্ভব নয় যে, সফটওয়্যার তার তৈরি প্রশ্নপত্রের কোন অংশ মূল প্রশ্নপত্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছে কিনা। এই প্রশ্নপত্রগুলো বহুস্তর বিশিষ্ট বিশেষ একটি ডাটাবেজ সিকিউরিটি সিস্টেমের মধ্যে থাকবে যেখান থেকে nauthorized access এর মাধ্যমে কারো পক্ষেই ডাটা retrieve করা সম্ভব হবে না। তাছাড়া ডাটাবেসে সংরক্ষিত প্রশ্নপত্রগুলোকে Decode করে বিশেষ ধরনের Binary Signal এ রূপান্তরিত করা হবে। সুতরাং, কোন কারণে হ্যাকার দ্বারা আক্রান্ত হলেও কারো পক্ষেই এই তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে না। ছাপানোর কয়েক সেকেন্ড আগে এই তথ্যগুলো আবার Encode করা হবে।
এবার আসা যাক, প্রশ্নপত্র ছাপার বিষয়টি নিয়ে। এক্ষেত্রে সবার আগে যেটা করতে হবে সেটা হলো প্লেট সিস্টেমের ছাপার পদ্ধতি বাতিল করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ছাপা পদ্ধতি প্রবর্তন করা। এই পদ্ধতিতে তথ্য ভান্ডার থেকে বিশেষ আলোক রশ্মির মাধ্যমে তথ্যের ছবি নিয়ে প্রতিফলিত রশ্মির মাধ্যমে ছাপা হয়। এই ছাপা পদ্ধতির মান যেমন উন্নত, তেমনি এখানে তথ্য চুরির সম্ভাবনা রোধ করা সম্ভব হয়। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডিজিটাল মেশিনে ঘন্টায় ১৬,০০০ query করা সম্ভব। ছাপানোর স্পীড একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ কারণে যে, ছাপা, প্যাকেজিং-এর গতি যত ধীর হবে তত ডাটা সিকিউরিটি হুমকির মধ্যে পড়বে।
ছাপানোর পুরো প্রক্রিয়াটি মানুষের কোন ধরনের স্পর্শ ছাড়াই সম্পন্ন করা সম্ভব। মানুষের পরিবর্তে এখানে কাজ করবে ৩ থেকে ৪টি রোবট। রোবট কথাটি শুনলেই আমাদের বিশাল খরচের চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়। আসলে ব্যাপারটি একেবারেই সঠিক নয়। এই রোবটগুলোর মধ্যে Artificial Intellegence Program Integrated থাকছে না। শুধুমাত্র একটি বা দুটি কাজের নির্দেশিত প্রোগ্রাম সন্নিবেশিত থাকছে। সুতরাং, এগুলো তৈরির খরচ হবে অত্যন্ত কম। এই রোবটগুলোকে আমরা রোবট না বলে Automatic Machine ও বলতে পারি। যাইহোক, এগুলো Microprocessor দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে এবং একটি বা দুটি নির্ধারিত কাজ করবে। মূল প্রিন্টিং মেশিনটি একটি কম্পিউটারের সাথে যুক্ত থাকবে। সেখান থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে মেশিনটি। পর্যাপ্ত কালি, কাগজের সরবরাহ, প্রতিটি প্যাকেটে কতগুলো ছাপা হবে ইত্যাদি সমস্ত তথ্য কম্পিউটার থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে। যারা প্রিন্টিং মেশিন কম্পিউটারের মাধ্যমে পরিচালনা করবেন তারা প্রিন্টিং সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য দেখতে পারলেও মূল তথ্য অর্থাত্ প্রশ্নপত্রের কোন অংশই দেখতে পারবে না। ছাপার পরে কাটিং, প্যাকিং, সিকিউরিটি সিল সবই একটি Automated Control Szstem এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে। এমনকি ছাপার Quality check করার প্রযুক্তিও রোবটের মধ্যে সন্নিবেশিত করা সম্ভব। আমি শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, কোন মানুষের সংস্পর্শ ছাড়াই মূল ছাপার কাজটি করা সম্ভব এবং খুবই কম খরচে। একটি বিশেষ secured রুমের মধ্যে ছাপা থেকে প্যাকিং, তারপর সিলিং- পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা যাবে যেখানে থাকবে শুধুই রোবট অথবা Automated Machine । তাই তথ্য চুরির কোন সম্ভাবনা থাকবে না। কোন সিস্টেমেটিং সমস্যা হলে সেটি বাইরের একটি কক্ষ থেকে ‘Auto detection ্ Rescue’ পদ্ধতির মাধ্যমে Remote Solution দেয়া হবে। যারা এইসব প্রযুক্তি পরিচালনা করবেন তাদের সংখ্যা অবশ্যই দুই বা তিনের অধিক হবে না। সুতরাং, তাদের একটা জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসাও অপেক্ষাকৃত সহজ হবে। এছাড়াও সিসি ক্যামেরা এবং Access card এর ব্যবহার তো থাকছেই। সিকিউরিটি সিস্টেমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো specification। অর্থাত্ যারা এইচএসসি’র প্রশ্নপত্র ছাপার সাথে জড়িত তারা শুধু এই পরীক্ষার ছাপার কাজই করবে, বিসিএস বা অন্য কোন পরীক্ষার কাজ তারা করবে না। এক্ষেত্রে Random suffling করা উচিত হবে না। তাতে সিকিউরিটি সিস্টেমের accountibility ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ছাপার ক্ষেত্রে wastage বা নষ্ট কপিগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত্ক্ষণাত্ damping করে ফেলতে হবে। টেস্ট প্রিন্টিং-এর প্রয়োজন হলে সেটা করতে হবে Decoding Language এ। এতকিছুর পরেও সিকিউরিটিজ সিসটেম ডিজাইনে আরো টারমিনাল লেয়ার যোগ করা যেতে পারে। যেমন, যারা প্রিন্টিং রুমে কোর ডাটা নিয়ে কাজ করবে তাদেরকে একটি বিশেষ ধরনের লেন্সযুক্ত চশমা পরতে হবে যে চশমাটি প্রশ্নপত্রের ফন্টগুলোকে রূপান্তরিত এবং বিকৃতভাবে উপস্থাপন করবে।
তাছাড়া যারা সরাসরি কোর প্রিন্টিং রুমে কাজ করবেন তারা কর্মস্থল ত্যাগ করার পূর্বমুহূর্তে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের একটি কম্পিউটার গেইম খেলবেন। সিকিউরিটি ব্যবস্থার এই ধাপটি বেশ কার্যকর এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই ব্যবস্থা কার্যকরি ভূমিকা রেখে চলেছে। কারণ এই বিশেষ ধরনের কম্পিউটার গেইম মস্তিষ্কের মধ্যে সদ্য প্রবেশকৃত তথ্যের শতকরা ৯০-৯৯ ভাগ মুছে ফেলতে সক্ষম। এই প্রোগ্রাম অত্যন্ত কার্যকরি। সুতরাং, কেউ যদি অসদুপায় অবলম্বন করে তার মস্তিষ্কে প্রশ্নপত্রের আংশিক অংশ সংরক্ষণ করে, এই প্রোগ্রাম সেই রক্ষিত ডাটা মস্তিষ্ক থেকে মুছে ফেলতে সক্ষম। সিকিউরিটির পরের ধাপে রয়েছে বিজি প্রেসে নেটওয়ার্ক জ্যামার বসানো। এতে করে প্রশ্নপত্রের কোন অংশ এসএমএস বা ভয়েস কলের মাধ্যমে অন্য কোন মোবাইলে পাঠানো সম্ভব হবে না। তাছাড়া বিজি প্রেসে কর্মরত ব্যক্তিদের মোবাইল ও কমিউনিকেশন সিস্টেম যেমন মোবাইলের IME ট্র্যাকিং, ডাটা ট্র্যাকিং, গ্লোবাল পজিশনিং ইত্যাদি অটো-মনিটরিং সিস্টেমের আওতায় আনা যেতে পারে।
সিকিউরিটির সর্বশেষ স্তরে বিটিআরসি দারুণভাবে সহযোগিতা করতে পারে। সেটা হলো ইন্টারনেটে অটো স্ক্রিনিং বা ফিল্টারিং-এর ব্যবস্থা করা। ফেসবুক, টুইটারসহ বাংলাদেশে যত ইন্টারনেট পেজ লোড হচ্ছে, ইমেইলে তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে সেগুলো ফিল্টার করে যেগুলোর মধ্যে বিশেষ ট্যাগ যেমন এসএসসি, এইচএসসি, ফাঁস ইত্যাদি শব্দগুলো ইংলিশ অথবা বাংলা ANSI ফর্মে পাওয়া যাবে সেগুলোকে বিশেষভাবে মনিটর করা যেতে পারে, ক্ষেত্রবিশেষে তথ্য আদান-প্রদানে বাধা সৃষ্টি করা যেতে পারে। আবার আইপি অ্যাড্রেস ডিটেক্ট করে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করা যেতে পারে এবং আইনের আওতায় আনা যেতে পারে। ‘অপরাধী কম্পিউটার’ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর শাস্তিস্বরূপ ঐ কম্পিউটারকে ইন্টারনেট দুনিয়া থেকে স্থায়ীভাবে disable করে দেয়া সম্ভব। কারণ ঐ কম্পিউটার পরবর্তীতে আইপি অ্যাড্রেস পরিবর্তন করলেও মাদারবোর্ডের কিছু unique তথ্য থাকে যেটা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ঠিক একই ধরনের ব্যবস্থা মোবাইল অপারেটরগুলো নিতে পারে। filtering tag ব্যবহার করে মোবাইল অপারেটরগুলো অপরাধী মোবাইল সেটের IME detect করে সেগুলো মোবাইল নেটওয়ার্কে স্থায়ীভাবে disable করে দিতে পারে। এই ধরনের আর্থিক ক্ষতি অপরাধীদের অপরাধ সংঘটনের উত্সাহ কমিয়ে দিতে কার্যকরি ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই, হ্যাকাররা আমাদের হূিপন্ডে ঢুকে পড়ছে। এটা খুব গুরুতর ব্যাপার। আমরা কি আমাদের national security নিয়ে compromise করতে পারি? প্রযুক্তির সহায়তায় একটি জাতীয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিকিউরিটি সিস্টেম গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি। কারণ একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ডাটা সিকিউরিটি এন্ড সাইবার ক্রাইম। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে অনুরোধ করবো, আপনি শিক্ষাক্ষেত্রে একটি মাল্টিলেয়ার সিকিউরিটি সিস্টেম গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিন। গড়ে তুলুন ডাটা সিকিউরিটি গবেষণা কেন্দ্র। এটি অপরিহার্য এবং শিক্ষার্থীদের অধিকারও বটে।
লেখক: প্রাক্তন প্রভাষক, কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন সায়েন্স, লন্ডন ইউনিভার্সিটি।
